প্রেমান্ধ বা ধর্মান্ধ যা-ই বলি না কেন এই জাতীয় অন্ধত্ব মানুষের দৃষ্টিকে সীমাবদ্ধ করে দেয়। সে তখন অন্যের আবেগ- অনুভূতি, আশা-আকাঙ্ক্ষা বা বক্তব্যের প্রতি সম্মান প্রদর্শনে অসহিষ্ণু হয়ে পড়ে। ধর্মভীরুতা আর ধর্মান্ধতা এক নয়। বাংলাদেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম সম্প্রদায়সহ সব ধর্মের লোকজনই ধর্মভীরু। পৃথিবীর বহু দেশের মতো বাংলাদেশেও ধর্মভিত্তিক রাজনৈতিক দল বর্তমান। এখানকার মানুষ ধর্মান্ধ হলে এতোদিনে রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হতো এই জাতীয় কোনো দল। সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বজায় রেখে একসঙ্গে শান্তিতে বসবাস করাই এ দেশের সকল সম্প্রদায়ের মানুষের বহুকালের ঐতিহ্য।
ভারতবর্ষে ব্রিটিশদের আগমনের পূর্ব থেকেই হিন্দু-মুসলিম সম্পর্ক শক্ত ভিতের ওপর গ্রন্থিত না হলেও অম্ল-মধুর সম্পর্কের ভিত্তিতেই এই দুই জাতি মিলেমিশে সুখে-শান্তিতে বসবাস করে আসছিল শত শত বছর। সম্রাট আকবরও ব্রতী হয়েছিলেন সম্পর্কের স্থায়ী রূপদানে। ব্রিটিশ বিতাড়নে দুই সম্প্রদায়েরই ঐতিহাসিক ভূমিকা থাকা সত্ত্বেও ধর্মীয় বিভাজনের কারণেই ব্রিটিশ উপনিবেশের বিরুদ্ধে সকল ক্ষেত্রে সম্মিলিতভাবে রুখে দাঁড়ানোর ঘটনা হয়েছে বিলম্বিত। এই সুযোগে প্রায় দুইশত বছর তারা ভারতবর্ষকে শাসন ও শোষণ করেছে নিজেদের ইচ্ছেমাফিক। ব্রিটিশ সরকার এই বিভাজনকে লালন করতে পেরেছে সর্বোচ্চ সতর্কতায়। এক্ষেত্রে তাদের সফলতা প্রশ্নাতীত। শেষ পর্যন্ত তারা বিষয়টিকে এমন তিক্ততা আর অবিশ্বাসের দ্বারপ্রান্তে নিয়ে যেতে সক্ষম হয়েছে, যেখানে একটি ভূখণ্ডকে দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে ভাগ করে দেয়া হয়েছে দুইটি স্বতন্ত্র রাষ্ট্র।
রামুর নৃশংস ঘটনা ঘটেছে ২৯ সেপ্টেম্বর ২০১২। প্রায় ছয় মাস পরে উচ্চ পর্যায়ের বিচার বিভাগীয় তদন্ত শুরু হয়েছে ২০ মার্চ ২০১৩। মনে রাখতে হবে Justice delayed justice denied- ছয় মাসে তোতা পাখির মুখেও ভাষা পেতে পারে নতুন কথা। তাই তো পৃথিবীর সকল দেশেই গুরুত্ব দেয়া হয়েছে প্রাথমিক তদন্তের ওপরে। দেশে যখনই কোনো ধর্মীয় অনুভূতির প্রতি আঘাত আসে তখনই সরকারকে বলতে শোনা যায়- তদন্ত হচ্ছে এবং প্রচলিত আইনেই অপরাধীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। এই প্রচলিত আইনের মধ্যেও সুচতুর ব্রিটিশ জাতি রেখে গেছে বিভাজনের সূক্ষ্মবীজ। দণ্ডবিধির সংশ্লিষ্ট ধারা শাস্তিযোগ্য অপরাধ হলেও ভারতীয় উপমহাদেশের বিচার ব্যবস্থায় কোনো দেশেই অভিযুক্ত ব্যক্তি বা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে জরিমানা বা জরিমানাসহ তিন মাস বা ছয় মাসের বেশি শাস্তি প্রদানের ঘটনা বিরল। মসজিদ-মন্দির, প্রতিমা- বিগ্রহ ভাংচুরসহ একজনের ধর্মীয় অনুভূতিতে চরম আঘাত প্রদানকারী অভিযুক্তের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ শাস্তি দুই বছর, যা কিনা কদাচিত্ প্রমাণ হলে জরিমানা বা তিন মাস-ছয় মাসের দণ্ডের বিচারে সমাপ্তি ঘটে। দণ্ডবিধি ছাড়া দেশে বিদ্যমান আর কোনো আইনে ধর্মীয় উন্মাদনা নিবারণের ভাষা অস্পষ্ট। অপরাধীকে এরকমের প্রতিরোধের সূতায় বাঁধতে গিয়ে তাদেরকে বরঞ্চ ধর্মীয় অপরাধ সংঘটনে পরোক্ষভাবে উত্সাহিত করা হয়। আবার কখনো কখনো দেখা যায় অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেলেও সাক্ষ্য-প্রমাণের অভাবে দুর্বৃত্তরা খালাস পেয়ে যায়। এক্ষেত্রে আক্রান্ত নিরীহ সম্প্রদায় পরবর্তী হামলার আশঙ্কায় সাক্ষ্য দেয়া থেকে বিরত থাকে। এটা ঘটে আইন-শৃংখলা রক্ষাকারী বাহিনীর প্রতি আস্থাহীনতার কারণে। এই আইনের সংশ্লিষ্ট ধারার শাস্তির বিধান পরিবর্তন হওয়া আবশ্যক। আধুনিক সভ্য দেশগুলোতে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নিরাপত্তা বিধানে ‘এন্টি রেজিস্ট ল’ নামে কঠোর আইনের বিধান আছে। আমরা ব্লাসফেমি আইন প্রণয়নের দাবি শুনতে পাই। এই দুই আইনের সমন্বয়ে গুরু দণ্ডের বিধান রেখে প্রণীত হতে পারে নতুন কোনো আইন, যা সকল ধর্ম মতের আঘাতকে দমন করা সহজ হবে। কিন্তু প্রগতিশীলতার দাবিদার কোনো সংগঠন বা ব্যক্তিবিশেষের কাছ থেকে এই জাতীয় কোনো আইন রচনার আওয়াজ পাই না।
‘আজি বাংলাদেশের হূদয় হতে...’ রবীন্দ্রনাথের এই বাংলাদেশ আর আজকের বাংলাদেশের বাস্তবতা এক নয়। ভৌগোলিকভাবে বাংলা ভাগ হয়েছে একাধিকবার। এক দ্রৌপদীর একাধিক পাণ্ডবের দশায় সন্তানরা কুণ্ঠিত ও লজ্জিত। খণ্ডনের কালিমা মোটাদাগ হয়ে স্থান করে নিয়েছে ইতিহাসের পাতায়। আজকের প্রেক্ষাপটে বাঙালিপনার মূলধারাটি এবং উত্সমুখটি বহন করে চলেছে বর্তমান বাংলাদেশ। দুঃখজনক হলেও সত্য, সকল ধর্ম-বর্ণ-শ্রেণির মানুষের মহান ত্যাগের ফসল এই দেশ আজ মননে-মেধায় দ্বিধাবিভক্ত। শেষ ভরসা তরুণ প্রজন্ম। যে জাতির সামনে আকাশছোঁয়া অহঙ্কার নিয়ে জ্বলজ্বল করছে মিলনের বেদিমূল- শহীদ মিনার, সে জাতি ঐক্যবদ্ধ হবেই। সাম্য-সম্প্রীতি আর ভ্রাতৃত্বের বন্ধনে ঐক্যবদ্ধ জাতির সামনে থেকে চিরকালের জন্য অপসৃত হবে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের আতঙ্ক ও ভয়। আর এই মিলনের কোরাস ধ্বনিত হবে তারুণ্যের হাত ধরে।
লেখক: কবি
