রাজধানী ঢাকা কি তার মর্যাদা হারাতে বসেছে? যানজটের নগরী, জনচাপে নুয়েপড়া নগরী, ব্যাঙের ছাতার মত যেখানে-সেখানে যেনতেন প্রকারে স্থাপনার নগরী, রাস্তার উপরে আবর্জনার স্তূপের দুর্গন্ধে ভরপুর নগরী, আরও কতরকম অব্যবস্থাপনায় ভরা যে রাজধানী ঢাকা, তার ইয়ত্তা নেই। তবু একরকম সয়ে যাচ্ছিল, কিন্তু লোভের আগুনে যেভাবে মারা হচ্ছে নিরীহ মানুষগুলোকে, তা মানতে পারা যাচ্ছে না, সইতেও পারা যাচ্ছে না কিছুতেই।
এক জরিপে জানা গেছে, গত ২৩ বছরে ভবন ধসে ও আগুনে পুড়ে ঢাকা নগরীতে মারা গেছে সাত শতেরও অধিক মানুষ। বলাবাহুল্য এর অধিকাংশই বিভিন্ন গার্মেন্টস কারখানার গরীব শ্রমিক। যারা পেটের দায়ে দেশের দূর-দূরান্ত থেকে ঢাকায় ছুটে এসেছিল, কাজ পেয়েছিল কোন গার্মেন্টস-এ, উদয়াস্ত খেটে যা পেত তা দিয়েই হয়তো চলতো তাদের গোটা পরিবার, একবেলা-আধবেলা খেয়ে। সস্তা শ্রমের বিনিময়ে পায় বলে মালিক এদের সাথে পশুর মত আচরণ করে, শ্রমের প্রকৃত মূল্য থেকে বঞ্চিত করে, অভাবের তাড়নায় সে সব এরা মুখ বুজে সহ্য করে, ভাবে তবু তো দুটো পয়সা আয় করতে পারছে, পারছে দুটো অন্ন মুখে তুলতে।
এযাবত্ যত ভবন ধসে পড়েছে, জানা গেছে প্রতিটি ভবন নির্মাণে মারাত্মক ত্রুটি ছিল, এমনকি কোন কোনটার অনুমোদনও ছিল না। এতেই বোঝা যায় কতখানি ক্ষমতাধর ঐ ধুরন্ধেরা। কিন্তু প্রকৃতি ভারসাম্যহীনতা ক্ষমা করে না, তাই লোভের ভার সইতে না পেরে অবধারিতভাবে ধসে পড়েছে ভবনগুলো, মরেছে মানুষ, যারা ছিল কারখানার চালিকাশক্তি। আজ পর্যন্ত শোনা যায়নি ভবন ধসে কোন মালিক মরেছে। তারা সুযোগ বুঝে ঠিকই গা ঢাকা দিয়েছে। শুধু প্রশাসন ক’দিন দৌড়-ঝাঁপ করেছে, নেতারা আহা-উহু করেছে, হতাহতদের কিছু ক্ষতিপূরণ দেয়া হয়েছে, তদন্ত হয়েছে, মালিকদের দিকে দোষের তীর ছোঁড়া হয়েছে, প্রমাণিত হলে শাস্তি দেবার কথাও বলা হয়েছে। কিন্তু ঐ পর্যন্তই, নির্মম পরিহাস হল এই যে আজ পর্যন্ত ভবন ধসের নিয়ামক যারা, সেই পাপিষ্টদের কোন সাজা হয়নি। বুঝতে অসুবিধা হয় না এর নেপথ্য কারণ,এই মালিকেরা টাকার জোরে সব ম্যানেজ করে নিয়েছে। ফলে লাশগুলোর উপর ধুলো আস্তরণ পড়তেই মানুষের স্মৃতিতেও সে ঘটনা ফিকে হয়ে এসেছে। তখন আবার সেই সিংহ শাবকেরা গর্ত থেকে বেরিয়ে নবউদ্যমে কারখানা চালু করে চুটিয়ে ব্যবসা করে খেয়েছে এবং এখনও খাচ্ছে।
এই হল এ দেশের প্রশাসনিক নির্মম বাস্তবতা। এবার রানা প্লাজা ধসের মাধ্যমে যে লোমহর্ষক তথ্য বের হয়ে আসল, এর বিচার বিভাগীয় তদন্তের কোন প্রয়োজন আছে? এক সপ্তাহ আগে যে ভবনে ফাটল ধরেছে এবং সেজন্য ভবন পরিত্যক্ত ঘোষণা করা হয়েছে, ব্র্যাক-ব্যাংক সে মোতাবেক তাদের অফিস সরিয়ে নিয়েছে, তথাপি ভবন মালিক ও গার্মেন্টস মালিক কেন সে কথায় গুরুত্ব দিল না? এমনকি সংশ্লিষ্ট ইউএনও পর্যন্ত কিভাবে কোন সমস্যা দেখল না, এসব কি ইংগিত দেয়? আতংকিত শ্রমিকেরা সেদিন ভবনে ঢুকতে চায়নি মৃত্যুভয়ে, তথাপি মালিকেরা আজরাইলের মত তাদের সেখানে ঢুকালো, রানা প্লাজাকে বানালো মৃতের পুরি, আর এ নিয়েও চলছে রাজনৈতিক নোংরামো? মৃত্যুকূপ থেকে বের হবার ব্যর্থ প্রয়াসে আর চিত্কারে চারিদিক যখন ভারাক্রান্ত, আর বাইরে স্বজনদের আহাজারি, এহেন অবস্থায় সোহেল রানা পার্টির কেউ ছিল না তাও আলোচিত হতে পারে? বোধহয় পারে এসব সম্ভাবনার দেশে। শোনা যায় পাপিষ্ট সোহেল রানা সেদিন ভবনের নিচের তলায় ছিল, সামান্য আহতও নাকি হয়েছে সে, তারপর কারা তাকে নিরাপদ হেফাজতে রেখেছে বা সরিয়ে দিয়েছে, এর হিসেব দিতে হবে বৈকি! ওরকম শয়তান দু-একটাকে ঘটনাস্থলেই মেরে ফেলতে হয়, নইলে এদের কোনদিন শিক্ষা হবে না। সোহেল রানার বউকে ধরা হয়েছে, একি কান টেনে মাথা আনার কৌশল? দুজন গার্মেন্টস মালিককেও গ্রেফতার করা হয়েছে জানা গেল, এরা দোষী কিনা সেটা যাচাই-এর কোন প্রয়োজন আছে বলে মনে হয় না। আর শুধু গ্রেফতার করলেই দায়মুক্তও হওয়া যাবে না। অবিলম্বে ওদের ফাঁসিতে ঝুলাতে হবে, ওদের যাবতীয় সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করতে হবে, ঐ সম্পত্তিতে শ্রমিকের রক্ত লেগে আছে, তাই ঐ অর্থ দিয়েই হতাহতদের পরিবারগুলোকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে।
মৃতরা ফিরবে না জানি,কিন্তু চরম শাস্তি না পেলে ঐ দোষীরা কিন্তু ঠিকই ফিরে আসবে আইনের ফাঁক গলিয়ে। তাই রক্তে ভেজা বাংলাদেশকে রক্ষা করতে হলে আইনের সুশাসন অত্যন্ত জরুরি, কালো আইন কোন দেশে কল্যাণ বয়ে আনে না, ধ্বংস ছাড়া।
লেখক :প্রভাষক, প্রাণিবিদ্যা, বাউফল কলেজ,পটুয়াখালী
shikha231960¦yahoo.com
