[ বিপর্যয় ]

পম্পেই থেকে সাভার কতো দূরে

আপডেট : ২৭ এপ্রিল ২০১৩, ২১:৩৩
আমার সহূদয় পাঠকেরা বিশ্বাস করবেন কিনা জানি না, দু’ হাজার বছর আগে ভিসুবিয়াস অগ্নিগিরির অগ্ন্যুত্পাতে ভস্মীভূত পম্পেই নগরীর কাহিনী নিয়ে লেখা বিখ্যাত উপন্যাস ‘লাস্ট ডেজ অব পম্পেই’ যখন প্রথম পাঠ করি তখন আমি গ্রামের স্কুলে চতুর্থ শ্রেণির ছাত্র। বইটির একটি শিশু-কিশোরদের উপযোগী বাংলা অনুবাদ বেরিয়েছিলো। স্কুলে রচনা প্রতিযোগিতায় প্রথম হয়ে বইটি আমি পুরস্কার হিসাবে পেয়েছিলাম। সেই কিশোর বয়সে বইটি পড়ার পর ভীত-চকিত বিস্ময়ের কথা আমি বহুদিন ভুলিনি। ফলে বড় হয়ে তার পূর্ণাঙ্গ ইংরেজি সংস্করণটি পড়তে দেরি করিনি। বইটি পাঠ করে পম্পেই নগরীর অভিজাততন্ত্র এবং নব্যধনীদের অমানবিক ভোগবিলাস, সাধারণ মানুষের প্রতি অবজ্ঞা, উপেক্ষা এবং নগরীর আসন্ন বিপদ সম্পর্কেও ডোন্ট কেয়ার ভাব আমাকে এক সময় বিস্মিত করেছিলো। অগ্ন্যুত্পাতে পম্পেই ধ্বংস হওয়ার কিছুদিন আগে থেকেই সুপ্ত আগ্নেয়গিরি ভিসুবিয়াসের মৃত জ্বালামুখ থেকে মৃদু মৃদু অগ্নিবিচ্ছুরিত হচ্ছিলো। অনেকে এ সময় সতর্ক বাণীও উচ্চারণ করেছিলেন। কিন্তু কেউ সেই সতর্ক বাণী কানে তোলেনি। নব্যধনীরা সন্ধ্যা না হতেই মদ মেয়েমানুষ নিয়ে পানাহারে, আনন্দ উল্লাসে মত্ত হতেন। তারপর ভিসুবিয়াসের মৃত জ্বালামুখগুলো সহসা জীবন্ত হয়ে উঠেছে। শুরু হয়েছে ঊর্ধ্বমুখী আগুন আর তরল লাভার সারা নগরে নেমে আসা। সারা নগরটি আগুন আর লাভা স্রোতের নিচে ডুবে যায়। নগরীর ধনী গরিব নির্বিশেষে অধিকাংশ মানুষের মর্মান্তিক মৃত্যু হয়। দু’হাজার বছর পরেও এই পুড়ে যাওয়া শহরটি কাঠকয়লা হয়ে লাভাস্তরের নিচে টিকে আছে। এমনকি মানুষের মৃতদেহও। এ যুগে খননকার্য দ্বারা নগরটি পুনরুদ্ধার করা হয়েছে। প্রতিবছর হাজার হাজার মানুষ যায় এই নগরটি দেখতে। পম্পেই জাদুঘরও প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এই জাদুঘরের জিনিসপত্রের একটা প্রদর্শনী সম্প্রতি লন্ডনেও অনুষ্ঠিত হয়েছে। কিশোর বয়সে ‘পম্পেই নগরীর শেষের দিনগুলো’ বইটি পড়ে আমি ভীত ও বিস্মিত হয়েছিলাম। মানুষের দুর্বিনীত লোভ ও অন্ধ ভোগবিলাসের কথা আমার বিশ্বাস করতে ইচ্ছা হয়নি। কিন্তু পরিণত বয়সে বিভিন্ন দেশ ঘুরে এবং নিজের দেশেও নব্যধনীদের উত্থান এবং অন্ধ ভোগবাদিতা, এবং দেশ ও দেশের মানুষের প্রতি নির্মম উপেক্ষা ও অবজ্ঞার ভাব দেখে দেখে পম্পেই নগরীর কিস্সা আমার কাছে এখন আর বিস্ময়কর অথবা অবাস্তব মনে হয় না। ঢাকার বহুতল ওয়েস্টিং-এর মতো অভিজাত কোনো হোটেলের যে কোনো ডাইনিং রুমে খেতে বসলে মনে হবে বাংলাদেশের মতো ধনী দেশ আর নেই। নিউইয়র্কের ম্যানহাটনের কোনো অভিজাত হোটেলে বুঝি বসে আছি। তারপর হোটেল থেকে রাস্তায় বেরুবার সঙ্গে সঙ্গে চারদিকের পরিবেশ, পথচারীদের অধিকাংশের অবস্থা, ভিখিরীদের উত্পাত দেখে মনে হবে, আদ্দিস আবাবা শহরের স্লাম এরিয়া দিয়ে বুঝি হাঁটছি। ধনী আর দরিদ্রের এতো বড় বৈষম্য, একই নগরে বিলাস আর মানবেতর জীবনযাপনের এমন পাশাপাশি অবস্থান খুব কম দেশেই খুঁজে পাওয়া যাবে। সবচাইতে বিস্ময়কর, দেশ ও দশের প্রতি নব্যধনীদের অবজ্ঞা ও উদাসীনতা। দেশের প্রতি, দেশের মানুষের প্রতি তাদের কোনো প্রকার দায়িত্ব ও কর্তব্য আছে, তা তাদের আচরণ ও জীবনযাপনের পদ্ধতি দেখে মনে হয় না। তাদের বিলাসবহুল জীবনের আচার- আচরণ দেখে মনে হয় তারা যেন এই দেশে ‘এলায়েন’, ভিন্ন গ্রহের মানুষ। এই গ্রহে এসে গ্রহের মানুষগুলোর দুঃখ দৈন্য দেখে তাদের প্রতি ‘পিটি’ অনুভব করছেন। কোনো দায়িত্ব অনুভব করছেন না। ধ্বংস হওয়ার আগে পম্পেই নগরীরও এই অবস্থা দাঁড়িয়েছিল। পম্পেই নগরী ধ্বংস হওয়া সম্পর্কে এক ইতিহাসবিদ মন্তব্য করেছেন, “মানুষ যখন লোভের কাছে পরাজিত হয়, তখন তার ধ্বংস অনিবার্য।” ঢাকায় গেলেই এই সতর্ক বাণীটি আমার বার বার মনে পড়ে। বাংলাদেশে লোভের—অর্থলোভের যে সামগ্রিক বিস্তার ঘটেছে, তার তুলনা টানা মুশকিল। অর্থলোভ মানুষকে অন্ধ করে ফেলেছে। তার সব মানবতাবোধ, মানবিক চেতনা লুপ্ত করে ফেলেছে। অতীতের মূল্যবোধগুলো ধ্বংস করে ফেলেছে। বর্তমানেরও কোনো মূল্যবোধ গড়ে উঠতে দিচ্ছে না। সেই প্রাচীনকালেও পম্পেই নগরীতে এই অবস্থার উদ্ভব ঘটেছিলো। পম্পেই নগরীর পাশেই ছিল ভিসুবিয়াস। সকলেই ভাবতো এটা মৃত অগ্নিগিরি। বিশেষজ্ঞরা বার বার সতর্কবাণী উচ্চারণ করেছেন, এই অগ্নিগিরি মৃত নয়, সুপ্ত। যে কোনো মুহূর্তে অগ্নি উদগীরণ করতে পারে। নগরীর বিলাসী নব্যধনীরা এই সতর্কবাণীতে আমল দেনটি। নগরী অথবা নগরীর মানুষকে রক্ষা করা সম্পর্কে কোনো দায়িত্ববোধও উপলব্ধি করেননি। যেদিন ভিসুবিয়াস থেকে মৃদু মৃদু আগুন ও ধোঁয়া বেরুতে শুরু করে, সেদিনও তারা আমোদ প্রমোদে লিপ্ত ছিলেন। ঢাকা নগরীর কাছে কোনো অগ্নিগিরি নেই। কিন্তু নগর উন্নয়নের মধ্যেই বিরাজ করছে এক ভয়ানক বিপজ্জনক অবস্থা। বিশেষজ্ঞেরা বলেন, যে কোনো সময় ঢাকা শহর ভূমিকম্পে বিধ্বস্ত হয়ে যেতে পারে। তারা আরও বলেছেন, চাঁদপুর শহরের মতো ঢাকা শহরেও ভূগর্ভস্থ মাটির স্তর ধীরে ধীরে সরে যাচ্ছে। তাতে বহুতল ভবনগুলোর বিপদের ঝুঁকি বাড়ছে। কোনো কোনো ভবন হঠাত্ মাটির নিচে তলিয়ে যেতে পারে। কোনো কোনো ভবন তলিয়ে গেছেও। ঢাকা নগরীর সম্প্রসারণ ও উন্নয়নকালেও যে কাজটি করা হয়েছে তা আরও ভয়ানক। অধিকাংশ ক্ষেত্রে পুকুর, খাল বিল ভরাট করে নতুন বাড়িঘর, বহুতল এপার্টমেন্ট তৈরি করা হয়েছে। এই জলাশয়গুলো ঠিকমতো মাটি ফেলে ভরাট করা হয়নি। লোভী নব্যধনীরা এই বাড়িঘর নির্মাণে টাকা বাঁচানোর জন্য আরও যে কাজটি করেছে তা হলো, বহুতল বাড়িগুলোর ফাউন্ডেশন ঠিকমতো দেয়নি। তিনতলা বিল্ডিংয়ের ফাউন্ডেশন দিয়ে তার উপর নয়-দশ তলা পর্যন্ত তৈরি করা হয়েছে। এক বিশেষজ্ঞের মতে, ঢাকায় নবনির্মিত ও নির্মীয়মাণ ভবনগুলোর শতকরা ৮০ভাগ এই ধরনের ত্রুটিপূর্ণ ফাউন্ডেশনের ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। অন্য কোনো দেশ হলে এই ভবনগুলো ভেঙে ফেলার অভিযান সরকারিভাবে শুরু হতো এবং এই ধরনের বাড়ি নির্মাণের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অপরাধের শাস্তি দেওয়া হতো। গত বুধবার (২৪ এপ্রিল) ঢাকার সাভারে রানা প্লাজা নামে যে বহুতল ভবনটি ধসে পড়ায় একটি ছোটখাটো রোজকেয়ামত ঘটেছে, সেই বাড়িটি সম্পর্কেও জানা যায়, একটি পুকুর ভরাট করে সেটি তৈরি। অভিযোগ, মাটি শক্ত হওয়ার আগেই ভবনটির নির্মাণ শুরু এবং পাঁচতলার ফাউন্ডেশনের উপর এই নয়তলা বিল্ডিং তৈরি করা হয়েছে। এই ভবনে চার-পাঁচটি গার্মেন্টস ফ্যাক্টরি, ব্যাংক ও অন্যান্য বহু অফিস রয়েছে। রোজ হাজার হাজার মানুষ ভবনটিতে যাতায়াত করে। যেদিন ভবনটি ধ্বংস হয়, তার আগের দিনই বুয়েটের বিশেষজ্ঞরা ভবনটিতে ফাটল রয়েছে বলে মালিককে সতর্ক করে দেয়। তিনি সেটি আমলে নেননি। আমলে নেননি গার্মেন্টস ফ্যাক্টরির মালিকেরাও। তারা নাকি অনিচ্ছুক শ্রমিকদের (যাদের অধিকাংশই নারী) কারখানায় ঢুকতে বাধ্য করেছিলেন। দুর্ঘটনার পর এই ভবনের মালিক সোহেল রানা পলাতক। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নিজে তাকে গ্রেফতার করার নির্দেশ দিয়েছেন। পুলিশ এখনো (আমার এই নিবন্ধ লেখার সময় পর্যন্ত) তাকে ধরতে না পারায় তার দুই আত্মীয়কে গ্রেফতার করেছে। এই ভবনের গার্মেন্টস ফ্যাক্টরির দুই মালিকও পুলিশের কাছে আত্মসমর্পণ করেছেন বলে জানা গেছে। এই অতি লোভী এবং বিবেকহীন নব্যধনীদের শুধু গ্রেফতার করলেই চলবে না। দোষী সাব্যস্ত হলে এদের উপযুক্ত দণ্ডবিধানেরও ব্যবস্থা করতে হবে। বাংলাদেশের নব্যধনীদের অতিলোভ ও মুনাফাখোরির কাছে গরীব শ্রমিক বিশেষ করে নারী শ্রমিকদের জীবনের যে কোনো মূল্য নেই, তার প্রমাণ অতীতেও বহুবার পাওয়া গেছে। দেশের প্রতিও এদের কোনো দায়িত্ববোধ নেই। ২০০৫ সালে বিএনপি’র এক সংসদ সদস্যের জামাইয়ের মালিকানাধীন স্পেক্ট্রাম গার্মেন্টস ফ্যাক্টরি ধসে পড়ায় সত্তর জনের মতো শ্রমিকের মর্মান্তিত মৃত্যু ঘটে। তারপর গত নভেম্বর মাসে আরেকটি গার্মেন্টস ফ্যাক্টরি তাজরিনে অগ্নিকাণ্ডে ১১৩ নারী শ্রমিক পুড়ে মরে। আরো গার্মেন্টস ফ্যাক্টরিতে ছোটখাটো দুর্ঘটনা কম হয়নি। মালিকদের লোভের যাঁতাকলে অসহায় নারী-পুরুষ শ্রমিক জীবন বলি দিচ্ছে অহরহ। অভিযোগ, অধিকাংশ গার্মেন্টস ফ্যাক্টরিতে স্বাস্থ্যরক্ষা ও নিরাপত্তার ন্যূনতম ব্যবস্থা নেই। অগ্নি নির্বাপণের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেই। ফ্যাক্টরির ভবনগুলো ঝুঁকিপূর্ণ। কেউ কেউ বলেছেন, বাংলাদেশের এক শ্রেণীর নব্যধনী কলকারখানার মালিক শ্রমিকদের প্রতি যে আচার-আচরণ দেখান, সতেরো শতকের ইউরোপের নব্যধনী মালিকেরা তাদের দাস শ্রমিকদের প্রতি সে ধরনের আচার-আচরণ দেখাতেন। স্বাধীন বাংলাদেশে দীর্ঘকাল গণতান্ত্রিক সরকারের অনুপস্থিতিতে লুটেরা নব্যধনীদের অবাধ লুণ্ঠন এবং দেশ ও দশের প্রতি সর্বপ্রকার দায়-দায়িত্ব বর্জনের যে ইতিহাস তৈরি হয়েছে, কোনো গণতান্ত্রিক সরকারের আমলে তা চলতে পারে না। সাভার ট্রাজেডি বাংলাদেশের সকল শ্রেণীর মানুষের চোখ খুলে দেওয়া উচিত। বিপদ শুধু গার্মেন্টস শ্রমিকদের নয়, বিপদ পম্পেই নগরীর মতো সারা ঢাকার, সারা দেশের। ঝুঁকিপূর্ণ ভবনগুলো সম্পর্কে সরকারের এখনই ব্যবস্থা গ্রহণ করা দরকার। বাড়ি নির্মাণে দুর্নীতি দমনে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া দরকার। অবৈধ ও বিপজ্জনক স্থাপনাগুলো ভেঙ্গে ফেলা এবং লেক, পুকুর ও অন্যান্য জলাশয়, এমনকি নদী দখল করে অবৈধভাবে তা ভরাট করে বাড়ি-ঘর, দোকানপাট তৈরির অবাধ তত্পরতা বন্ধ করার কঠোর আইন হওয়া দরকার। বাংলাদেশে ভূমিদস্যুদের দমনে সরকার যদি সর্বশক্তি ও সাহস নিয়ে এগিয়ে না যান, তাহলে পম্পেইয়ের মতো সারা বাংলাদেশের জন্যই বিপজ্জনক অবস্থা সৃষ্টি হবে। সাভার ট্রাজেডিকে দেশের সকল দল-মতের মানুষের জাতীয় দুর্যোগ হিসেবে গ্রহণ করা উচিত। তা থেকে রাজনৈতিক ফায়দা লুটানোর চেষ্টা হবে বিপন্ন মানবতার প্রতি অপরাধ। সাভারের রানা প্লাজার মালিক আওয়ামী লীগার না বিএনপি’র লোক, এটাতো বড় কথা নয়। তার অপরাধ প্রমাণিত হলে তাকে মানবতার প্রতি অপরাধ করার জন্য দণ্ডদানের ব্যবস্থা করতে হবে। তিনি একজন অপরাধী। তার দলীয় পরিচয় এখানে গৌণ। সাভারের আওয়ামী লীগ দলীয় এমপি’র কোনই বিবৃতি দেওয়ার প্রয়োজন ছিল না যে, সোহেল রানা আওয়ামী লীগ বা যুবলীগের সঙ্গে সম্পর্কিত নন। এটা অনেকটা পূজার ঘরে কে, আমি কলা খাই না’ গোছের জবাবের মতো। অন্যদিকে বিএনপি উঠে-পড়ে লেগেছে, প্রধানমন্ত্রী রানা প্লাজার মালিককে বাঁচানোর চেষ্টা করছেন, এই অভিযোগ প্রমাণ করার জন্য। অথচ প্রধানমন্ত্রী নিজে এই ব্যক্তিকে গ্রেফতার করার নির্দেশ দিয়েছেন। এতো বড় জাতীয় দুর্যোগেও বিএনপি রাজনৈতিক ফায়দা লুটতে চায়-এটা দুঃখজনক। অন্যদিকে কম্যুনিস্ট পার্টি ও বামদের মিলিত জোট কি করে এই দুর্যোগের ধাক্কা না কাটতেই আগামী ২ মে হরতাল ডাকতে চায় তা আমি জানি না। পড়শির বাড়িতে আগুন লাগলে সকলকেই আলু পোড়া খাওয়ার লোভ করতে হবে কি? পম্পেই নগরীর শেষ দিনগুলো থেকে আমরা কি কোনই শিক্ষা নেব না? লন্ডন ২৭ এপ্রিল, শনিবার, ২০১৩

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন