সাভার ট্র্যাজেডি ও কতিপয় সুপারিশ

আপডেট : ২৮ এপ্রিল ২০১৩, ২১:২৩
যখন এই লেখা লিখতে বসেছি তখন গোটা দেশ কাঁদছে, সাভারে ধসে পড়া রানা প্লাজার কংক্রিটের ধ্বংসস্তূপে চাপা পড়ে মৃতের সংখ্যা তিনশ’ নব্বই ছাড়িয়ে গেছে। উদ্ধারকারীদের আশংকা, মৃতের সংখ্যা আরও বাড়বে, ধসে পড়া ভবনের ধ্বংসস্তূপে চাপা পড়ে আছে অনেক লাশ। জীবিতদের অনেকে হাত-পা হারিয়ে সারা জীবনের জন্য পংগু হয়ে গেছে। দৈনিক পত্রিকার পাতায় শত প্রাণের বাঁচার আকুতি পড়ে, স্বজনদের আহাজারির ছবি দেখে, টেলিভিশনে লাইভ উদ্ধার অভিযানের বর্ণনা শুনতে শুনতে ব্যথায় হূদয়ে রক্তক্ষরণ হয়, চোখ ভিজে যায় জলে। বিভিন্ন উেসর তথ্যানুযায়ী বিধ্বস্ত ভবন রানা প্লাজা নির্মাণের ক্ষেত্রে প্রচলিত নির্মাণ বিধি ও স্বীকৃত বিল্ডিং কোড অনুসরণ করা হয়নি। সাভার পৌরসভা থেকে ছয় তলা ভবনের লে-আউট প্লান অনুমোদন নিয়ে নয় তলা নির্মাণ করা হয়েছে। ভবনটি যেখানে তৈরি হয়েছে সেটি ছিল একটি হাজামজা ডোবা। ভবন মালিক সেই ডোবা ভরাট করে তদস্থলে প্রথমে ছয় তলা ও পরবর্তীতে ছয় তলার উপর আরও তিন তলা মোট নয় তলা নির্মাণ করে। ভবনের বেজমেন্টে মালিকের অফিস, প্রথম ও দ্বিতীয় তলায় ইলেকট্রনিক্স, কমিপউটার সামগ্রী ও পোশাকের দোকান, ফাস্ট ফুড, ব্যাংক ইত্যাদি এবং তৃতীয় থেকে অষ্টম তলা পর্যন্ত গার্মেন্টস কারখানা ছিল। ধসের একদিন আগে অর্থাত্ ২৩ এপ্রিল ২০১৩ মঙ্গলবার এই ভবনের তৃতীয় তলায় কলামে ফাটল দেখা দেয়। স্থানীয় একজন প্রকৌশলী তা সরেজমিনে দেখে দালানের ব্যবহার বন্ধ রেখে বিশেষজ্ঞ প্রকৌশলীর মতামত গ্রহণের সুপারিশ করে। সংশ্লিষ্টরা ঐ প্রকৌশলীর কথায় কর্ণপাত করেনি। ভবনের ব্যবহার বন্ধ না করে গার্মেন্টস কারখানা চালু রাখে, যা চরম দায়িত্বহীনতার পরিচয় বহন করে। পরদিন গার্মেন্টস শ্রমিকরা বাধ্য হয়ে ঝুঁকিপুর্ণ ভবনের মধ্যে কাজ শুরু করে। সকাল নয়টার দিকে ভবনটি ধসে (collapse) পড়ে। ভবন নির্মাণে যে গুণগত মানের দিকটি যথেষ্ট অবহেলা করা হয়েছে তা ধসে পড়া ভবনের গুঁড়ো গুঁড়ো হয়ে যাওয়া কংক্রিট দেখে যে কারও কাছেই দিবালোকের মত পষ্ট হয়ে ওঠে। ভূমিকম্প বা অন্য কোন কারণে কোন ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হলে প্রাণহানি হ্রাসের মূলনীতি হল ভবনের ডিজাইন ও নির্মাণ এমন হতে হবে যেন ভবন ভেঙে পড়ার সাথে সাথে পুরোপুরি বিধ্বস্ত না হয়ে কিছু সময় কাঠামোগতভাবে দাঁড়িয়ে থাকতে পারে এবং ভবনের ভিতরে আটকে পড়া মানুষ দ্রুত বের হয়ে আসতে পারে। রানা প্লাজা ভবন ধসের ক্ষেত্রে এটি পরিলক্ষিত হয়নি। আন্ডারসাইজ কলাম, অত্যন্ত নিম্নমানের কংক্রিট ও সেটেলমেন্ট ফেলিয়র একত্রিত হয়ে ভবনটি ধসে (collapse) পড়ে ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। উপরের লাব নিচের লাবের সাথে লেপ্টে গেছে এবং নিচের ফ্লোরগুলো মাটিতে দেবে গেছে। ব্যবহারের ধরন ও ব্যবহারকারীর বৈশিষ্ট্য অনুযায়ী বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোডে বিভিন্ন ধরনের দালানকে বিভিন্ন ক্যাটাগরিতে ভাগ করা হয়েছে, যেমন-আবাসিক, শিক্ষা, ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্প-কারখানা, গোডাউন ইত্যাদি। একটি গার্মেন্টস কারখানার সেফটি স্ট্যান্ডার্ড, সিঁড়ির সংখ্যা ও প্রশস্ততা একটি আবাসিক ভবনের চেয়ে ভিন্ন হয়। আবার একটি মার্কেট ভবন যে লাইভ লোড ধরে ডিজাইন করা হয়, একটি কারখানা ভবন ডিজাইনে তার চেয়ে অনেক বেশি লাইভ লোড বিবেচনা করা হয়। কারণ কারখানা ভবনে একসংগে অনেক লোক কাজ করে, থাকে অনেক ধরনের মেশিনারিজ এবং ঐসব মেশিনারিজ এর ভাইব্রেশন। একটি ভবনের লাইভ লোড যখন বাড়ে, তখন লাবের পুরুত্ব, বিম ও কলামের সাইজ বেড়ে যায়। ফলে ডেড লোডও বাড়ে। এইসব ডেড ও লাইভ লোড বিম দ্বারা কলামে এবং কলাম দ্বারা ফাউন্ডেশনের মাধ্যমে মাটিতে ট্রান্সফার হয়। কাজেই একটি কারখানা ভবনের ফাউন্ডেশন আর একটি মার্কেট কমপ্লেক্সের ফাউন্ডেশন এক হয় না। সার্বিক লোড বিবেচনায় কারখানা ভবনে হেভি ফাউন্ডেশন দরকার হয়। আবার ফাউন্ডেশনের তলার মাটি ভবনের ভার বহনের উপযোগী কিনা তা জানার জন্য বহুতল ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে মাটির ধরন অনুযায়ী ৬০-১০০ ফুট গভীরতা পর্যন্ত মাটির গুণাগুণ পরীক্ষা করে দেখা প্রয়োজন। মাটির ভার বহন ক্ষমতা কম হলে দালানে ম্যাট অথবা পাইল ফাউন্ডেশন দেওয়া হয়। ভবনের ক্যাটাগরি অনুযায়ী স্বীকৃত বিল্ডিং কোড মেনে লোড এনালিসিস করে ডিজাইন তৈরি করা হয় যা একটি জটিল গাণিতিক প্রক্রিয়া। এজন্য ডিজাইন ইঞ্জিনিয়ারকে হতে হবে একজন অভিজ্ঞ ডিগ্রীধারী প্রকৌশলী। এরপর আসে নির্মাণের জন্য মালামাল সংগ্রহের কাজ। ইট, পাথর, বালু, সিমেন্ট, পানি, রড কোনটি নিম্নমানের হলে হবে না। কাজে ব্যবহারের পূর্বে ল্যাবরেটরী পরীক্ষা করে মালামালের গুণাগুণ যাচাই করতে হবে। সিমেন্ট, বালু, খোয়ার অনুপাত অবশ্যই ডিজাইন অনুযায়ী হবে এবং পান করা যায় এমন পরিষ্কার পানি নির্মাণ কাজে ব্যবহার করতে হবে। দালানের রড বাইন্ডিং একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, যা ডিজাইন অনুযায়ী সঠিক হতে হবে। সেন্টারিং, সাটারিং, ফর্মওয়ার্ক, কংক্রিট তৈরি, স্থাপন ও কম্প্যাকশন প্রতিটি ক্ষেত্রে নিয়ম মেনে কাজ করতে হবে। কাজেই একজন সিভিল ইঞ্জিনিয়ারের তদারকিতে নির্মাণ কাজ বাস্তবায়ন করতে হবে। এছাড়া বহুতল ভবনের ইলেক্ট্র্রিক্যাল কাজের জন্য একজন ইলেকট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার দিয়ে ডিজাইন ও কাজ তদারকি করা আবশ্যক। আবার workmanship ভাল না হলে অর্থাত্ মিস্ত্রী ও শ্রমিকদের অদক্ষতার কারণেও একটি ভবন ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। যেমন বহুতল ভবনের কলামগুলো খাড়াভাবে পুরোপুরি সোজা (true to vertical) হতে হবে। ভূমিকমপ বা অন্য কোন প্রচন্ড ঝাঁকুনিতে যাতে বিম-কলাম বা কলাম-ফুটিং সংযোগ খুলে না যায় সেজন্য সংযোগস্থলে রড বাইন্ডিং ও ঢালাই এর কাজ, লোহার রিং এর হুক, কংক্রিটের পানি-সিমেন্ট অনুপাত ইত্যাদি নকশা ও স্পেসিফিকেশন মোতাবেক যথাযথ হতে হবে। এ ব্যাপারে রডমিস্ত্রী ও রাজমিস্ত্রীকে যথেষ্ট দক্ষ ও যত্নশীল হতে হবে। এজন্য ভকেশনাল ইনস্টিটিউট বা কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের (টিটিসি) মাধ্যমে সার্টিফিকেট কোর্স চালু করে রডমিস্ত্রী ও রাজমিস্ত্রীদের উপযুক্ত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারে। সকল নিয়ম-কানুন যথাযথভাবে মেনে ভবনের নির্মাণ কাজ সম্পন্ন হয়েছে কিনা তা নিশ্চিত করার জন্য Occupancy Certificate-এর বাধ্যবাধকতা অপরিহার্য। অর্থাত্ ভবন নির্মাণের পূর্বে নকশার অনুমোদন গ্রহণ করতে হবে এবং সমাপ্তির পর যথাযথ কারিগরি তদারকির মাধ্যমে অনুমোদিত স্থাপত্য ও কাঠামো নকশা মোতাবেক নির্মাণ কাজ সমপন্ন হয়েছে এবং তা প্রকৃত অর্থে ব্যবহার উপযোগী হয়েছে মর্মে সনদ গ্রহণ করতে হবে। রানা প্লাজা ভবন নির্মাণের ক্ষেত্রে এগুলোর কোনটিই প্রতিপালিত হয়নি বলে ধারণা করা যায়। ফলে ঘটেছে মহাবিপর্যয়। কাজেই আমরা যদি আমাদের গার্মেন্টস কারখানাগুলোতে অগ্নি দুর্ঘটনা রোধ করতে চাই, ভূমিকমেপর মত অনিশ্চিত বিপদের হাত থেকে নিজেদের রক্ষা করতে চাই, দালান ধসে ধ্বংসস্তূপে চাপা পড়ে জীবিত মানুষের লাশ দেখতে না চাই, দেশের নির্মাণ শিল্পে সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা ফিরিয়ে আনতে চাই তাহলে দালান ও স্থাপনা নির্মাণে স্বীকৃত বিল্ডিং কোড ও প্রচলিত ইমারত বিধিমালা মেনে চলা ছাড়া গত্যন্তর নেই। যদিও রানা প্লাজার উদ্ধার কার্যক্রমে সেনাবাহিনী, ফায়ার সার্ভিস, বিজিবি, র্যাব-পুলিশসহ স্বেচ্ছাসেবকগণ যথেষ্ট সক্ষমতার পরিচয় দিয়েছেন তথাপি আমাদের মনে রাখতে হবে যে, এটি একটিমাত্র ভবন ধসের ঘটনা। ভূমিকমেপর মত ব্যাপক দুর্যোগ পরবর্তী উদ্ধার কার্যক্রমের বিষয়ে এখনই আমাদের প্রস্তুতি গ্রহণ করতে হবে। কাজেই দুর্যোগ পরবর্তী উদ্ধার কার্যক্রমের জন্য পৃথিবীর অন্যান্য দেশের মত আমাদের দেশেও একটি পৃথক সংস্থা প্রতিষ্ঠা করে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি দিয়ে সুসজ্জিত করা দরকার। প্রতিটি পাড়ায়-মহল্লায় আগ্রহীদের প্রশিক্ষণ দিয়ে দেশব্যাপী স্বেচ্ছাসেবী বাহিনীর শক্তিশালী নেটওয়ার্ক গড়ে তোলা প্রয়োজন। সাভার ট্র্যাজেডির মত দুর্ঘটনার পুনরাবৃত্তি রোধে কতিপয় সুপারিশ  দেশের যে কোন স্থানে বহুতল দালান নির্মাণের ক্ষেত্রে উপযুক্ত কর্তৃপক্ষের নিকট থেকে স্থাপত্য ও কাঠামো নকশার অনুমোদন গ্রহণের ব্যবস্থা করতে হবে।  মাটি পরীক্ষার পর অভিজ্ঞ ডিগ্রীধারী প্রকৌশলী দিয়ে সঠিক ডিজাইনের ভিত্তিতে গুণগত মান বজায় রেখে দালান নির্মাণের প্রয়োজনীয়তা সমপর্কে প্রচারণার মাধ্যমে জনসচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে।  প্রচলিত বিল্ডিং কোড ও ইমারত বিধিমালা মেনে দালান ডিজাইন ও নির্মাণ করতে হবে। বিল্ডিং কোড আইনে পরিণত করে কোড আমান্যকারীদের শাস্তির বিধান নিশ্চিত করতে হবে।  দালানে বিভিন্ন সার্ভিস যথাঃ পানি, বিদ্যুত্, গ্যাস ইত্যাদি সংযোগ প্রদানের পূর্বে Occupancy Certificate প্রদানের বাধ্যবাধকতা আরোপ করতে হবে।  ভকেশনাল ইনস্টিটিউট ও কারিগরি প্রশিক্ষণ কেন্দ্রের মাধ্যমে উপযুক্ত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করে শ্রমিক, মিস্ত্রীদের দক্ষতা বাড়াতে হবে।  ব্যাংক ও অর্থ লগ্নিকারী প্রতিষ্ঠান কর্তৃক ঋণ প্রদানের পূর্বে দালানের নকশা ও ডিজাইন তৈরিতে কোডাল স্ট্যান্ডার্ড অনুসরণ করা হয়েছে কিনা তা পরীক্ষা করে দেখতে হবে।  এক উদ্দেশে দালান নির্মাণ করে অন্য উদ্দেশে ব্যবহার করা যাবে না অর্থাত্ আবাসিক বা মার্কেট হিসাবে নির্মিত কোন দালান কারখানা বা গোডাউন হিসাবে ব্যবহার করা যাবে না।  নতুন ও পুরাতন সকল ঝুঁকিপূর্ণ দালান চিহ্নিত করে শক্তিশালী করার ব্যবস্থা নিতে হবে।  দুর্যোগ পরবর্তী ত্বরিত উদ্ধার কার্যক্রমের জন্য একটি পৃথক সংস্থা গঠন করে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতি দিয়ে সুসজ্জিত করতে হবে। প্রতিটি পাড়ায়-মহল্লায় আগ্রহীদের উপযুক্ত প্রশিক্ষণ দিয়ে দেশব্যাপী স্বেচ্ছাসেবক বাহিনীর শক্তিশালী নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে হবে। লেখক :তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী, যশোর গণপূর্ত সার্কেল, যশোর ও চেয়ারম্যান, আইইবি, যশোর কেন্দ্র

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন