সামনে থাকা এক নেতা

আপডেট : ২৮ এপ্রিল ২০১৩, ২১:৫৩
আশির দশকের শুরুর দিকের ঘটনা। বিশ্ব শাসন করছেন তখন অলরাউন্ডার ইয়ান বোথাম। ১৯৮১ সালে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে অধিনায়ক করে দেয়া হল বোথামকে। সঙ্গে সঙ্গে যেন ব্যাটিং-বোলিং ভুলে গেলেন তিনি! অধিনায়ক হিসেবে ১২ টেস্টে একটি মাত্র ফিফটি পেলেন, ইনিংসে ৫ উইকেট নেই। এক বছর পর এই যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পেয়েই অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে লিডস টেস্টে রান করলেন ৫০ ও ১৪৮*; উইকেট নিলেন ৭টি! বোঝা গেল অধিনায়কত্বটা কারো কারো জন্য আসলেই যন্ত্রণা। মুশফিকুর রহিমকে দেখে বোঝা যায়, তিনি এই ইয়ান বোথামের দলের লোক নন। অধিনায়কত্বটা তার জন্য যন্ত্রণা নয়; বরং যেন আনন্দের, সাফল্যের উপলক্ষ। কাল হারারেতে আরেকবার নব্বইয়ের ঘরে আউট হলেন। তাতে সেঞ্চুরি বঞ্চিত রইলেন, দুই হাজার রানে পৌঁছাতে পারলেন না; এমনকি দলের জয় এখনও নিশ্চিত নয়। তারপরও শুধু এই ব্যাটিংয়ের জন্যই মুশফিক দাবি করতে পারেন—অধিনায়কত্বটা তাকেই মানায়। মুশফিককে সেই ছোটবেলা থেকে দেখতে থাকা, তার সবগুলো বয়সভিত্তিক দলের কোচ নাজমুল আবেদীন ফাহিম বলছিলেন, ‘আসলেই মুশফিক বাই-বর্ন ক্যাপ্টেন। এটা বিশ্বাস করা কঠিন, কিন্তু ওর বয়স যখন ১২-১৩, তখন থেকেই আমরা মোটামুটি নিশ্চিত ছিলাম, মুশফিক জাতীয় দলের অধিনায়ক হবে। আপনারা জেনে অবাক হতে পারেন, ওকে ওই বয়স থেকে সে জন্যই প্রস্তুত করে তোলা হয়েছে। ওর অধিনায়কত্ব পাওয়াটা এবং অধিনায়কত্ব পেয়ে আরও ভালো পারফরম করাটা তাই আমাকে খুব একটা বিস্মিত করে না।’ দেশের যুব পর্যায়ের অন্যতম শীর্ষ ও কোচ ফাহিম বিস্মিত না হতে পারেন, আমাদের বিস্মিত না হয়ে উপায় নেই; অধিনায়কত্ব পেয়ে মুশফিক ব্যাটসম্যান হিসেবে যতোটা পরিণত হয়েছেন, তা দেখে বিস্মিত হতেই হবে। আচ্ছা, পরিসংখ্যান দিয়েই বোঝানো যা মুশফিকের এই উন্নয়নটা। বাংলাদেশ শুধু নয়, সারা বিশ্বেই ক্রিকেটারদের ক্ষেত্রে অধিনায়কত্ব একটা চাপ বলেই সাধারণত বিবেচিত হয়। এই চাপ, এমনই চাপ যে, অধিনায়কত্ব পেয়ে ব্যাটিং-বোলিং করতে ভুলে যান ইয়ান বোথামও! বাংলাদেশের টেস্ট অধিনায়কদেরও প্রায় একই অবস্থা। মাশরাফিকেসহ এ পর্যন্ত বাংলাদেশ ৭ জন টেস্ট অধিনায়ক পেয়েছে। এর মধ্যে সাকিব ও মুশফিক ছাড়া সবাই অধিনায়কত্ব পেয়ে আগের চেয়ে খারাপ পারফরম্যান্সই করেছেন। বাংলাদেশের প্রথম টেস্ট অধিনায়ক নাঈমুর রহমান দুর্জয়ের ক্যারিয়ার ব্যাটিং গড় ১২.০৯; অধিনায়ক হিসেবে সেটা ১১.৮২। এরপর খালেদ মাহমুদ, খালেদ মাসুদ, মোহাম্মদ আশরাফুল; প্রত্যেকেরই ব্যাটিং গড় অধিনায়কত্ব পেয়ে অনেক কমে গেছে। এমনকি দেশের সফলতম টেস্ট ব্যাটসম্যান ও একসময়ের সফলতম অধিনায়ক হাবিবুল বাশারের ক্ষেত্রেও এই ঘটনা ঘটেছে। হাবিবুল বাশারের ক্যারিয়ার ব্যাটিং গড় ছিল ৩০.৮৭; অধিনায়কত্ব জামানায় সেটা নেমে এসেছিল ২৯.৮২-এ। হ্যাঁ, সাকিব আল হাসানের ক্ষেত্রেই প্রথম উন্নয়নটা হল। তার ব্যাটিং গড় ৩৫ থেকে বেড়ে ৩৮.২৩-এ পৌঁছেছিল অধিনায়কত্ব জীবনে। সেই সঙ্গে বোলার সাকিবের কথাও মনে রাখতে হবে। তারপরও সাকিবকে নয়; পারফরমার-অধিনায়ক বেছে নিতে বললে সেরা হিসেবে মুশফিককেই বেছে নিতে হবে। কারণ, একটু-আধটু নয়; মুশফিকের ব্যাটিং গড়টাই প্রায় দ্বিগুন হয়ে গেছে অধিনায়কত্ব জীবনে এসে। গতকালকের এই ইনিংসের ফলে অধিনায়ক হিসেবে ১০ টেস্টে তার ব্যাটিং গড় দাঁড়ালো ৪৪.৩৩। এবার শুনুন—অধিনায়ক হওয়ার আগে মুশফিকের ব্যাটিং গড় ছিল ২৭.১৫ মাত্র! অধিনায়ক হওয়ার পর এই ১০ টেস্টের মধ্যে দেশের ও নিজের একমাত্র ডাবল সেঞ্চুরিটি করেছেন, ৫টি ফিফটি করেছেন। ১১৯৫ রান নিয়ে অধিনায়ক হয়েছিলেন; আর এখন তিনি দু’ হাজারি ক্লাব থেকে মাত্র ৭ রান দূরে দাঁড়িয়ে। গত চার টেস্টে মুশফিক রান করেছেন ৪০৬; এর মধ্যে হারারের প্রথম টেস্টে দু’ ইনিংস মিলিয়েই মাত্র ৬ রান আছে! এতেই বোঝা যায়, অধিনায়ক হওয়ার পর ব্যাটসম্যান হিসেবে কতোটা পরিণত ও দায়িত্বশীল মুশফিক। এর ব্যাখ্যা খুঁজতে ওপরে ওপরে তল্লাশি চালালে হতাশ হতে হবে। ওপর থেকে মুশফিক আসলেই আবেগী, নিরীহ চেহারার একটি ছেলে; শক্ত সিদ্ধান্ত নিতে যার কষ্ট হয়। এমন মানুষ কি করে অধিনায়ক হিসেবে সফল হয়? এখানেই বিকেএসপির সাবেক শিক্ষক ফাহিম তার ব্যাখ্যাটা দিলেন, ‘মুশফিককে আমরা প্রথম যখন পাই, তখনই খেয়াল করেছি, ওর মধ্যে নেতৃত্বের ব্যাপারটা আছে। এরপর সে কিন্তু অনূর্ধ্ব-১৩, অনূর্ধ্ব-১৫, অনূর্ধ্ব-১৯; সবগুলো জাতীয় দলে টানা অধিনায়কত্ব করেছে। তখন সে ওপেন করত। পরে চাপ বেশি হয়ে যাবে বলে তাকে মিডল অর্ডারে নামিয়ে আনা হয়। ফলে ওর ওপর অধিনায়ক হিসেবে আমাদের আরও অনেক প্রত্যাশা। আশা করি সেটা মেটাতে পারবে।’ প্রত্যাশার কোনো সীমা হয় না। তারপরও অধিনায়ক মুশফিকের দিকে প্রত্যাশা নিয়ে শুধু ফাহিম নন; বাংলাদেশই চেয়ে থাকবে।