‘ভাই আমাকে রেখে যাবেন না। আমাকে বাঁচান। আমি বাঁচতে চাই’—কথাগুলো বলছিলেন কুষ্টিয়ার মেয়ে শাহিনা।
উদ্ধারকর্মীদের প্রাণান্ত চেষ্টা। টিভি পর্দায় লাখো মানুষের দৃষ্টি। কোটি মানুষের প্রার্থনা। সব ব্যর্থ করে দেশবাসীকে কাঁদিয়ে গেলেন শাহিনা।
সাভারে ভবন ধসের পঞ্চমদিনেও ধ্বংসস্তূপের ভেতরে বেঁচে ছিলেন শাহিনা। দীর্ঘক্ষণ তাকে উদ্ধারের চেষ্টাও চলে। মূলত তাকে উদ্ধারের জন্যই ভারী যন্ত্রপাতি ব্যবহার বা ব্যাপক অভিযানে নামেননি উদ্ধারকারীরা।
রবিবার রাতে ৮ জনের একটি উদ্ধারকারী দল শাহিনাকে উদ্ধারে তত্পরতা শুরু করেন। এর আগে খাবার এবং সেলাইন দিয়ে বাঁচিয়ে রাখা হয়। এরই মধ্যে একজন উদ্ধারকারী শাহিনাকে টেনে বের করার চেষ্টা করেন। কিন্তু তার জামা আঁটকে যায়। তাত্ক্ষণিক জামা কাটা বা ছেঁড়া সম্ভব হয়নি। শাহিনাকে বলা হয়েছিল জামা খুলে বের হতে। তিনি অসম্মানজনকভাবে বের হতে চাননি। এ অবস্থায় আরেকজন উদ্ধারকারী ড্রিল মেশিন চালিয়ে শাহিনাকে উদ্ধারের চেষ্টা করেন। উপস্থিত লোকজন অবশ্য ড্রিল মেশিন চালাতে নিষেধ করেছিলেন। আগুন ধরে যাবে বলে তাকে সতর্ক করেছিলেন। সেখানে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের ডাক্তার মুরাদ সে সময় শাহিনাকে উদ্ধারের চেষ্টা করছিলেন। কিন্তু ড্রিল মেশিন ব্যবহারের কারণে মুহূর্তেই আগুন ধরে যায়।
শাহিনাকে ওই অবস্থায় ফেলে নিজের জীবন বাঁচাতে চলে আসেন সবাই। এরপর শাহিনার ভাগ্যে কি জুটেছে নিশ্চিত করে কেউ বলতে পারেননি। তবে ধারণা করা হচ্ছে আগুনে ঝলসে গেছেন শাহিনা, না হয় ধোঁয়ায় দম বন্ধ হয়ে তার মৃত্যু হয়েছে।
ধ্বংসস্তূপ থেকে বের হয়ে ডাক্তার মুরাদ কান্নায় ভেঙ্গে পড়েন। তিনি জানান, তাকে রেখে সবাই চলে এসেছেন। আগুন ধরে যাওয়ায় তিনিও শাহিনাকে উদ্ধার করতে পারেননি। শেষ মুহূর্তে শাহিনা তাকে বলেছিলেন, ‘ভাই আমাকে রেখে যাবেন না। আমাকে বাঁচান। আমি বাঁচতে চাই’। এ সময় তার কথা শুনে চোখের পানি ধরে রাখতে পারেননি অন্যরা। এর আগে ররিবার সকাল ৯টায় যে চারজন জীবিত মানুষের সন্ধান পাওয়া যায় তাদেরই একজন শাহিনা। সকালে চারজন জীবিত থাকলেও দুপুর ২টার মধ্যেই তাদের তিনজন নিস্তেজ হয়ে পড়েন। শাহিনা হাল ছাড়েননি। দাঁতে দাঁতে চেপে মৃত্যুর সঙ্গে লড়ছিলেন তিনি। দুপুর ২টা থেকে রাত ১০টা পর্যন্ত তাকে উদ্ধারের আপ্রাণ চেষ্টা চলছিল।
উদ্ধারকর্মীরা বুঝতে পেরেছিলেন ঝুঁকি না নিলে বাঁচানো যাবে না শাহিনাকে। উদ্ধারকারীদের মনে হচ্ছিল প্রতিমুহূর্তে ভবনটা চেপে আসছিল। যেন সরু হয়ে আসছিল সুড়ঙ্গপথ। বিন্দুমাত্র কুণ্ঠাবোধ না করে অদম্য সাহসিকতার পরিচয় দিয়ে তারা সুড়ঙ্গে প্রবেশ করছিলেন বারবার।
মনোবল বৃদ্ধির জন্য বারবার শাহিনার সাথে কথা বলা হচ্ছিল। বলা হচ্ছিল ভয় না পেয়ে সাহস রাখতে, তাকে খুব শীঘ্রই বের করে আনা হবে বলে আশ্বাস দেয়া হচ্ছিল। জানতে চাওয়া হয়েছিল ঠিকানা, মোবাইল নম্বর। সরু পাইপের সাহায্যে অক্সিজেন ও পানি দিয়ে বাঁচিয়ে রাখার সর্বাত্মক চেষ্টা করছিল সবাই।
সর্বশেষ ৮ জনের উদ্ধারকারী দলের যে সদস্যরা উদ্ধার কাজ শুরু করেন তাদের একজন সেনা সদস্য লে. আশরাফ বলেন, ‘শাহিনা আমার সঙ্গে কথা বলেছেন, হ্যান্ডশেকও করেছেন। তিনি আমাকে বলেছেন, তার দেড় বছর বয়সী একটি ছেলে সন্তান রয়েছে। বেঁচে থাকার কী আকুল আকুতি তা শাহিনার সঙ্গে কথা না বললে বোঝানো যাবে না।’ বারবার উদ্ধারকর্মীদের বলছিলেন, ‘আমি মারা গেলে আমাকে দেখতে আসার মতো কেউ নেই, আমার বাচ্চা ছাড়া।’
প্রশিক্ষিত সেনা সদস্যদের সাথে আজিজ নামে একজন স্বেচ্ছাসেবকও নিজের জীবন বাজি রেখেছিলেন শাহিনাকে বাঁচানোর জন্য। সেনা সদস্যরা যখন শত চেষ্টা করেও কিছু করতে পারছিলেন না তখন আজিজ বলেন, স্যার আমাকে একটু সুযোগ দেন। আপনারা তো অনেক চেষ্টা করলেন। দেখি আমি কিছু করতে পারি কিনা। ছোট সুড়ঙ্গ দিয়ে তাকে বের করার জন্য টানা-হেঁচড়া করেও বের করা যাচ্ছিল না। তখন আজিজ তাকে বলেছিলেন তার গায়ের কাপড় খুলে ফেলতে। শাহিনা ইতস্তত করায় আজিজ তাকে বলেছিলেন, ‘বোন তোমার কোন সমস্যা নাই, আমি তোমার ভাই’।
একটা সময় তাকে বুক পর্যন্ত বের করে আনা হয়। কিন্তু শরীরের বাকি অংশ বিমে আটকে যায়। তাকে আর বের করা যাচ্ছিল না। তখন সিদ্ধান্ত হয় প্রয়োজনে কোনো অঙ্গ কেটে তাকে বের করার। শাহিনা রাজি হননি। তিনি বলছিলেন, তাহলে তার দুধের শিশু বঞ্চিত হতে পারেন। আপনারা এটা করবেন না।
আজিজ যখন রড কাটছিলেন সুড়ঙ্গের মুখ বড় করার জন্য তখন সেখানে আগুন ধরে যায়। অবস্থা বেগতিক দেখে শাহিনাকে ওই অবস্থায় ফেলে সবাই চলে আসেন। ধারণা করা হচ্ছে ওই আগুনের উত্তাপে কিংবা ধোঁয়ায় দম আটকে মারা গেছেন শাহিনা।
যদিও কেউ কেউ বলেছেন, সোমবার সকালেও শাহিনার কণ্ঠ শোনা গেছে। সত্য-মিথ্যা যাচাই করা যায়নি। কেউ বলছেন, এখন তার বেঁচে থাকার কোনো সম্ভাবনা নেই। কেউ বলছেন, অলৌকিক কিছু হতেও তো পারে।
সোমবার বেলা দেড়টায় জানা গেল উদ্ধারকর্মীরা শাহিনার খোঁজ নিতে যেতে পারেননি। কারণ তখনো ওই ধসে পড়া ভবন থেকে ধোঁয়া বের হচ্ছিল।
টানা পাঁচ দিন পাঁচ রাত ধসে পড়া ভবনের নিচে আটকে থেকে বাঁচার খুব কাছ থেকে ফিরে যাবে শাহিনা? সে কি আর কখনো পৃথিবীর আলো-বাতাস দেখতে পাবে না? শাহিনা তুমি আমাদের ক্ষমা কর। স্বামীর মৃত্যুর পর ছেলে আর নিজেকে বাঁচিয়ে রাখতে গার্মেন্টসে কাজ নিয়েছিলেন শাহিনা। তবু কি বাঁচাতে পেরেছেন নিজেকে? শাহিনার কাছে জাতি কী জবাব দেবে?
লেখক :সাংবাদিক
