একই মৃত্যুনাটকের মঞ্চে ঈশ্বর কি কোনো মানুষকে দুবার তুলে দিতে পারেন? পারেন বোধহয়, কেননা দুলাল যে এখন সেই মৃত্যুকূপে আবার আটকে গেছে!
দুলাল খুব দুলছিল, কারণ পুরো বারো তলা ভবনটিও দুলছিল শিশুপার্কের খেলনা গাড়ির মতো। মুহূর্তেই তার শিরদাঁড়া বেয়ে বয়ে গেল এক অতি শীতল মৃত্যুস্রোত। ভূমিকম্প! সে ছুটলো পাগলের মতো। কোথায় যাবে? লিফট অতি বিপজ্জনক এ সময়। সিঁড়ি? সে থাকে শীর্ষ তলায়, কোম্পানির ব্যবস্থাপনা ফ্লোরে। তৈরি পণ্যের কোয়ালিটি কন্ট্রোলার সে। সিঁড়ি ভেঙে বারো তলা থেকে নিচে নামতে নামতেই যদি মাথার ওপর ভেঙে পড়ে পুরো ভবন? তারপরও সে দৌড় দেয় সিঁড়ির কাছে এবং দেখতে পায় এক ভয়াবহ বিশৃঙ্খলা। একসঙ্গে এক শ’ লোক হুড়মুড় করে নামতে চেষ্টা করছে সিঁড়ি দিয়ে। পুরো ভবনে যেন মৃত্যুচিত্কারের হেভি মেটাল কনসার্ট শুরু হয়েছে। এ অবস্থায় বস আর পিওন সবাই সমান। পড়ে গেলে আর সবার পায়ের তলাতেই ভবলীলা শেষ হতে সময় লাগবে না। সুতরাং দুলাল বিকল্প ভাবে। এদিকে ভবন দুলেই চলেছে জাপানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী নাওতো কানের নিজস্ব দপ্তরের মতো, যেমনটি সে টেলিভিশনে ২০১১ সালের ভূমিকম্পে দেখেছিল। স্থির থাকাই মুশকিল। ভূমিকম্পের সময় যেন কি কি করতে হয়, ইন্টারনেট আর পত্রিকা ঘেঁটে তার ছোটখাট একটি মানসিক প্রস্তুতি সে নিয়ে রেখেছিল— যদি কোনোদিন কাজে লাগে। কিন্তু প্রয়োজনের সময় তার কিছুই মনে পড়ছে না। দুলাল আবার টলোমলো পায়ে নিজের কক্ষে ফিরে আসে এবং কি ভেবে তার ভারী টেবিলের তলায় সুড়ুত করে ঢুকে যায়। ব্যাপারটা নিশ্চয়ই কাকতালীয়, কেননা তখনই ভেঙে পড়ে পুরো ভবনটি এবং দুলাল পুনরায় আটকে পড়ে মৃত্যুকূপে, অক্ষত অবস্থায়।
পুনরায়, কারণ কয়েক বছর আগে প্রথমবার সে মৃত্যুকূপের ভেতর থেকে একশ’ ঘণ্টা আটকে থেকে বেঁচে ফিরেছিল। ২০১৩ সালের ২৮ এপ্রিলে সাভারে যেন তার নতুন জন্ম হয়েছিল। কিন্তু এবার কি হবে? সাভার ট্রাজেডির পর সে নতুন কোম্পানিতে চাকরি নেয়। তার নতুন অফিসটা মজবুত একটি বহুতল ভবনে বলে মনে মনে একটু স্বস্তি পেয়েছিল। যদিও দশ পনেরো বছর আগে থেকেই সে শুনে আসছিল ঢাকা দাঁড়িয়ে আছে টাইম বোমার ওপর। সেই টাইম বোমার নাম ভূমিকম্প। সাক্ষাত্ প্রলয় নেমে আসতে পারে যে কোনো মুহূর্তে।
মৃত্যুকূপে আটকে প্রথমেই তার ফিরে এলো পুরনো স্মৃতি। ২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল সকালে সাভারের রানা প্লাজায় তিনতলায় কিছু বুঝে ওঠার আগেই সে আটকা পড়ে যায় কয়েকটি পিলারের মাঝখানে। তারপর আাাস্তে আস্তে সময় গড়ায়। এক ঘণ্টা, দুই ঘণ্টা, তিন ঘণ্টা। সে একা নয়, কাছাকাছি কয়েকটি পিলারের খাঁজে আরো কয়েকজন আটকে ছিল সেই অন্ধকূপে। মোবাইল ফোনের কথা মনে পড়লেই দুলালের মনটা বাঁচার আনন্দে ঝিলিক দেয়। তার আটকা পড়ার খবরটা অন্তত ভাইকে জানাতে পারবে। কিন্তু সে যেন আটকে গেছে ঘূর্ণিপাকের কোন গহীনতলে। মোবাইল ফোনের নেটওয়ার্কও নেই। তখন খুব ভয় পেতে শুরু করে দুলাল। চারদিকে নিকষ কালো অন্ধকার। নিজের হাতটা পর্যন্ত চোখ গোল গোল করেও দেখতে পায় না সে। অন্ধকার যখন অতি অসহ্য হয়ে উঠতো তখন মোবাইলের আলোয় চারদিকটা সে একটু দেখে নেয়ার চেষ্টা করতো। নিস্তব্ধ পুরী ভেঙে খানখান করে মাঝেমধ্যে সে গোঙানো কান্না শুনতে পেত আটকা পড়া অন্য শ্রমিকদের। হঠাত্ হঠাত্ তাদের কেউ কেউ চূড়ান্ত বিকারগ্রস্তের মতো আবোল-তাবোল বকতো। তাদের আহাজারি আর আকুতি শুনে বুঝতো, কারো হাত আটকে আছে, কারো পা আটকে আছে, কারো কোমড় বা মাথা থেতলে গেছে, কেউ কেউ কয়েকঘণ্টা গোঙানির পর নিস্তব্ধ হয়ে গেছে, হয়তো মরে গেছে। দুলালের গায়ে একটুখানি আঁচড়ও লাগেনি, তারপরও সে বুঝতে পারে বীভত্স অন্ধকার, গুমোট গরম আর শ্বাসকষ্ট তাকে বাঁচতে দেবে না। এভাবে ২৪ ঘণ্টা পার হয় এবং এরপর ক্রমশ সে যা বুঝতে পারে, তা হাবিয়া দোজখের কাছাকাছি। বাতাস শুধু গুমোট নয়, শুধু অক্সিজেনশূন্য নয়, বাতাসে ভর করতে শুরু করে মৃত মানুষের গন্ধ। খাদ্য বা পানি তো সোনার হরিণ, ৪৮ ঘণ্টা পার হতেই দুর্গন্ধ এমন দুর্বিষহ হয়ে ওঠে যে, মনে হয় কয়েকশ’ পচালাশের স্তূপের মাঝে তার নাসারন্ধ্র আটকে গেছে। শ্বাস নিলে মাথা ঝিমঝিম করে, বমি উগড়ে আসে, পেটে কিছু নেই বলে রক্ষে। শ্বাস না নিলেও প্রাণ যায়। এভাবে ৭২ ঘণ্টা, এবং বুঝতে পারে সব প্রলাপ, সব গোঙানি একে একে স্তব্ধ হয়ে যাচ্ছে। সুনসান নীরবতা। শ্রীকান্ত উপন্যাসে শরত্চন্দ্রের অন্ধকারের সৌন্দর্য পড়েছিল দুলাল। ‘মরণরে তুহু মম শ্যাম সম’ লেখার আগে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরও কি এমন অন্ধকারের কথা কল্পনা করেছেন কোনোদিন? তারপর ১০০ ঘণ্টা পার হলো, দুলাল কীভাবে যেন আলোর মুখ দেখল। এ আলো যেন তার চোখ ঝলসে দেয়। অসংখ্য মানুষ, অ্যাম্বুলেন্স, ছোটাছুটি, হাজার হাজার প্রশ্ন... তারপর আবার বেঁচে ফেরা। মৃত্যুপুরী থেকে ফিরে দুলাল সুস্থ হবার পর ওই চারদিনের পত্রিকা খুব মন দিয়ে পড়ে। যত পড়ে ততই তার হাত পা যেন পেটের ভেতরে ঢুকে যেতে চায়!
কিন্তু এবার? এই ভূমিকম্পে তো হাজার হাজার রানা প্লাজা সারা ঢাকায় স্তূপাকৃতি হয়ে গেছে। একটা রানা প্লাজার জন্য সারাদেশ, মিডিয়া আর সরকার ব্যতিব্যস্ত ছিল, তারপরও তার উদ্ধার পেতে একশ’ ঘণ্টা লেগেছিল। কিন্তু অযুত ভবন ধসের পর তাকে কি কয়েক হাজার ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হবে উদ্ধার পেতে? কিংবা কেউ কি মুক্ত আছে উদ্ধার করার মতো?
দুলাল পকেট থেকে মোবাইল ফোন বের করে। নতুন বিয়ে করা অন্তঃসত্ত্বা স্ত্রীকে ফোন করে। নেটওয়ার্ক ব্যস্ত। ব্যস্ত ব্যস্ত ব্যস্ত এবং হঠাত্ ফোন কল যায়। কেউ ধরে না ওপাশ থেকে। বার বার চেষ্টা করে দুলাল। তারপর দেখে নেটওয়ার্কও নেই। কয়েক ঘণ্টা পর দুলাল টেবিলের তলা থেকে মাথা তোলে। মোবাইলের আলোয় খুঁজে খুঁজে দেখে বের হবার পথ। এর ভেতরে ভূমিকম্পের বার কয়েক আফটার শক হয়ে গেছে। দুলাল নানা পিলার আর ধ্বংসস্তূপের ফাঁক-ফোকর দিয়ে এক চিলতে আলোর দিকে এগোয়। তার কক্ষের দক্ষিণ দিকের ভাঙা জানালার কাছে পৌঁছেও যায় এক পর্যায়ে। তারপর ঝুঁকি নিয়ে বাইরে তাকিয়ে যা দেখে তাতে মনে হয়েছে পুরো ঢাকা ভাঙা তাসের ঘরের মতো, ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে হাজার হাজার টুকরো টুকরো তাস। হাতে গোনা কয়েকটা ভবন মাত্র দাঁড়িয়ে আছে বিব্রত হয়ে। আর তাদের ১২ তলা ভবন এখন দাঁড়িয়ে আছে চার তলা হয়ে।
দুলালের মনে পড়ে, ভূমিকম্প নিয়ে কত সভা সেমিনার লেখালেখি হয়েছে। আলোচনা হয়েছে সরকারের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ঢেলে সাজানোর লম্বা লম্বা নানা বার্ষিকী পরিকল্পনার। যুক্তরাষ্ট্রের এক গবেষণায় ২০১৩ সালে বলা হয়েছিল, বিশ্বের ২০টি শহরের মধ্যে ঢাকা ভূমিকম্প ঝুঁকিতে শীর্ষে রয়েছে। নতুন ঢাকার বেশির ভাগ ভবন জলাভূমি ভরাট করে তৈরি করা হয়েছে। আর পুরান ঢাকার বেশির ভাগ ভবনও অনেক পুরোনো। ফলে ঢাকা শহরের বেশির ভাগ এলাকাই ভূমিকম্প ঝুঁকিতে আছে। ফলে দেড় কোটি জনসংখ্যার এই শহরে মাঝারি মাত্রার ভূমিকম্পেও বড় ধরনের ক্ষয়ক্ষতি হওয়ার আশঙ্কা ছিল বরাবরই।
কিন্তু সরকারও কি পুরো বিশ্বাস করতো এই ভূমিকম্পের ‘বাঘ’ আসবে একদিন? রাখালের প্রতিদিনের বাঘধরার গল্পের কল্পবাঘকে নিয়ে বোধহয় সন্দেহ ঢুকেছিল সবার ভেতরেই। বাঘ আসবে শুনি, কই বাঘ তো আসে না? আজ যখন সত্যি বাঘ এলো, আর সবাই যখন এক একজন রাখালে পরিণত হলো, তখন বাঘ থেকে রক্ষা করার জন্য কেউ বোধহয় রইল না।
ঢাকা নাকি শকুনশূন্য হয়ে গিয়েছিল। কিন্তু ৪৮ ঘণ্টা পর দুলাল দেখে ঢাকার আকাশ শকুন ছেয়ে যাচ্ছে। তারা আসছে দলে দলে, শত শত মাইল পেরিয়ে।
লেখক : সাংবাদিক
[email protected]
