আমি আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি-বাংলাদেশে বি বি এ নাইন সেমিস্টারের নিয়মিত ছাত্রী, আজ শুক্রবার (২৬-০৪-২০১৩) ১:১৫ থেকে আমার ফাইনাল পরীক্ষা ছিল। আমি যথারীতি বাসা থেকে ১০.০০ টায় বের হই। জানিয়ে রাখি আমার বাসা মাদারটেক, সবুজবাগ। আমি শান্তিপূর্ণভাবে মালিবাগ যেতেই দেখলাম অশান্ত এক পরিবেশ। কিছুক্ষণের মধ্যেই দেখলাম যমদূতের মত হাজারো গার্মেন্টস কর্মী হাতে ইট, হাতুড়ি, লাঠি নিয়ে দৌড়ে সব গাড়ি ও বাসের দিকে আসছে। এই অবস্থা দেখে যে যার গাড়ি, বাস উল্টো দিকে ঘুরিয়ে ফেলছে তখন আমাদের গাড়িও ঘোরানোর প্রচেষ্টায়। রাস্তায় এত খারাপ অবস্থা যে জরুরি ভিত্তিতে বাঁচার জন্য গাড়ি ঘোরানোর জায়গাও নেই। তখন ঘড়িতে ১০.২৫ মিনিট। আমি আল্লাহকে ডাকছি আর কি করতে হবে বুঝতে পারছি না। ওই মুহূর্তেই দেখলাম কেউ একজন সামনের একটি বাসে আগুন ধরিয়ে দিল, আর অসহায় মানুষগুলো জানালা দিয়ে এলোপাতাড়ি লাফ দিচ্ছে, এরই মধ্যে আমার আশ-পাশে ৩/৪টা ককলেট বিস্ফোরণ হল। আর দেখলাম একটু আশ্রয়ের জন্য মানুষ আশ-পাশের দোকানগুলোতে ঢুকে পড়ছে আর দোকান মালিক সাটার বন্ধ করে দিচ্ছে, আরও দেখলাম রিক্সায় একটি বাচ্চা মেয়ে তার মাকে ভয়ে জড়িয়ে ধরে চিত্কার করছে বাঁচার জন্য, তার মা এক কাঁধে পানির ফ্লাক্স আর এক কাঁধে ব্যাগ নিয়ে মেয়ের হাত ধরে রিক্সা থেকে নেমে পালাচ্ছে। সবার মধ্যে তখন জান বাঁচানোর এক অস্থিরতা। আমি ও আমার ড্রাইভার সাহাবুদ্দিন গাড়ি নিয়ে পালানোর রাস্তা খুঁজছি। আমি নিজেকে নিয়ে যত ভাবছি তার চেয়েও বেশি ভাবছি আমার সামনের গাড়িগুলো যেগুলো ভাঙচুরের শিকার তাদের মানসিক অবস্থাটা কী। আমি ভাবছি আমি যদি লেখাপড়া না করতাম তাহলে নিশ্চয়ই আমাকে পরীক্ষা দিতে যেতে হতো না, আমিও এই অপ্রীতিকর, জীবন ধ্বংসী পরিস্থিতির মধ্যে পড়তাম না। তাই ভাবছি লেখাপড়া করে কি হবে, ভবিষ্যতেও তো আমাকে সবার প্রতিহিংসার সম্মুখীন হতেই হবে। দেশের মানুষ আজ অনেক কষ্টের মধ্যে দিন পার করছে। আমারই ভাই-বোনরা দেয়াল চাপা পড়ে অনেকে মরে গেছে, বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় অর্থ উপার্জনের কোন প্রতিষ্ঠানে আগুন লেগেছে, লোকজন সেখান থেকে বের হবার কোন জায়গা নেই। ৬তলা বিল্ডিং, বিল্ডিং কোড না মেনে ৯ তলা হয়ে যাচ্ছে দেখার কেউ নেই, ভেঙ্গেও পড়ছে, তারপর আমরা জানছি এই বিল্ডিং আসলে ৬তলা হওয়ার কথা, এটাই বুঝতে পারছি নিয়ম-নীতির বালাই নেই কোন কিছুতেই। সব অনিয়ম জানতে পারি দুর্ঘটনা ঘটার পর। তাহলে আমার প্রশ্ন প্রশাসনের কাজটা কি? ৬তলা বিল্ডিং যখন নিয়ম-নীতি না মেনে ৯তলা হয় রাজউক এর বড় বড় ইঞ্জিনিয়াররা করেটা কি? আসা-যাওয়ার পথেও কি দেখে না এই বিল্ডিং ৯তলা হলো কিভাবে। হাজারও লোক মরলে, টিভি চ্যানেলে দেখলে আমরা জানতে পারি নানা অনিয়মের কথা, এর পরের অধ্যায়টা কি-আমি বলি এর পরের অধ্যায়টা হল সবাই মিলে অনেক টাকার কেনা, ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে কেনা গাড়ি, সরকারি ট্রেন, বাস এসব ভাঙচুর করা। আমাদের সব আক্রোশ যেন গাড়ির উপর গিয়ে পড়ে। হোক হরতাল আগের দিন থেকেই গাড়ি ভাঙচুর হয়। বাসে লোকজন বসে আছে সমস্যা নেই অকটেন ঢেলে জ্বালিয়ে দাও। অনেক ঘটনা আমাদের জানা, হরতালে বাসে আগুন দেয়ার কারণে অনেক মানুষ জ্যান্ত পুড়ে মরে গেছে। হাজার হাজার কোটি টাকা দিয়ে বাইরের দেশ থেকে গাড়ি ট্যাক্স দিয়ে এনে ব্যাংক থেকে ঋণ নিয়ে গাড়ি কিনে তা অকটেন ঢেলে হাসি হাসি চেহারা নিয়ে দিচ্ছে জ্বালিয়ে। কোন মায়া নেই যে গাড়িতে তারই মত মানুষ বসে আছে। জ্বলে যেতে পারে মানুষগুলো, এই সব ভাবনা আমাদের নেই। আবার দেখি গার্মেন্টসের নানা দুর্ঘটনায় সারা জাতি অঝোরে কাদছে উল্টো দিকে মানুষ মানুষকে পিটিয়ে মারছে। আমার মনে হয় না পৃথিবীর কোথাও এমন নিষ্ঠুরতা আছে। তাই ভাবছি শিক্ষিত হয়ে কি লাভ। সুন্দরভাবে বাঁচতে শিখিনি আমরা, হিংসাই আমাদের নিয়মিত বিরতিতে পিছনের দিকে টানছে। আমাদের দেশের রাজনীতিও ঠিক একই সূত্রে গাঁথা। তাই ঠিক করেছি লেখাপড়ার পাঠ চুকিয়ে দেব। যদি কোন সুযোগ পাই স্বামী ও আমার প্রিয় সিমরাকে নিয়ে অন্য কোন জগতে পালাব। ছেড়ে দেব এই প্রিয় মাতৃভূমির মায়া। কারণ আমি সুন্দরভাবে বাঁচতে চাই। আমার মনে ভয় ঢুকে গেছে। আমি নিজের চোখে দেখেছি তা। ভাবছি এতদিন হয়ত আমারই মত একজন আমাকে রাস্তায় জ্বলতে দেখবে আমার পরিবারসহ। তাই পালাব, শুধু পালাতেই থাকব।
লেখক :বি.বি.এ নাইন সেমিস্টার
আমেরিকান ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটি
