ব্যথার সাঁতার-পানি-ঘেরা/চোরাবালির চর,/ওরে পাগল! কে বেঁধেছিস/সেই চরে তোর ঘর। চোরাবালির চর। সমগ্র দেশটাই যেন আজ চোরাবালির চর। এ চরে ঘর বেঁধেছি আমরা পাগল জনতা। কখনো হরতাল সমর্থনের চোরাবালিতে ব্যাংক কর্মকর্তা খুন, কখনো হরতাল প্রতিরোধের চোরাবালিতে বিশ্বজিতের মৃত্যু। কখনো শেয়ার মার্কেট নামক চোরাবালিতে লাখ লাখ নিঃস্ব বিনিয়োগকারী। রেমিটেন্সের তকমা লাগিয়ে সুন্দর ভবিষ্যতের আশায় ভিন দেশে পাড়ি জমাতে গিয়ে সাগরে ভেসে থাকা। আর উচ্চ রপ্তানি আয়ের ক্ষুদ্র কারিগর পোশাক শ্রমিকতো প্রায়ই স্বপ্নের ভবিষ্যত্ তৈরিতে মৃত্যুকূপে পথহারা। প্রতিদিন দুঃসংবাদ। আরো দুঃসংবাদ। রক্তাক্ত মানুষের চিত্কার। ভয়াবহ মৃত্যুকূপ। ইট-সুরকি ঘেরা অন্ধকার প্রকোষ্ঠ। কখনো সে প্রকোষ্ঠে জ্বলন্ত অগ্নিশিখার উত্তাপ। কিছুক্ষণের মধ্যেই নিঃশব্দ। সব থেমে গেছে। মৃত্যুকূপে অঙ্গার হওয়া দেহ। সর্বত্র হাহাকার। দীর্ঘনিঃশ্বাস। আবার পথ চলা। ভয় নেই। কোথাও ভয় নেই। এতো প্রভুর মনোবাঞ্ছনা। এতো আধুনিক যুগের পোশাক প্রভুর লীলা। সর্বত্র মানবতার জন্য হুঙ্কার। সুশীল সমাজ, রাজনৈতিক সমাজ সবাই মানবিক। মানবতা রক্ষায় কত অর্থ বরাদ্দ। সেই অর্থের কিয়দংশতো ওয়ালমার্ট থেকেও আসে। কেন পোড়া দেহে কাজ নয়? কেন অন্ধকার প্রকোষ্ঠে আটকে পড়া বীভত্সদের চিত্কার? পাথরে চাপা পড়া শুয়ে থাকা দেহ। একটু একটু শ্বাস আসে আর যায়। হয়তো কিছুক্ষণ রবে। পাশে পচা উত্কট দুর্গন্ধ। এই অচেনা দুর্গন্ধ কখনো শোঁকেনি সে। প্রকোষ্ঠে হঠাত্ একটু আলোর ঝলসানি। চোখ দু’টি বালির স্তূপ থেকে জ্বল জ্বল করে উঠে। এই বুঝি মৃত্যুকূপ থেকে ছাড়া পাব। না, আর ছাড়পত্র পাওয়া যায় না। বুক পর্যন্ত ছেয়ে আছে ছাদের জমানো ইট-সুরকিগুলো। উদ্ধার কর্মীর দু’চোখের কোণায় দু’ফোটা জল। কাঁধে নেয়া গেল না। অসহায় অর্ধচাপা শ্রমিকটি তার সহকর্মীর পচা গন্ধ শুঁকছে আর নিঃশ্বাস বন্ধের প্রহর গুণছে। মনের অবলীলায় চোখের পাতা বুঁজতে বুঁজতে ধেয়ে আসে দুঃস্বপ্ন আর বিড় বিড় করে বলে উঠে এতো প্রভুর মনোবাঞ্ছনা। এতো আর কিছু নয়, এতো প্রভুর মৃত্যুক্ষুধা। প্রভুর অনেক অভাব। আর তাই কারখানার জন্য টেকসই ঘর কেনা দায়। দায় তার শ্রমিকদের মজুরিতেও। এতো টাকা কোথায় পাই। শ্রমিকের এতো ক্ষুধা! সে আমার ক্ষুধাকে হার মানাতে চায়। আমি তার প্রভু। আমার অনেক ক্ষুধা। তোমার মৃত্যুও আমার ক্ষুধা। এই মৃত্যুকূপ, যা তুমি দেখে অবাক হও, তার উপরই তো আমার মহীয়ান প্রাসাদ। আমার রাজনীতি, আমার অর্থ-কড়ি, তোমার সংস্কৃতি-ঐতিহ্য-এ সবকিছুই ঐ মৃত্যুকূপের উপর। তুমি ভয় পেয়ো না। আস্তে আস্তে শ্বাস নাও। কেউ শুনে ফেলবে। লাশের সংখ্যা বেড়ে যাবে। আমার জরিমানার অংক বাড়াইও না প্লীজ! রাষ্ট্রকে আমি বলেছি তোমরা মৃত্যু কমাও। রাষ্ট্র কথা দিয়েছে উদ্ধার কাজ স্থূল করবে। প্লিজ ৭২ ঘন্টা অপেক্ষা কর। তোমার জ্বালা থেমে যাবে। কেউ তোমার নিঃশ্বাসের শব্দ পাবে না। তোমার দুর্গন্ধ ছড়ানো সহকর্মীর গলা জড়িয়ে তুমিও চলে যেতে পারবে নিঃশ্বব্দের দেশে। ততক্ষণে আমি ভবনটি গুঁড়িয়ে দেব। কেউ পাবে না। তোমার এক টুকরো গলিত মাংসও না। কেউ জানবে না। তুমি একদিন এই পৃথিবীতে ছিলে। সেলাই কাজের দাসশ্রমিক হয়ে তুমিও প্রভুর মনোবাঞ্ছনায় মৃত্যুকূপে হারিয়ে গেছ। তুমি অলিখিত ইতিহাস। দেশের অর্থনীতি তোমার রক্ত দিয়ে মোড়ানো। ভেবো না, ডিএনএ পরীক্ষায় মিলে গেলে আমি তোমার আত্মীয়কে এক সময় বিশ হাজার টাকা দিয়ে দেবো। তোমার পরিবারও বেঁচে যাবে। আমি শ্রমিক পুষেছি ‘নিত্য অভাবের কুন্ড জ্বালাইয়া বুকে’, ‘আমি সাধিতেছি’ তোমাদের ‘মৃত্যু-যজ্ঞ পৈশাচিক সুখে’।
নীল আকাশ লাল হয়ে গেছে। ছবিটা তার ছোপ ছোপ লালের। লালপেড়ে শাড়ীটা পরে গিয়েছিল যে সেই নাজমা (ছদ্মনাম)। তার লাল শাড়ীটা দেখ কী সুন্দর দেখাচ্ছে। আরো উজ্জ্বল লাল হয়েছে তার রক্তে। যে গর্ভবতী, সন্তান পেটে নিয়ে মৃত্যুকূপে গিয়েছে, সে ওখানেই প্রসব করেছে। নবজাত শিশুর ক্রন্দন কানে বাজে অনেক উদ্ধার কর্মীর অথচ কিছুই করার নেই। অন্ধকার প্রকোষ্ঠে তাকেও যেতে হবে, মায়ের গলা ধরে এক ফুটা জল না পেয়ে। ঐ নূপুর পায়ে যে মেয়েটা এসেছিল, সে হয়তো অবিবাহিত। কত স্বপ্ন! অনেক টাকা হবে। পাঁচ বছর চাকরি করলে পঞ্চাশ হাজার। বিধবা মা বলেছেন কিছু টাকা জমাতে পারলে পাশের গ্রামের আব্দুর রহিমের সাথে বিয়ের ব্যবস্থা হবে। ঘটক ইতোমধ্যে দু’বার এসেও গেছে। মা! আর ক’টা দিন, তুমি সব ঠিকঠিক করে রেখো। আমি পঞ্চাশ হাজার টাকা প্রায় জমিয়ে ফেলেছি এই মৃত্যুকূপে এসে। আস্ত দেহটা মাটিতে ঢাকা যে মেয়েটার এক হাত ঝুলছিল তার নাম জুলেখা (ছদ্মনাম)। সে অনেক দূর থেকে এসেছে। সেই দিনাজপুর। তার চৌদ্দগোষ্ঠীও কোনদিন ঢাকায় আসেনি। সে এসেছে অসুস্থ বাবার চিকিত্সা খরচ মেটাতে। সবাই এই মৃত্যুকূপে জড়ো হয়েছে ভয়ঙ্কর অভাবের তাড়নায়। মেটে না অভাব, হাত সবার মৃত্যু দেবতার হাতে। ‘ছুটেছে পথিক, সাথে চলে পথ, অমানিশি চলে সাথে,/পথে পড়ে ঢলে, মৃত্যুর ছলে ধরে দেবতার হাতে’।
রাস্তায় সহিংসতা। খবরে শোনা গেল এ নাকি পোশাক শ্রমিকদের সহিংসতা। তারা নাকি উচ্ছৃঙ্খল হয়েছে। বড় লোকের গাড়ি ভেঙ্গে চুরমার করেছে। শত শত মৃত্যুকূপও ভেঙ্গে গুঁড়িয়ে দিয়েছে। ভদ্রলোকেরা উপদেশ দিচ্ছেন এতে কি হবে! ধ্বংসে মুক্তি নয়। তদন্ত কমিটি হয়েছে। দোষী ব্যক্তিরা শাস্তি পাবে। তবে ভয়ঙ্কর শাস্তি হবে যদি বিরোধী দলের লোকেরা ভবনটি নিয়ে নাড়াচাড়া করে থাকে। সাবধান আমরা গন্ধ পেয়েছি। বিচার হবে সেই মৃত্যু চোরদেরও যারা মূল্যবান জিনিসপত্র চুরি করতে ঝুঁকিপূর্ণ ভবনটিতে প্রবেশ করেছে। সবার বিচার হবে। দেখুন না আমারা ইতোমধ্যে যে পোশাক মালিকদেরকে আত্মসমর্পণ করতে আহবান করেছি তারা আমাদের কথায় সাড়া দিয়েছে। আমরা তাদেরকে রিমান্ডেও নিয়েছি। আর ভবন মালিকের কথা ভাবছেন, ওর চাচাতো বোন গ্রেফতার হয়েছে (রূপক অর্থে)। ওর ফোফাও (রূপক অর্থে)। আমরা তাদেরকেও রিমান্ডে নিব। তারা বলতে পারবে নিশ্চয় এই হত্যাকান্ডের রহস্য। আপনারা ক্ষুব্ধ হবেন না। আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী সজাগ আছে। অচিরেই চিরুনী অভিযান শুরু হবে। ভবন ধসের সাথে জড়িত কেউই বাড়িতে থাকতে পারবে না। তাদেরকে অবশ্যই পাঁচ তারকা হোটেলে উঠতে হবে অথবা বিদেশে থাকতে হবে। সেখানে আমাদের পুলিশের কেউই যেতে পারবে না। তারা জানবেও না, জানতে চাইবেও না। চুপ! বুঝবেন না। এতো সবজান্তা ভোলনাথের সর্দারি, তার কৌশল।
আকাশ ভেঙ্গে পড়বে না কারখানা মালিকদের উপর। দু’চারটা দিন কষ্ট করলেই হবে। তাজরীনের মালিক কষ্ট করেনি? ক’দিন বাদে সে’দিন সেইতো বিজিএমইএ’র নির্বাচনে কত উত্কণ্ঠিত, নির্বাচনের ফলাফলকে পক্ষে-বিপক্ষে নিতে। আপনারা চিন্তা করবেন না। পরিবেশ শান্ত হলে আপনারা আবার ফিরে যাবেন আপনাদের কারখানায়। পুঁজির চিন্তা করছেন। কিচ্ছু ভাববেন না। রাষ্ট্র আছে না? ব্যাংক আছে। দ্বিগুণ পুঁজি দেয়া হবে পুরস্কার স্বরূপ। আরো বড় কারখানা করতে পারবেন। আরো বড় মৃত্যুকূপ, তখন আবার কোন এক জননী মাগিবে ‘ভিক্ষা ঢেকে রেখে ঘরে ছেলের লাশ।’
এ হলো আমাদের প্রিয় স্বদেশ। যেখানে অসংখ্য মৃত্যুকূপ। মৃত্যুকূপের মালিকগণ হয় পুরস্কৃত। এই জন্যই কি হার্বার্ট স্পেন্সার, কার্ল মার্ক্স রাষ্ট্রকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়েছে। রাষ্ট্র বড় লোকদের। হরতাল সমর্থক বড় লোকেরা, হরতাল প্রতিরোধকারী বড় লোকেরা, শেয়ার বাজারের বড় লোকেরা, সুশীল সমাজের সভ্যরা, সংস্কৃতির নেতারা এই রাষ্ট্রের মালিক। এখানে গণতন্ত্র তাদের জন্য। সম্পদ, আইন, বিচার তাদের জন্য। তারা উপহাস করে মৃত্যুকে নিয়ে। তাদের সকলেরই ক্ষুধা-মৃত্যুক্ষুধা। হে পাথরে চাপা পড়া শ্রমিক, তুমি ‘প্রার্থনা করো-যারা কেড়ে খায় তেত্রিশ (ষোল) কোটি মানুষের গ্রাস, যেন লেখা হয় আমার রক্ত-লেখায় তাদের সর্বনাশ।’
যা হোক, ইতিমধ্যে রানা গ্রেফতার হয়েছে। সরকারকে ধন্যবাদ। তবে তাজনীন মালিকের ভাগ্য তার যেন না হয়। রানা যেন নায়ক না হয়ে উঠে—এ প্রত্যাশা রইলো। রানাকে হেলিকপ্টারে আনা হয়েছে; কিন্তু উদ্ধার অভিযানে হেলিকপ্টার প্রয়োজন হয়নি। ন্যায়বিচার চাই।
লেখক :শিক্ষক, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
