আলোকপাত

মানবতা পদপিষ্ট ও অর্থনীতি পঙ্গু

আপডেট : ২৮ এপ্রিল ২০১৩, ২১:৩০
বিরোধী দল, ইসলামী দল, এমনকি সরকার সমর্থনকারী দলসমূহের একের পর এক হরতাল ও সহিংসতায় জনগণ ও অর্থনীতির যখন নাভিশ্বাস উঠছিল সে মুহূর্তে সাভারের রানা প্লাজা ধসের ঘটনায় প্রায় ৪০০ গার্মেন্টস কর্মীর মৃত্যু ও ২৫০০ কর্মীর আহত ও পঙ্গু এবং ১০০০ নিখোঁজ হওয়ার ঘটনা সবকিছুকে ছাপিয়ে মানুষের মনে স্থান করে নিয়েছে। পরিবারের একটুখানি আর্থিক সচ্ছলতার আশায় যে মা-বোন ও ভাইরা সকাল-সন্ধ্যা আধাপেটা খেটে সুখের স্বপ্ন দেখছিল এক মুহূর্তের ভবন ধসে তাদের স্বপ্ন ধূলিস্মাত্ হয়ে গেল। এটা প্রাকৃতিক বিপর্যয় নয়, এটা মানুষ-সৃষ্ট এবং রাষ্ট্রীয় অবহেলায় নির্মাণ আইনের প্রতি বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে নিম্নমানের ইমারত তৈরি করার ফলাফল। রানা প্লাজার মালিক ক্ষমতার গর্বে ৬ তলার অনুমোদন নিয়ে ৯ তলা বিল্ডিং তৈরি করেছে, উপরন্তু একটি পিলারে ফাটল দেখা দেয়া এবং পুলিশের নিষেধ সত্ত্বেও ভবনটিকে পরিত্যক্ত ঘোষণা না করে জবরদস্তি করে শ্রমিকদেরকে হুমকি দিয়ে কাজে যোগ দিতে বাধ্য করেছে। এটাকে সরকারি দলের মন্ত্রিরাও হত্যাকাণ্ড বলে আখ্যায়িত করেছেন। কিন্তু হত্যাকারী স্থানীয় যুবলীগের সিনিয়র যু্গ্ম আহ্বায়ক হওয়ায় এত বড় বেআইনী কাজ করার পরও দুর্ঘটনার পর স্থানীয় আওয়ামী লীগের সাংসদ মুরাদ জং রানাকে লুকিয়ে রেখেছেন অথবা পালাতে সাহায্য করেছেন বলে লাখো মানুষের বিশ্বাস। যে জন্য তার বিরুদ্ধে দুটি মামলা হওয়া সত্ত্বেও অন্যান্য কারখানা মালিকদেরকে গ্রেফতার করা হয়েছে কিন্তু ভবন মালিক রানাকে গ্রেফতার করা হয়নি। গ্রেফতার না করতে পারার ব্যর্থতা পুলিশের হলেও পরোক্ষভাবে রাষ্ট্রের ব্যর্থতাই প্রমাণিত হয়। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তার চমক লাগানো ভাষ্যে বলেছেন, “বিরোধী দলের হরতালের সময় হরতালকারীরা পিলার ধরে নাড়াচাড়া করেছে বলেই হয়তো বিল্ডিংটা ধসে পড়েছে।” যোগ্য মন্ত্রীর বুদ্ধিমান বক্তব্য বটে! এ ঘটনা বিএনপির প্রাক্তন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর ভাষ্য “আল্লার মাল আল্লায় নিয়ে গেছে” স্মরণ করিয়ে দেয়। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য ৪০০ মৃত আত্মা ও তাদের স্বজনদের আর্ত-আহাজারির প্রতি বিদ্রূপ। এদিকে মাননীয় প্রধানমন্ত্রী স্বয়ং বলেছেন, যে রানা যুবলীগের কেউ নয় অর্থাত্ সাভারে রানার এত পোস্টার, ছবি ও মানুষের সাক্ষ্য, এমপি সাহেবের হস্তক্ষেপ সবই প্রশ্ন সাপেক্ষ? পুলিশ চাইলে কি না পারে কিন্তু পুলিশের হাত-পা বাঁধা থাকলে স্বয়ং আল্লাহ ছাড়া কেউ কিছু করতে পারবে না। মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর ভাষ্য যদি সঠিক হয় অর্থাত্ রানা যদি যুবলীগের কেউ না হয়, তাহলে তা আরও সুবিধা, এক ঘণ্টার মধ্যে পুলিশের উচিত তাকে গ্রেফতার করা। আরও ৩ জন গার্মেন্টস কারখানার মালিক তো ভবনের মালিক নয়, তাদেরকে গ্রেফতার করতে পারলে রানাকে পারা যাবে না কেন? সুতরাং রানাকে গ্রেফতার ও বিচারের আওতায় না আনতে পারা রাষ্ট্রের চরম ব্যর্থতা হবে। এবার আসা যাক রাষ্ট্রীয় সংস্থা রাজউকের ভূমিকা নিয়ে। রাজউকের হাজার হাজার কোটি টাকার তহবিল থাকা সত্ত্বেও লোকবলের অভাব দেখিয়ে ইমারত নির্মাণ নিয়ন্ত্রণ করতে এবং ঝুঁকিপূর্ণ প্রায় শত শত ইমারত ভাঙতে ব্যর্থ হয়েছে। ভূমিকম্প ছাড়াই যেভাবে ধস ঘটছে ভূমিকম্প হলে ঢাকা ও আশ-পাশে কি ভয়ঙ্কর বিপর্যয় ঘটবে তা অকল্পনীয়। রাজউক মানুষের প্রাণ নিয়ে খেলছে, এটাও রাষ্ট্রীয় ব্যর্থতা। গত কয়েক মাসে হরতাল ও সহিংসতায় তৈরি পোশাক খাতের অপূরণীয় ক্ষতি সাধন হয়েছে। রানা প্লাজা ধসে গার্মেন্টস শিল্প আরও অর্ডার হারাবে এবং ক্রেতারা পাশের দেশে চলে যাবে জি এস পি সুবিধা ঝুঁকিপূর্ণ হবে। ফলে তৈরি পোশাক খাতে রপ্তানি আয় চরমভাবে নিম্নমূখী হতে পারে। এটা দেশের অর্থনীতির বিরাট ক্ষতি। রাজনীতি যদি জনকল্যাণমূলক না হয়ে মানবতা ও অর্থনীতির বিরুদ্ধে সর্বনাশের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয় তাহলে একটি দেশ ধ্বংসের হাত থেকে বাঁচতে পারে না। আগামী নির্বাচন পদ্ধতি নিয়ে আজ দেশ চরম অনিশ্চয়তার মুখোমুখী। হরতাল, সহিংসতা, হয়তো পুরো বছর জুড়ে থাকবে। তদুপরি যুদ্ধাপরাধীদের বিচার, গণজাগরণের দাবি, হেফাজতে ইসলামের দাবি ইত্যাদি পূরণ সরকারের কাঁধে বোঝা হয়ে চেপে আছে। তাই এখন সহনশীল, সমঝোতাপূূর্ণ, সংলাপ-সহায়ক ও গণতন্ত্রের সহায়ক রাজনীতি একান্ত জরুরি। ব্যক্তি ও দলীয় স্বার্থ কিছুটা ত্যাগ করে ইগোর ও একগুয়েমির রাজনীতি বাদ দিয়ে দেশকে বাঁচানো উচিত। তাহলেই জনগণ বাঁচবে। লেখক :এসসিএ ও কথাশিল্পী

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন