এটা এখন আমরা জানি যে, বাংলাদেশে প্রায় ৫০০০ গার্মেন্টস ফ্যাক্টরি রয়েছে। যেখানে প্রায় ৩.২ মিলিয়ন অর্থাত্ ৩২ লাখ শ্রমিক কাজ করে থাকেন। পৃথিবীর মধ্যে সবচেয়ে কম মূল্যে শ্রমিকরা এসব কারখানায় তাদের শ্রম বিক্রি করে আসছেন। শ্রমিকদের ন্যূনতম মজুরি ৩৭ ইউ এস ডলার অর্থাত্ মাসিক প্রায় তিন হাজার টাকা। কম মূল্যে উচ্চ কোয়ালিটির পোশাক উত্পাদিত হওয়ায় বিদেশি বাইয়াররাও বিশেষ করে ইউরোপ ও আমেরিকার বড় বড় পোশাক আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানগুলো বাংলাদেশে তৈরি পোশাকের প্রতি অতি আকৃষ্ট। ওয়ালমার্ট (Walmart), টমি হিলফিগার (Tommy Hilfiger), সিয়ারস (Sears), গ্যাপ (‰AP), এইচ এন্ড এম (H & M), ইনডিটেক্স (Inditex), ডাচ রিটেইলার সি এন্ড এ (C & A), বেনেট্টন (Benetton) ও কাটো (Cato) সহ পৃথিবীর আরো অনেক ছোট-বড় নামি-দামি ব্রান্ডের পোশাকসামগ্রী বাংলাদেশ থেকে আমাদানি করা হয়। মূলত স্বল্প মজুরের এই পোশাক শ্রমিকরাই তাদের শ্রম দিয়ে পোশাক শিল্পকে বাঁচিয়ে রেখেছেন এবং দেশের অর্থনীতির চাকা সচল করে রেখেছেন গত প্রায় দুই দশক ধরে- অথচ তাদের জন্য নিরাপদ কর্মস্থল আজো আমরা সুনিশ্চিত করতে পারিনি। এটা আজ আমাদের সবার জন্য, জাতির জন্য, এক চরম লজ্জা।
লোভকে আমরা অনেকেই সংবরণ করতে পারি না। লোভের কারণে আমরা অনেক সময় অসহায় মানুষের জীবনকে সঁপে দিই মৃত্যুর মুখে। যার একটি উত্কৃষ্ট উদাহরণ হচ্ছে সাভারে ধসে পড়া রানা প্লাজা। যার পরিণতি হয়েছে কি না করুণ, ভয়াবহ ও অকল্পনীয়। মৃত্যুর সংখ্যা প্রতিদিন বাড়ছে সেখানে। এক ডিজিটের ঘর পেরিয়ে (অর্থাত্ এক, দুই, বা তিন করে) লাশের সংখ্যা একশত, দ্বিশতক বা ত্রিশতক ছাড়িয়ে প্রায় চারশত ছুঁই ছুঁই করছে। এই লেখাটি যখন লিখছি তখন পর্যন্ত উদ্ধার কাজ প্রায় ১০০ ঘণ্টা অতিবাহিত হয়েছে। এখনো নিভু নিভু প্রাণের সন্ধান মিলছে সেখানে আটকে পড়া শ্রমিকদের—যাদের জীবনকে নিয়ে কি না ছিনিমিনিই খেলেছে গার্মেন্টস মালিকরা ও সেই ভবনের মালিক মি. সোহেল রানা। গত মঙ্গলবার ভবনে মারাত্মক ফাটল দেখা সত্ত্বেও জোরপূর্বক ও নানাবিধ ভয়-ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে অসহায় শ্রমিকদেরকে বুধবার কাজে যোগদানে বাধ্য করেন তারা। তারপর এর পরিণতি যে কতটা দুর্বিষহ ও বেদনাদায়ক ছিল, তা তো অসহায় শ্রমিকরা তাদের জীবন দিয়ে প্রমাণ করে গেলেন। মি. সোহেল রানা ও মি. গার্মেন্টস মালিকদের দাপটের কারণে এবং তাদের দায়িত্বজ্ঞানহীন ও ক্ষমাহীন অন্যায়ের ফলে এতোগুলো শ্রমিকের প্রাণ যে অকালে ঝরে পড়লো- এর দায়ভার কি তারা কখনো এড়াতে পারে? এদেরকে বিচারের কাঠগড়ায় কি দাঁড় করানো হবে? তাদেরকে কি শাস্তি দেয়া হবে? নাকি অর্থের বিনিময়ে সুকৌশলে তারা এবারো পার পেয়ে যাবে?
শুধু কি তাই? মৃত্যুর এই দীর্ঘ সারির পাশাপাশি নিখোঁজের সংখ্যাও রয়েছে শত শত। পা-হারানো, হাত-হারানো বা বিকলাঙ্গের সংখ্যাও রয়েছে অনেক। তদুপরি, কেউবা হারিয়েছেন তার মা, বাবা, স্বামী বা স্ত্রী, ভাই বা বোন বা পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তিকে। এর ফলে আক্রান্ত শ্রমিকদের শত শত পরিবার হবে নিঃস্ব ও নিঃসঙ্গ। কাটবে তাদের জীবন বিনিদ্রায়, আতঙ্কে ও অনিশ্চয়তায়। তারপরেও কি মালিকরা বা অভিযুক্তরা আইনের নাক গলিয়ে পার পেয়ে যাবেন এবার? তা যদি হয়, সে তো হবে মহা অন্যায়, মহাপাপ ও আমাদের সবার জন্যই কলঙ্কময় অধ্যায়। আমার চোখ ধেয়ে আসে যখন টেলিভিশনের চ্যানেলগুলোতে দেখি যে, মানবতার তাগাদায় জীবন বাজি রেখে ধসে যাওয়া ইমারতের কংক্রিট কেটে সুরঙ্গ পথ বানিয়ে অন্ধকারে খুঁজে খুঁজে একটি একটি করে আটকে পড়া মানুষকে বা লাশকে বের করে আনছেন সেনাবাহিনী, ফায়ার ব্রিগেড, চিকিত্সা সেবায় নিয়োজিত ভাই-বোনেরা, অসংখ্য স্বেচ্ছাসেবক কর্মীরা এবং আরো অনেক সরকারি-বেসরকারি সংস্থার কর্মীরা। তাদের এই সীমাহীন অক্লান্ত পরিশ্রম মনে করে দেয় আবারো- মানুষ কেবলই মানুষের জন্য, না আছে সেখানে যেন কোনো অদৃশ্য বৈষম্যের প্রাচীর ও ভেদাভেদ। সকলের তরে সকলে আমরা প্রত্যেকে আমরা পরের তরে। এই উদ্ধারকর্মীদের জানাই অফুরন্ত ভালবাসা ও পরম শ্রদ্ধা। অন্যদিকে সাভারের রানা প্লাজার উপরে খোলা আকাশ যখন স্বজন হারানোর এসব আর্তনাদে বেদনার এক চাদরে ঢাকা, জাতি যখন এই শোকে মুহ্যমান ও ভারাক্রান্ত, তখন এক শ্রেণির কতিপয় নোংরা রাজনীতিকের একে অপরের প্রতি দোষারোপের তুরূপ ও কাদা ছোঁড়াছুঁড়ি যেন এখনো থেমে নেই। এরা যেন মানবতাহীন ও দৃষ্টিহীন। এদের কাছে দেশের চেয়ে কিম্বা মানুষের জীবনের চেয়ে নিজের স্বার্থ ও দলবাজিই বেশি প্রাধান্য। কবে যে আমাদের দেশে এসব কতিপয় অন্ধ রাজিনীতিকের ঢালাওভাবে অন্ধ দলবাজি, ব্যক্তিপূজা ও কাদা ছোঁড়াছুঁড়ি বন্ধ হবে- তা আমার জানা নেই।
থাক সে সব কথা। কারা দায়ী আসলে এতগুলো হত্যার এই মহাপাপের সঙ্গে- তা নির্ণয় করা কি খুব জটিল বিষয়? সাধারণ মনে কতিপয় প্রশ্ন জাগে। ১. রানা প্লাজাতে বিপজ্জনক ফাটল দেখা সত্ত্বেও গার্মেন্টস মালিকপক্ষ এবং মি. রানা যেমন শ্রমিকদেরকে জোরপূর্বক কাজে যোগদানে বাধ্য করে তাদের প্রাণনাশ করে অপরাধ করেছেন, ২. তেমনি এই ইমারত নির্মাণের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট অসাধু ইঞ্জিনিয়ার নামধারী যেসব ব্যক্তি (যারা হত্যার এই মরণ ফাঁদ তৈরি করেছেন) বা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান বা ইমারতে অর্থ লগ্নকারি ব্যাংক- এসবের দায়ভার কি এড়াতে পারেন? ৩. যিনি এই অবৈধভাবে দণ্ডায়মান ইমারত পাঁচতলার পরিবর্তে নয়তলা নির্মিত করেছেন (মি. সোহেল রানা), এবং ৪. যারা এই অবৈধ অবকাঠামো বানানোর অনুমোদন দেয় ও সরেজমিনে মনিটরিং না করে থাকেন (পৌর-কর্পোরেশন বা রাজউক বা সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়), তাদের কি এতোগুলো হত্যার দায়ভার এড়ানোর সুযোগ আছে? এই দুর্ঘটনা ঘটার পিছনে জড়িত ব্যক্তিবর্গের উপযুক্ত ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি কি অনিবার্য নয়? এদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তিই একমাত্র কাম্য- যাকে অগ্রাহ্য করার কোনোই অবকাশ নেই।
পরিশেষে বলব যে, স্বার্থের কাছে অর্থের কাছে আমরা যেন প্রতিনিয়ত অবনত হচ্ছি, নিরীহ মানুষের জীবনকে সঁপে দিচ্ছি অধীর অন্ধকারে, অল্প বেতনের এই শ্রমিকদের জীবনকে বার বার মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিচ্ছি। এবার স্বার্থের হিসাব কমিয়ে মৃত্যুর মিছিলকে আমাদের থামানো দরকার। ২০০৫-এ স্পেকট্রামে ভবন ধসে প্রায় ৬৪ জন বা তার অধিক শ্রমিকের প্রাণহানি ঘটলো। মাত্র কয়েক মাস আগে অর্থাত্ গত বছর ২৩শে নভেম্বর আশুলিয়ায় তাজরিন গার্মেন্টসে ভয়াবহ আগুনে জীবন্ত দগ্ধ হয়ে প্রায় শতাধিক শ্রমিকের প্রাণের অবসান ঘটলো। তারপর আবার সাভারে এই রানা প্লাজাতে এসে শত শত শ্রমিকের লাশের সারি, এ যেন মৃত্যুর মিছিলের এক বিশাল সমাহার। এভাবে বার বার আর কত প্রাণহানির ঘটনা দেখব আমরা? সময় এসেছে শ্রমিকদের জীবনের মূল্য দেবার, তাদের সুস্বাস্থ্য রক্ষা করার ও নিরাপদ কর্মস্থল বিধান করার। মনে রাখতে হবে যে, গার্মেন্টস শিল্প যদি দেহ হয়, শ্রমিকরা হচ্ছে সেই দেহের ভিতরে প্রবাহিত রক্ত। দেহ ছাড়া যেমন রক্ত প্রবাহিত হয় না তেমনি রক্ত ছাড়া দেহও টিকিয়ে থাকতে পারে না। তাই দেহ ও রক্ত অর্থাত্ গার্মেন্টস শিল্প ও তার শ্রমিকদেরকে দীর্ঘস্থায়ীভাবে টিকিয়ে রাখতে হলে একটি সুনির্দিষ্ট নীতিমালার আশু প্রয়োজন। সরকার কর্তৃক সঠিক নীতিমালা তৈরি, তার প্রয়োগ ও কঠোর মনিটরিং একান্ত জরুরী। তদুপরি, অপরাধীদের শাস্তি নিশ্চিতকরণের কোনো বিকল্প নেই। অন্যথায় এসব দুর্ঘটনার পুনরাবৃত্তি এড়ানো যাবে না।
লেখক: যুক্তরাষ্ট্রের ওহাইও স্টেটে
একটি ইন্ডাস্ট্রিতে কর্মরত
e-mail: alamrowshon¦gmail.com
