চারিদিকে যে সামাজিক অস্থিরতা বিরাজমান এবং সেই সঙ্গে রাজনৈতিক ডামাডোলের ঢক্কা নিনাদ যখন দেশ ও জাতিকে এক অনিশ্চয়তার মধ্যে নিক্ষিপ্ত করিয়াছে ঠিক তখনই সাভারে রানা প্লাজা নামক একটি নয়তলা ভবনের ধসিয়া পড়ার ঘটনা সার্বিক পরিস্থিতিকে অধিকতর জটিল করিয়া তুলিয়াছে। এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনা শুধু যে শত শত তরতাজা প্রাণ কাড়িয়া লইয়াছে তাহা নহে, এ ধরনের হূদয় বিদারক এবং কর্তৃপক্ষের খামখেয়ালীপূর্ণ মানসিকতার এই নিষ্ঠুরতম বহিঃপ্রকাশের ফলে আজ দেশের সর্বাপেক্ষা বিকশিত শিল্প পোশাক শিল্পের ভবিষ্যত্ই হুমকির মুখে পতিত হইয়াছে। মানুষের উদগ্র লোভ যে কিভাবে তাহাকে অন্ধ ও বধির করিয়া তুলিতে পারে তাহারই এক জাজ্বল্যমান দৃষ্টান্ত এই রানা প্লাজা। অন্যদিকে রানা প্লাজার দুর্ঘটনাকে কেন্দ্র করিয়া গত কয়েকদিন ক্ষুব্ধ ও অসন্তুষ্ট শ্রমিকেরা রাজধানী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে যেভাবে কলকারখানা এবং যানবাহনে ভাঙচুর চালাইয়াছে উহা এককথায় অবিশ্বাস্য। শ্রমিকরা তাহাদের কর্মস্থলে ভাঙচুর চালাইয়া নিজেদের রুটি-রুজির পথ নিজেরাই রুদ্ধ করিয়া দিতে চাহে এমন কথা বিশ্বাস করাও কঠিন। কিন্তু বাস্তবে আমরা রানা প্লাজার জের ধরিয়া বিক্ষুব্ধ শ্রমিকদেরকে শুধু গার্মেন্টস শিল্পেই নহে বলিতে গেলে সকল প্রকার কলকারখানা, ব্যাংক বুথ, খাবারের দোকান ইত্যাদি সবকিছুকেই লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করিতে দেখিয়াছি। এইসব ঘটনা দৃষ্টে অনেকেই বিশ্বে আমাদের লব্ধ প্রতিষ্ঠিত পোশাক শিল্পকে সুপরিকল্পিতভাবে ধ্বংসের ইহা কোন চক্রান্ত কিনা উহা লইয়াও প্রশ্ন তুলিয়াছেন। অবিশ্যি এ ধরনের আশংকাকে একেবারে উড়াইয়া দেওয়া যাইবে তেমনটি মনে হয় না।
আমরা গোটা দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের ক্ষেত্রে যেরূপ অব্যবস্থা, অনিয়ম, দুর্নীতি ইত্যাদি দেখিতে পাই তাহাতে অর্থনৈতিক ভবিষ্যত্ যে ক্রমান্বয়ে অন্ধকারাচ্ছন্ন হইয়া পড়িতেছে ইহাতে আর ভুল কি! গত রবিবার ইত্তেফাকে দেশের অর্থনৈতিক ভবিষ্যতের উপর কালো ছায়া শীর্ষক যে প্রতিবেদনটি ছাপা হইয়াছে উহা পাঠ করিলে সত্য সত্যই আমাদের অর্থনৈতিক ভবিষ্যত্ প্রশ্নে একরাশ হতাশা আর অনিশ্চয়তায় মন ছাইয়া যায় বৈ কী! গার্মেন্টসে ভাঙচুর, আক্রমণ ইত্যাদি যাহারা উস্কাইয়া দিতেছে তাহাদেরতো বোঝা উচিত যে, শিল্প-কারখানা ধ্বংস করিয়া কার্যোদ্ধার বা মতলবী স্বার্থোদ্ধারের অপচেষ্টা প্রকারান্তরে সকলের জন্যই বিপদ ডাকিয়া আনিবে। সুতরাং দেশ-জাতি ও সর্বোপরি সকলের স্বার্থেই এই হীন মানসিকতা চরিতার্থ করিবার অভিপ্রায় অবশ্যই পরিত্যাজ্য।
আমাদের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রার পথে সবচাইতে বড় বাধা হইতেছে অব্যবস্থা। একটি অর্থনৈতিক প্রতিষ্ঠান কিংবা যেকোন প্রতিষ্ঠানই হউক না কেন উহা পরিচালনায় দক্ষ ব্যবস্থাপনার কোনই বিকল্প নাই। বিশৃংখলা ও নৈরাজ্যের মধ্যে কখনই কোন কিছু দাঁড়ায় না। আমরা বুঝিবা নৈরাজ্য ও বিশৃংখলার মাঝেই একপ্রকার বিকৃত আনন্দ লাভ করি আর সে কারণেই হয়তো নিয়মনীতি, বিধি-বিধান মানিয়া চলা আমাদের যেন ধাতেই সহে না। দক্ষ ব্যবস্থাপনা গড়িয়া তুলতে যে ধরনের অনুকূল পরিবেশ প্রয়োজন সে পরিবেশ সৃষ্টি করিতে কাহারও যেন কোন গরজ নাই। শিল্পায়নের জন্য যে অবকাঠামো দরকার উহাতো নাই-ই উপরন্তু আবার প্রতিকূল ব্যাংকিং ব্যবস্থা, হরতাল ও সামাজিক অস্থিরতা ইত্যাদি কারণে সবকিছুই মুখ থুবড়াইয়া পড়ার উপক্রম হয়। নানান পরিবেশগত কারণে উত্পাদন হউক চাই না-ই হউক, পণ্য বাজারজাত করা সম্ভব হউক চাই না-ই হউক ব্যাংকের সুদ ঠিকই গনিয়া যাইতে হইবে। মাসে ১০/১২ দিন কলকারখানা চলিলেও কর্মচারীদের বেতন-ভাতা আবার পুরো মাসেরটাই জোগান দিতে হইবে কর্তৃপক্ষকে। এমতাবস্থায় শিল্প প্রতিষ্ঠান, কলকারখানা বা ব্যবসা প্রতিষ্ঠান চালাইয়া রাখা সম্ভবই বা কিরূপে। অন্যদিকে যখন গ্যাস-বিদ্যুতের সংকট লাগিয়াই থাকে তখন দেশের অর্থনীতির ভবিষ্যতের উপর কালো ছায়া নামিয়া আসিবে নিশ্চয়ই।
