লাশ পাশে নিয়ে এবারের মে দিবস

আপডেট : ২৮ এপ্রিল ২০১৩, ২১:৩০
আগামী পরশু পহেলা মে। মহান মে দিবস। শ্রমিক শ্রেণির সংগ্রামের প্রতীকী দিন, তাদের বিজয় উত্সবের দিন, আন্তর্জাতিক সংহতির দিন। সেদিন শ্রমিকের বুকের রক্তে লাল হয়ে ওঠা ঝাণ্ডা পরিণত হয় শ্রমিকের রক্ত পতাকায়। সব দেশের শ্রমিক ও মেহনতী মানুষের সাধারণ বিশ্বজনীন রণধ্বনি হয়ে ওঠে—দুনিয়ার মজদুর এক হও। ‘মে-দিবসের কবিতা’-য় সুভাষ মুখোপাধ্যায় লিখেছেন— চিমনির মুখে শোনো সাইরেন— শঙ্খ, গান গায় হাতুড়ি ও কাস্তে, তিল তিল মরণেও জীবন অসংখ্য জীবনকে চায় ভালবাসতে। ............................ শতাব্দী লাঞ্ছিত আর্তের কান্না প্রতি নিঃশ্বাসে আনে লজ্জা; মৃত্যুর ভয়ে ভীরু বসে থাকা, আর না— পরো পরো যুদ্ধের সজ্জা। এবারের মে দিবসের ঠিক এক সপ্তাহ আগে সাভারে রানা প্লাজায় গার্মেন্ট কারখানা ধসে পড়ে শত শত শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। চতুর্দিকে লাশ আর লাশ। হাজার হাজার আহত শ্রমিকের আর্তনাদ। অগণিত স্বজনের আহাজারি। বাংলাদেশের শ্রমিকদের জন্য এবার এটিই ছিল মালিক শ্রেণির পক্ষ থেকে শ্রমিক শ্রেণির জন্য মে দিবসের আগাম উপহার। তীব্র বেদনা ও বিস্ফোরণোন্মুখ ক্ষোভ নিয়ে বাংলাদেশের শ্রমিক ও মেহনতী মানুষরা এবারের মে দিবস পালন করতে যাচ্ছে। রোদনের মাঝেই এবারের মে দিবসের বসন্ত। পাকিস্তানের যুগে তখনকার সরকার মে দিবস পালন করাটাকে গুরুতর অপরাধ বলে গণ্য করতো। মে দিবস পালনকে বিবেচনা করা হতো কমিউনিস্ট অন্তর্ঘাত, বিদ্রোহ-বিপ্লবের প্রস্তুতি কাজ ও পাকিস্তানের অস্তিত্বের জন্য ‘খতরনাক’ হিসেবে। প্রবল নজরদারি ও রক্তচক্ষুকে ফাঁকি দিয়ে সে সময় আমাদের মে দিবস পালন। দালাল ট্রেড ইউনিয়ন আয়োজিত বৈকালিক শ্রমিক সভায় উপস্থিত থেকে শ্রমিকদের সাথে কিছুটা সময় কাটানো ও তাদের সাথে কথাবার্তা বলার চেষ্টা অন্ততঃ করতাম। সন্ধ্যার পর কোনো নিভৃত ঘরে হারিকেন জ্বালিয়ে গোপনে মে দিবসের সভা করতাম। বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর রাষ্ট্রীয়ভাবে মে দিবস পালন করা হয়ে থাকে। রাষ্ট্রীয় অনুষ্ঠানাদির পাশাপাশি শ্রমিকরা তাদের ট্রেড ইউনিয়নগুলোর উদ্যোগে প্রকাশ্যে ঢাক-ঢোল পিটিয়ে আনন্দ-উল্লাস সহযোগে সমাবেশ-মিছিল-সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের মাধ্যমে সকালে ও সন্ধ্যায়, শহরের কেন্দ্রে ও নিজ নিজ এলাকায়, মে দিবস পালন করে থাকে। দিনটি ১৯৭২ সাল থেকেই সরকারি ছুটির দিন। এসব অর্জন সম্ভব হয়েছে পাকিস্তান আমলে ও মুক্তিযুদ্ধের সময়ের জাতীয় সংগ্রামে এদেশের শ্রমিক শ্রেণির অমূল্য অবদানের ফলশ্রুতিতে। মে দিবস মর্যাদা পেয়েছে। কিন্তু যাদের রক্তে রাঙানো সংগ্রামের স্বীকৃতিরূপে এ দিবসটি পালিত হয়, সেই শ্রমিক ও মেহনতী মানুষরা রাষ্ট্রীয়, সামাজিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক কোনো ক্ষেত্রেই আজও এদেশে তাদের ন্যূনতম মর্যাদা ও অধিকার লাভ করেনি। মে দিবসকে মাকাল ফল বানিয়ে রাখা হয়েছে,—উপরে-উপরে আনুষ্ঠানিকতায় বাহারি ছাপ লাগলেও ভেতরটা অন্তঃসারশূন্য করে রাখা হয়েছে। এ যেন—‘তোমার পূজার ছলেই তোমায় ভুলে থাকি’। এতে অবাক হওয়ার কিছু নেই। কারণ সাম্রাজ্যবাদের পদলেহনকারী লুটেরা পুঁজিবাদীদের পরিচালিত আর্থ-সামাজিক ও রাজনৈতিক ব্যবস্থায় শ্রমিক ও মেহনতী শ্রেণি শোষণ-বঞ্চনা-অবহেলা-অমর্যাদা ছাড়া অন্য কিছু আশা করতে পারে না। বাংলাদেশে তারা ‘তৃতীয় শ্রেণির নাগরিক’ রূপে ৪২ বছর ধরে দিন কাটাচ্ছে। এই সমাজে শ্রমিকদেরকে মানুষ হিসেবে গণ্য করা হয় না। একজন শ্রমিক মরলো কি বাঁচলো তাতে মালিক বা সরকারের যেন কিছুই আসে যায় না। একজন গার্মেন্টের শ্রমিক রহিমা, সালেহা, মকবুল মরলে পরদিনই ১০০ টাকায় আরেকজন হালিমা, মাজেদা, শামসুলকে পাওয়া যাবে। একজন ‘মানুষ’ হিসেবে তাদেরকে গণ্য করা হয় না। তাদের মূল্য কেবল এই কারণে যে, তারা শ্রমশক্তির যোগানদাতা। মানুষের শ্রমশক্তি এমন একটি ‘পণ্য’ যার ব্যবহার দ্বারা ‘উদ্বৃত্ত মূল্য’ সৃষ্টি হয়। উত্পাদনের উপকরণাদির ওপর তার মালিকানার সুবাদে মালিক এককভাবে এই উদ্বৃত্ত মূল্য নিয়ে নেয়। মালিকানার এই ‘অধিকারকে’ বুর্জোয়া রাষ্ট্র তার আইন-কানুন, বিচারালয়, প্রশাসন ইত্যাদির মাধ্যমে সুরক্ষার ব্যবস্থা করে। সৃষ্টি হয় মজুরি-দাসত্বের আধুনিক শোষণ ব্যবস্থা। গত ২৪ এপ্রিল সাভার বাজার স্ট্যান্ডে অবস্থিত রানা প্লাজা বিল্ডিং ধসে পড়ে শত-শত গার্মেন্ট শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। প্রায় ২ হাজার শ্রমিক আহত হয়েছে। এর আগে আশুলিয়ার স্পেকট্রাম ও তেজগাঁর ফোনিক্স কারখানা এরকমভাবে ধসে পড়ে। তাছাড়া, অসংখ্য কারখানায় আগুনে পুড়ে সহস্রাধিক শ্রমিকের মৃত্যু হয়েছে। গত নভেম্বরে আশুলিয়ায় তাজরীন গার্মেন্টসে এবং আদাবরে স্মার্ট গার্মেন্টসে দেড় শতাধিক শ্রমিক আগুনে পুড়ে ছাই হয়েছে। এতো মানুষের মৃত্যু! তাছাড়া শুধু আকস্মিক একটি ঘটনার বিষয় এসব নয়। একটির পর আরেকটি, —এভাবে ঘটনার পর ঘটনা ঘটে চলেছে। যেহেতু একই ধরনের অবহেলার কারণে উপর্যুপরি এসব হত্যাকাণ্ডের ঘটনা ঘটছে তাই এগুলোকে সচেতন ও পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড বলে আখ্যায়িত করা যায়। তাছাড়া এভাবে শত-সহস্র মানুষের মৃত্যুকে এক ধরনের মানবতাবিরোধী অপরাধ ও গণহত্যা বলে চিহ্নিত করাও যুক্তিসংগত। অথচ এসব হত্যাকাণ্ডের জন্য আজ পর্যন্ত একজন মালিককেও উপযুক্ত শাস্তি দেয়া হয়নি। তাই, শ্রমিক হত্যা চলছেই। এবারের মে দিবসে শ্রমিকদের সামনে ‘কর্মক্ষেত্রে জীবনের নিরাপত্তা’সহ উপযুক্ত কার্যপরিবেশ নিশ্চিত করার বিষয়টি স্বাভাবিকভাবে বিশেষ গুরুত্বসহ সামনে থাকবে। (রানা প্লাজার গার্মেন্টসের শ্রমিক হত্যাকাণ্ড নিয়ে আগামীতে বিস্তারিত লিখবো- লেখক) বাংলাদেশের শ্রমিকদের কাছে এবারের মে দিবসে অপর প্রধান দাবিটি হলো জাতীয় ন্যূনতম মজুরি হিসাবে ৮ হাজার টাকা নির্ধারণের দাবি। দারিদ্র্যসীমার উপরে থাকতে হলে একজন মানুষের অন্ততঃ ২১০০ কিলো ক্যালরি খাদ্য মানের সমপরিমাণ আহার করা অপরিহার্য। এটুকু নিশ্চিত করতে দৈনিক খরচ প্রয়োজন হয় ৭৫ টাকার বেশি। একজন শ্রমিককে তার আহারের পেছনে ব্যয় করতে হয় তার আয়ের ৪৫%। অবশিষ্ট ৫৫% প্রয়োজন হয় বাসস্থান, চিকিত্সা, কাপড়-চোপড় ইত্যাদির জন্য। সেই হিসেবে অবশিষ্ট এসবের জন্য প্রয়োজন হয় আরো ৯০ টাকার মতো। অর্থাত্ দারিদ্র্যসীমার উপরে থাকার জন্য একজন শ্রমিকের ন্যূনতম মোট ১৬৫ টাকা আয় করা অত্যাবশ্যক হয়। সেই হিসেবে চারজনের একটি পরিবারকে দারিদ্র্যসীমার উপরে রাখতে দৈনিক ৬৬০ টাকা রোজগার করা প্রয়োজন হয়। অর্থাত্ সংসারের মাসিক আয় হওয়া উচিত১৯ হাজার ৮০০ টাকা। পরিবারে দুইজন কর্মক্ষম মানুষ থাকলে প্রতিজনের আয় করা প্রয়োজন ৯ হাজার ৯০০ টাকা। অতএব, ৮ হাজার টাকা জাতীয় ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণের দাবিটি হলো, কোনোক্রমে নিছক দারিদ্র্যসীমায় বেঁচে থাকার প্রয়োজনের সাথে সংগতিপূর্ণ ন্যূনতম দাবি। এ দাবিকে অগ্রাহ্য করার অর্থ হলো কোটি- কোটি শ্রমজীবী মানুষকে দারিদ্র্যের মাঝে রেখে তাদের রক্ত নিংড়ানো শ্রমপ্রসূত উদ্বৃত্ত মূল্য আত্মসাত্ করে মুনাফার পাহাড় গড়ার সুযোগ সৃষ্টি করা। বহুল প্রচারিত সহস্রাব্দ উন্নয়ন লক্ষ্যমাত্রা (Millenium Developement Goal)-এ ২০১৫ সালের মধ্যে এদেশে দারিদ্র্য হার ৫০% কমিয়ে ফেলার টার্গেট নির্ধারণ করা হয়েছে। এ সময়ের মধ্যে ন্যূনতম মাথাপিছু আয় ২ ডলার (প্রায় ১৬০ টাকা) নিশ্চিত করা হবে বলে বহুদিন ধরে ঢাকঢোল পিটিয়ে প্রচার করা হচ্ছে। অর্থাত্, ২০১৫ সালের মধ্যে চার সদস্যের একটি শ্রমিক পরিবারের মাসিক আয় ন্যূনতম ২৪০ ডলার ( ১৯ হাজার টাকার মতো) নিশ্চিত করা হবে বলে বলা হচ্ছে। পরিবারে দুইজন উপার্জনক্ষম মানুষ থাকলে আগামী দেড়-দুই বছরের মধ্যে প্রত্যেকের মাসিক আয় ৯ হাজার ৫০০ টাকা নিশ্চিত করতে হবে। তাহলে এখনই কি জাতীয় ন্যূনতম মজুরি হিসেবে ৮ হাজার টাকা নির্ধারণ করাটা আবশ্যক নয়? গার্মেন্ট খাতসহ সব শিল্প খাতের জন্য নতুন মজুরি কাঠামো নির্ধারণ করা অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। প্রায় তিন বছর আগে গার্মেন্ট শিল্পে ৫ হাজার টাকা ন্যূনতম মজুরি দাবি করলেও সরকার-মালিকপক্ষের আঁতাতে শ্রমিকদের ওপর ৩ হাজার টাকার ন্যূনতম মজুরি স্কেল চাপিয়ে দেয়া হয়েছিল। গত ৩ বছরে মূল্যস্ফীতি বছর বছর দুই অঙ্কের হারে বেড়েছে। সেই হিসেবে তিন বছর আগে একটি নির্দিষ্ট আয়ের টাকায় যে পরিমাণ খাদ্য ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় সামগ্রী বাজার থেকে কেনা সম্ভব হতো, সেই একই পরিমাণ সামগ্রী কেনার জন্য আগের তুলনায় বর্তমানে ৫০ শতাংশের বেশি অর্থের প্রয়োজন। সেই বিবেচনায় সবস্তরে মজুরির হার কমপক্ষে ৫০ শতাংশ বৃদ্ধি করলে বলা যাবে যে শ্রমিকের ‘প্রকৃত আয়’ ‘অর্থাত্ ক্রয় ক্ষমতা’ আগের অবস্থাতে রাখা সম্ভব হয়েছে। কিন্তু তিন বছর ধরে মজুরি বৃদ্ধি না করা সত্ত্বেও মূল্যস্ফীতির কারণে শ্রমিকের ক্রয়ক্ষমতা তথা ‘প্রকৃত মজুরি’ বৃদ্ধি বা ্আগের মতো থাকা তো দূরের কথা, তা বস্তুত প্রায় ৪০% কমে গেছে। এ এক আজব দেশ! এদেশের বাজারে সব জিনিসের দাম বাড়ে, কিন্তু কমে শুধু শ্রমিকের ‘প্রকৃত আয়’। এবারের মে দিবসে এদেশের শ্রমিকদের সামনে আরেকটি বড় ইস্যু হলো শ্রম আইন। শ্রম আইন নিয়ে বহুদিন ধরে তালবাহানা করা হচ্ছে। সমঝোতামূলকভাবে প্রস্তুত করা শ্রম আইনের খসড়াটি মালিকদের সংগঠন এক ধরনের ভেটো দিয়ে আটকে রেখেছে। তাদের দাবি এই খসড়া যথেষ্ট পরিমাণে মালিকবান্ধব নয়। অনেক বিষয়ে তারা তাদের আপত্তি জানিয়ে সেসব ক্ষেত্রে শ্রমিকের স্বার্থ ক্ষুণ্ন করে সংশোধনী আনার প্রস্তাব দিয়ে রেখেছে। শ্রমিকের স্বার্থ রক্ষার জন্য শ্রম আইন করা হয়। সেটি শ্রমিক বান্ধব হবে,—এটা প্রত্যাশা করাই স্বাভাবিক। সেটা কেন আরো মালিকবান্ধব হলো না—এমন প্রশ্নও যে তোলা যেতে পারে, সেটিও এক কম তামাশার বিষয় নয়। পাগলামি আবদার ছাড়া এসবকে আর কি বলা যায়। গত সপ্তাহে মন্ত্রিসভার বৈঠকে শ্রম আইন অনুমোদন করা হয়েছে। সেখানে শ্রমিকের স্বার্থ পরিপূর্ণভাবে রক্ষা করা হয়নি। শ্রমিকের স্বার্থে শ্রম আইনের জন্য লড়াই চালিয়ে যাওয়ার জন্য এবারের মে দিবসে শ্রমিকরা শপথ নিবে। শ্রমিক ও মেহনতী মানুষদের ভাত-কাপড়ের সমস্যার শেষ নেই। উন্নত জীবনের জন্য তাদেরকে শ্রেণি-সচেতন হয়ে রুটি-রুজির জন্য সংগ্রাম করা ছাড়া গত্যন্তর নেই। কিন্তু দেশের অন্য ঘটনাবলীর প্রতিও তারা চোখ বন্ধ করে থাকতে পারে না। দেশের প্রাকৃতিক সম্পদ রক্ষা, পরিবেশ রক্ষা, সাম্রাজ্যবাদী আধিপত্ব ও ষড়যন্ত্র প্রতিরোধ, গণতন্ত্র ও গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষা ও সম্প্রসারণ, সাম্প্রদায়িকতা রুখে দাঁড়ানো ইত্যাদি বিষয় শ্রমিক শ্রেণির স্বার্থের সাথে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পর্কিত। বিশ্বব্যাপী প্রগতিশীল আন্দোলনগুলোকে সমর্থন জানিয়ে সংহতি গড়ে তোলার কাজটিও সব দেশের শ্রমিক শ্রেণির স্বার্থের সাথে নিবিড়ভাবে জড়িত। এবারের মে দিবসে সাম্প্রদায়িক অপশক্তিকে মোকাবেলায় সংগ্রাম জোরদার করার আওয়াজটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার ও জামাত-শিবির নিষিদ্ধ করার দাবিতে নবপর্যায়ের যে সংগ্রামী গণজাগরণ গড়ে উঠেছে, তাতে শুধু শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণির স্বার্থ রয়েছে, এমন কথা ঠিক নয়। এই দাবির সাথে শ্রমিকদের প্রত্যক্ষ স্বার্থ জড়িত। যুদ্ধাপরাধীদের বিচার হওয়াটা দেশের স্বাধীনতাকে রক্ষা ও সংহত করার জন্যই অত্যাবশ্যক। আর স্বাধীনতা ক্ষুণ্ন হলে শ্রমিক শ্রেণি ক্ষতিগ্রস্ত হবে বেশি। পাকিস্তানের যুগে শ্রমিকদের ওপর পাকিস্তানি শাসকরা সবচেয়ে বেশি শোষণ করেছে। সাম্প্রদায়িক ধর্ম ব্যবসায়ী জামাতীরা শ্রমিক শ্রেণির ঐক্য বিনষ্ট করার জন্য এবং মানুষের দৃষ্টি তার ভাত-কাপড় ও রুটি-রুজির ইহলৌকিক সমস্যাগুলো থেকে অন্যদিকে সরিয়ে রাখার উদ্দেশ্যে পবিত্র ধর্মের অপব্যবহার করে থাকে। শ্রমিকের বাস্তব অভিজ্ঞতা হলো ধর্মীয় পরিচয় বা সে বিষয়ে পারদর্শিতা বিবেচনা করে মালিক কখনো মজুরির হার কম-বেশি করে না। মালিকের কাছে শ্রমিকের শ্রমশক্তিই হলো কাঙ্ক্ষিত সম্পদ, যা কিনে নিয়ে তা ব্যবহারের মাধ্যমে সৃষ্ট উদ্বৃত্ত মূল্য সে মুনাফা হিসেবে আত্মসাত্ করতে চায়। সে শ্রমশক্তি মুসলমান-হিন্দু-বৌদ্ধ যেকোন ধর্মাবলম্বী মানুষেরই হোক না কেন। শোষণের ক্ষেত্রে মালিক ধর্ম বিচার করে না। অথচ শ্রমিকরা যেন শ্রেণি হিসেবে এক হওয়ার পথে যেতে না পারে সেজন্য জামাতীরা মালিকের স্বার্থ রক্ষার্থে তাদেরকে ধর্মভিত্তিক সাম্প্রদায়িক বিভাজনের চিন্তায় আচ্ছন্ন করে রাখতে চায়। এসব বিষয় ও আরো অনেক বিষয় জমতে জমতে এদেশের শ্রমিকদের এখন দেয়ালে পিঠ ঠেকে যাওয়ার অবস্থায় এসে দাঁড়িয়েছে। ট্রেড ইউনিয়নের ও বামপন্থি রাজনৈতিক দলের নেতা-কর্মীরা প্রথম মুহূর্ত থেকেই সাভারের উদ্ধার তত্পরতায় শামিল হয়েছে। সাথে সাথে তারা হত্যাকারীদের গ্রেফতার, কর্মস্থলের নিরাপত্তাসহ বিভিন্ন ইস্যুতে গার্মেন্ট কারখানায় ধর্মঘট করেছে। বিজিএমইএ অবশ্য ধর্মঘট আহ্বানের মুখে সব কারখানা বন্ধ করে রেখেছিল। শ্রমিকরা রাজপথে নেমেছে। আন্দোলন চলতে থাকবে। বামপন্থি দলগুলো গার্মেন্ট-এর দাবিগুলোর সাথে জনগণের অন্যান্য দাবি যুক্ত করে ২ মে দেশব্যাপী হরতাল ডেকেও তা প্রত্যাহার করেছে। হরতাল ঘোষণার ১২ ঘন্টার মধ্যে বিএনপি-জামাত তা হাইজ্যাক করে নিয়ে গেছে। এসবের মাঝেই এবারের মে দিবস পালিত হবে। ‘রোদন ভরা এ বসন্ত’। তবুও বসন্ত বসন্তই, ফুল ফুটুক আর না ফুটুক। লেখক : সভাপতি, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি E-mail : [email protected]

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন