বহু মানুষ চারদিকে। কেউ তার হারিয়ে যাওয়া প্রিয় মানুষটিকে খুঁজতে এসেছেন। বহু মানুষ ও প্রতিষ্ঠান নিজ উদ্যোগে সহায়তার ঔষধ, কাপড়, পানি, খাবারটুকু পৌঁছে দিতে ছুটে চলেছেন ঘটনাস্থলের দিকে। কেউ আবার নিজ দায়িত্বেই পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে পথের মানুষের কাছে নানা অনুরোধ নিয়ে দাঁড়িয়ে গেছেন, নয়তো পানি খাওয়ানোর উদ্যোগ নিয়েছেন। আর ঘটনাস্থলে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স বাহিনী, সেনাবাহিনীসহ আরো অনেক স্বেচ্ছাসেবীদের নিরলস কর্মকাণ্ডও চোখে পড়ল।
প্রথমত, যতই ধসে পড়া ভবনের দিকে এগিয়ে গেছি, ভবনের মধ্যে প্রাণহীন নিথর দেহগুলো যেন তাদের ভাষায় প্রতিবাদ জানিয়েই চলেছেন। বাতাসে তাদের হাহাকারটা এই লোভী সমাজের প্রতি ধিক্কার হয়ে প্রতিফলিত হচ্ছে। প্রাণহীন দেহগুলো যেন তারা বলতে চাইছেন, “এই সমাজ ব্যবস্থাটা সুন্দর করে সাজাতে তোমরা অবহেলা করলে, আর তাই আমরা করছি ‘ঘৃণা’। আমাদের আত্মা মরে যায়নি। আমরা না ফেরার দেশে গিয়ে এই নশ্বর পৃথিবীতে তোমরা আর কি কি দুর্দশার মুখোমুখি হও, সেটাই দেখতে চাইছি।”
আর এই পরিস্থিতিতে যারা উদ্ধার কাজে রয়েছেন, সবার মুখ ভার। একটা প্রচণ্ড গুমোট পরিবেশ। উদ্ধার কাজ শেষ করার জন্য ভারি সরঞ্জামও আনা হচ্ছে একে একে।
আমরা ধসে পড়া ভবনের পেছন দিক দিয়ে এর পাশের আরেকটি ভবনে ঢুকে উদ্ধারকর্মীদের সঙ্গে যুক্ত হলাম। এটা যতো সহজে বলছি, কাজটা ততো সহজ ছিল না। কারণ এ এক অসহনীয় পরিবেশ। ধসে পড়া ভবনে তখনও যাদের উদ্ধার করা যায়নি, তাদের চোখের সামনে রেখে উদ্ধার কাজ চালিয়ে যেতে বুকের পাটা লাগে।
একটু পর মূল ভবনে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স বাহিনীর কর্মকর্তাদের সুড়ঙ্গ তৈরি করে ভেতরে নেমে যেতে দেখলাম। তারা প্রায় সাতটা তলা কেটে নিচে নেমেছেন—যদি কেউ জীবিত থাকেন, তবে তাদের উদ্ধারের আশায়। আর সামনে কোনো মৃতদেহ পেলে তাকেও বের করে আনছেন।
আগেই বলেছি গুমোট পরিবেশ। সেই সঙ্গে আলো বাতাসহীনতা পরিস্থিতিকে আরো জটিল করে তুলেছে। ভবনের ভেতর দিয়ে হাঁটছি, কিন্তু চিন্তা করছি যে যদি এটাও ভেঙ্গে পড়ে? তাহলে আমাদের রক্ষার জন্য আমরা কি কি করব? এসব ভাবতে ভাবতেই বুঝলাম, এই একটা ভবন ধসে যাওয়াতেই আমাদের এই অবস্থা। ঢাকা বা চট্টগ্রামের মতো ঘন জনবসতিপূর্ণ শহরে ভূমিকম্প হলে তো আর রক্ষা নাই। তখন কে কাকে উদ্ধার করবে? আর যারা সুস্থ থাকবেন, তাদের তো উদ্ধার কাজের জন্য, ক্ষতিগ্রস্ত মানুষকে সহায়তা করার জন্য পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ থাকা প্রয়োজন। প্রশিক্ষণের বিষয়টা মনে হয় এখন একেবারে প্রাথমিক শিক্ষার একটা অংশ করে দেয়া উচিত।
এবার সেখানে ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স বাহিনীর প্রধান কর্মকর্তা উদ্ধারকর্মীদের কাজ দেখার জন্য আহ্বান জানালেন। প্রচণ্ড গরমের মধ্যে অত্যন্ত নিষ্ঠার সঙ্গে কাজ করে চলেছেন সবাই। একটা সুড়ঙ্গের মধ্যে নামলাম। উদ্ধারকর্মীরা একটা ফ্লোরে বেশ কয়েকটি মৃতদেহ দেখিয়ে বললেন, “আমাদের জানা নেই, এর ওপাশে কেউ জীবিত আছেন কি না। আমরা আরো নিচে হয়তো যাবো। শুধু দেখার জন্য যে কাউকে জীবিত উদ্ধার করা যায় কি না।” আবারও বলছি—এমন গুমোট পরিবেশ, যেখানে উদ্ধার কাজের পাশেই প্রাণহীন দেহ আর মৃত্যুঝুঁকি, এর মধ্যে কাজ করতে বুকের পাটা লাগে।
সব মিলিয়ে গত শনিবার সাভারে গিয়ে নিজ চোখে প্রায় ১৫টি প্রাণহীন দেহ দেখেছি, স্বজনহারা নির্বাক মানুষের চোখের পানি দেখেছি। আর উদ্ধারকর্মীদের একাগ্রতাটা ছিল এক অসাধারণ অনুভূতি। হূদয় না থাকলে ওই পরিস্থিতিতে কারও পক্ষে কাজ করা সম্ভব নয়। তাদের স্যালুট।
কিন্তু যারা এই পরিস্থিতির জন্য দায়ী, তাদের জন্য ঘৃণা। তবে হ্যাঁ, শুধু ঘৃণা জানিয়েই কর্তব্য শেষ করলে হবে না। যারা বাংলাদেশের জন্য নিজের জীবন বিপন্ন করছেন, সেই পোশাককর্মীদের কাজের জন্য সুন্দর পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে এর মালিকদেরই। আসুন আমরা সেই কাজটুকু করি আগে। নয়তো আবারও ঘটবে তাজরিন, রানা প্লাজার মতো অনেক ঘটনা। আর কোনো মানবিক বিপর্যয় চাই না। মানবসৃষ্ট বিপর্যয়ে আর কারো কান্না শুনতে চাই না—না কোনো স্বজনহারা মানুষের, না নিজের কোনো আত্মার সম্পর্কের কোনো ব্যক্তির। বাংলাদেশ যেন আর কারো কারণে মৃত্যুপুরী না হয়ে ওঠে।
লেখক :এভারেস্ট জয়ী
