জরাজীর্ণ ভবন ও আমাদের বাস্তবতা

আপডেট : ২৯ এপ্রিল ২০১৩, ২১:৫৫
সম্প্রতি কমপ্রিহেনসিভ ডিজাস্টার ম্যানেজমেন্ট প্রোগ্রামের (সিডিএমপি) এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হইয়াছে যে, ঢাকায় প্রায় ৭৮ হাজার ঝুঁকিপূর্ণ ভবন রহিয়াছে। ইহার মধ্যে মারাত্মক ঝুঁকিতে আছে সাড়ে ছয় হাজার ভবন। পরিত্যক্ত ও নানা ধরনের ঝুঁকির মধ্যে আছে প্রায় ৫ হাজার সরকারি বাসভবন ও কার্যালয়। অন্যদিকে খুলনা মহানগরীসহ এই জেলায় শতাব্দী-প্রাচীন দুই শতাধিক জরাজীর্ণ ভবন বিদ্যমান। ভবনগুলিতে বসবাস করেন কয়েক হাজার মানুষ। ২০০৪ সালে নোটিস দেওয়া হইলেও বাড়িগুলি ভাঙার বন্দোবস্ত হইতেছে না। চট্টগ্রামেও অনেক ঝুঁকিপূর্ণ ভবন রহিয়াছে। সিডিএ’র (চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ) তালিকা অনুযায়ী মহানগরীতে এরকম ভবনের সংখ্যা ৬০ বলা হইলেও বাস্তবে ইহার সংখ্যা আরও বেশি। বর্তমানে সেখানে ঝুঁকিপূর্ণ ও নকশাবহির্ভূত ভবন নির্মাণ বাড়িয়া চলিয়াছে উদ্বেগজনকভাবে। এইভাবে বিশ্লেষণ করিলে দেখা যায়, সারাদেশেই কমবেশি জরাজীর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ ভবন রহিয়াছে। কিন্তু আমাদের অসচেতনতা ও অবহেলায় তাহা সংস্কার সাধন বা ভাঙিয়া ফেলার কোন উদ্যোগ পরিলক্ষিত হইতেছে না। সাভার ট্রাজেডির ন্যায় বড় ধরনের দুর্ঘটনার পরই কেবল আমাদের টনক নড়ে। কিন্তু কিছুদিন যাইতেই আবার যেইকার সেই পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। আমাদের সচেতনতার অভাব রহিয়াছে ইহা সকলের জানা কথা। তবে তাহার চাইতেও বড় ব্যাপার হইল, মানুষ আসলে অভ্যাসের দাস। বলা যায়, অবস্থা, পারিপার্শ্বিকতা ও পরিস্থিতিরও শিকার বটে। আমাদের ন্যায় উন্নয়নশীল দেশের ক্ষেত্রে একথা খুবই প্রযোজ্য। যেমন- যে কোন ভবন নির্মাণের আগে প্রয়োজন সয়েল টেস্ট বা মাটি পরীক্ষা। অনেক সময় একাধিকবার পরীক্ষা-নিরীক্ষারও দরকার হয়। কিন্তু ইঞ্জিনিয়ার দ্বারা কতজন সেই পরীক্ষা করেন? অনেকে ইহার ব্যয় বহন করিতে চাহেন না বা পারেন না। তাহাছাড়া ভবন নির্মাণে অনুমতি দেওয়ার জন্য নির্দিষ্ট কর্তৃপক্ষ রহিয়াছেন। রাজধানী ঢাকায় আছে রাজউকসহ বিভিন্ন সংস্থা। প্রায় ১৩/১৪টি সংস্থা ভবন নির্মাণের আগে খুঁটিনাটি বিষয়ে ছাড়পত্র প্রদান করে। কিন্তু এক্ষেত্রে আমাদের অভিজ্ঞতা মোটেও সুখকর নহে। অনুমোদন নিতে গিয়া গ্রাহকদের নানা বিড়ম্বনায় পড়িতে হয়। ঘাটে ঘাটে ঘুষ তো দিতেই হয়, তাহারপরও অনুমোদন প্রদানের কাজটি ঠিক সময়ে হয় না। এই প্রক্রিয়া শেষ করিতে ক্ষেত্রবিশেষে এক বছরেরও বেশি সময় লাগে। এই পরিস্থিতিতে অনেকে অনুমোদনেরও তোয়াক্কা করেন না বলিলেই চলে। এইভাবেও অবৈধ ও দুর্বল ভবন নির্মাণের প্রবণতা বাড়িতেছে। রাজধানী ঢাকার বাহিরে সাধারণত সংশ্লিষ্ট সিটি করপোরেশন, পৌরসভা ও ইউনিয়ন পরিষদ ভবন নির্মাণের অনুমতি দেয়। সেখানেও চলে অবৈধ অর্থের লেনদেন। কিন্তু দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা টাকা পাইয়াই খুশি, তাহারা ভবন নির্মাণকালে অনেক সময় কোন খোঁজ-খবর করেন না। অর্থাত্ তাহাদের দায়িত্বহীনতার কারণেও বাংলাদেশে ঝুঁকিপূর্ণ ভবন নির্মাণ বাড়িয়া গিয়াছে আশংকাজনক হারে। অন্যদিকে কর্তৃপক্ষ হয়তো কোন ভবন ঝুঁকিপূর্ণ বলিয়া শনাক্ত করিলেন, কিন্তু পরবর্তীতে দেখা গেল কয়েক যুগ ধরিয়া তাহা দিব্যি ব্যবহার করা সম্ভব হইতেছে। অর্থাত্ আগের আশংকা ছিল অমূলক। এই আস্থাহীনতার কারণেও তথাকথিত ঝুঁকিপূর্ণ ভবন ভাঙিয়া ফেলার ক্ষেত্রে ভবন মালিকগণ কোন আগ্রহ দেখাইতেছেন না বা কালক্ষেপণ করিতেছেন। ঝুঁকিপূর্ণ ভবন মেরামত বা ভাঙিয়া ফেলার দায়িত্ব প্রথমত মালিকের মর্জির উপরই নির্ভরশীল। এ ব্যাপারে তাহাদের আরও সতর্ক হইতে হইবে। কেননা প্রাণহানির আশংকাসহ শেষপর্যন্ত ক্ষয়ক্ষতি তাহার কম হয় না।

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন