হরতালের কারণে জাতীয় অর্থনীতি একই সাথে বেসরকারি খাতকে চড়া মূল্য দিতে হয়। ২৪ এপ্রিল সাভারে সংঘটিত মহাবিপর্যয় এই সংকটকে আরো ঘনীভূত করেছে। রানা প্লাজা ধসের পরিণতিতে সৃষ্ট তীব্র শোক দীর্ঘদিন যে আমাদের স্মৃতিকে ভারাক্রান্ত করে রাখবে তা বলাই বাহুল্য। নিম্নমানের নির্মাণ সামগ্রী ব্যবহার এবং বালু দিয়ে ভরা জলাশয়ে পাঁচতলা ভবনের ফাউন্ডেশন দিয়ে অবৈধভাবে ন’তলা ভবন নির্মাণের ফলশ্রুতিতে সেটি ধসে পড়ে। ইতিমধ্যে প্রায় ৪শ’ মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। সমন্বিত অভিযানের ফলে ধসে পড়া ভবন থেকে আটকে পড়া প্রায় আড়াই হাজারেরও বেশি লোককে উদ্ধার করা সম্ভব হয়েছে। এক্ষেত্রে সরকারি বেশ কয়েকটি সংস্থা যেমন— সশস্ত্র বাহিনী, র্যাব, ফায়ার সার্ভিস এবং সন্নিহিত এলাকার জনগণ ও শিল্প এলাকার শ্রমিকরা যেভাবে স্বতস্ফুর্তভাবে এগিয়ে এসেছেন তা প্রশংসনীয়। সাধারণ জনগণ ও তরুণ সম্প্রদায় যেভাবে স্বতঃস্ফূতভাবে এগিয়ে এসেছে তা রীতিমত বিস্ময়কর। তাদের এই মহানুভবতা ও দায়িত্ববোধ আমাদের জাতীয় ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লিখিত থাকবে। কেউ রক্ত দিচ্ছেন, কেউ অক্সিজেন জোগাড় করছেন, আবার কেউ খাদ্য ও পানীয় সরবরাহ করছেন। এসব ভাবলে মনটা আনন্দে ভরে যায়। সহযোগিতার এই হস্ত প্রসারণে বহু বিপর্যস্ত ও আটকে পড়া শ্রমিকের জীবন রক্ষা পেয়েছে। ভবন ধসের প্রথম দিকটায় নানারকম প্রতিবন্ধকতা ছিল। এসব বাধা যদিও অতিক্রম করা গেছে। হরতাল কর্মসূচি চলছিল। সেই কর্মসূচি রহিত করা হয়। ঈশ্বরকে ধন্যবাদ যে, কল্যাণকর চিন্তা-ভাবনা সমাজে এখনো বহাল রয়েছে। এর ফলে যা হয়েছে ধসে পড়া ভবনে আটকে পড়াদের উদ্ধারে উদ্বারকারী যানবাহন সংগ্রহ সম্ভব হয়েছে, উদ্ধারকর্মীরাও কাজ শুরু করতে পেরেছেন।
এরপরই উদ্ধার কার্যে প্রয়োজনীয় যন্ত্রপাতির যোগান দেয়া ও নৈশকালে অভিযান অব্যাহত রাখার প্রসঙ্গ ওঠে। ধসে পড়া ভবনের লোকদের খাদ্য, পানীয় ও অক্সিজেন সরবরাহ ছিল জরুরি।
হ্যাঁ সবকিছুরই ব্যবস্থা হল এবং তা আমাদের নিজস্ব উদ্যোগে। এক্ষেত্রে বিদেশের বা বাইরের কোন সাহায্যই প্রয়োজন হয়নি। এভাবেই আমরা আমাদের ঐক্যের শক্তি প্রদর্শনে সমর্থ যেমন হই তেমনি হাজার হাজার লোক প্রাণহানি থেকে রক্ষা পান। আমাদের ভবিষ্যতের জন্য এটি একটি উজ্জ্বল উদাহরণ।
একথা অনস্বীকার্য এত বড় একটা বিপর্যয় মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় ও সমন্বিত পরিকল্পনার অভাব ঠিকই অনুভূত হয়েছে। কারো কারো অভিমত, দেশের বিভিন্ন অংশে বিদ্যমান শিল্পাঞ্চলে হালে বিপর্যয়কর অবস্থা মোকাবিলা অনিবার্য হয়ে উঠেছে যা দুঃখজনক সন্দেহ নেই। প্রতিটি ক্ষেত্রেই প্রয়োজনীয় উপকরণের অভাব অপ্রতুলতা অনুভূত হয়েছে। কিন্তু এই ঢাকা শহরেই যদি বড় ধরনের একটা ভূমিকম্প হয় তাহলে তা থেকে বাঁচার কী উপায়। আমরা সকলেই জানি যে, ঢাকা একটি অপরিকল্পিত শহর। অভিজ্ঞমহলের মতে, ঢাকায় সংঘটিত ভূমিকম্পে কম করে হলেও ৫ লক্ষ লোকের প্রাণহানি ঘটার আশংকা রয়েছে।
রানা প্লাজা ধসে পড়ায় কয়েকটি বিষয় সকলকেই প্রবলভাবে নাড়া দিয়েছে। সকলেই বিশ্বাস করেন যে, লোভ, লালসা, দুর্নীতির ফলশ্রুতিতে এই মহাবিপর্যয় ঘটেছে।
রানা প্লাজা সবদিক থেকেই একটি ত্রুটিপূর্ণ ভবন। ভবন নির্মাণ সম্পর্কিত কার্যাবলিতে সম্পৃক্ত তদারকি পরিকল্পনাকারী, লগ্নিকার সকলেই অবহেলা, ঔদাসীন্য ও অনৈতিকতার আশ্রয় নিয়েছেন। যদিও এদের অনেকে গ্রেফতার হয়েছেন। এদিকে ভারতে পালানোর পথে ভবন মালিক সোহেল রানাও গ্রেফতার হয়েছেন। তবে আরো যারা এই অনৈতিকতার সাথে জড়িত তাদের সকলকেই অন্তরীণ করা জরুরি। এদের মধ্যে বিশেষভাবে উল্লেখ করতে হয় যেসব প্রকৌশলী এই ভবনটি তৈরি করেছেন, একই সাথে বিদ্যমান আইনকে বুড়ো আঙ্গুল দেখিয়ে যারা অন্যায় কাজে সমর্থন ও সহায়তা দিয়েছেন, তাদেরকে অবশ্যই খুঁজে বের করতে হবে এবং ফৌজদারি অপরাধে বিচারের আওতায় আনতে হবে। কেননা তারা হত্যাযজ্ঞ চালিয়েছেন, মানুষকে হত্যার দায়ে তারা অবশ্যই অভিযুক্ত। বলাবাহুল্য তাদেরকে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি প্রদান বাধ্যতামূলক।
আইনের শাসন রক্ষায় যারা জড়িত তাদের জন্য এটি একটি সুবর্ণ সুযোগ। এক্ষেত্রে তারা দেখাতে পারবেন যে, রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা সত্ত্বেও আইনের শাসন সমুন্নত রাখতে বিচারকরা কুণ্ঠাহীন নন। এর দ্বারা রাজনৈতিক সদিচ্ছাও বিদ্যমান হবে। সোহেল রানাকে গ্রেফতার অবশ্যই একটি ভাল পদক্ষেপ। গার্মেন্টস মালিকদের প্রত্যাশা হলো শ্রমিকরা দক্ষতার সাথে কাজ করবে। কিন্তু এটাও খুব গুরুত্বপূর্ণ যে, তাদেরও মানবাধিকার এবং নিরাপত্তা সুরক্ষার অধিকার রয়েছে। সাভার ট্রাজেডি বিদেশে আমাদের ভাবমূর্তি ব্যাপকভাবে ক্ষুণ্ন করেছে এবং সরকারের তরফ থেকে যদি যথাযথ পদক্ষেপ গ্রহণ না করা হয় তাহলে আন্তর্জাতিকভাবে দায়বদ্ধতার প্রশ্ন রয়ে যাবে।
রানা প্লাজায় বড় ধরনের ফাটল দেখা দিয়েছিল। ব্র্যাক ব্যাংক তাদের সকল কর্মকাণ্ড বন্ধ করে দিয়েছিল। এরপরও কী করে রানা প্লাজার গার্মেন্টস মালিকরা তাদের শ্রমিকদের কাজে যোগ দিতে বাধ্য করেছিলেন। পত্র-পত্রিকায় ও ইলেকট্রনিক মিডিয়ায় শ্রমিকরা এ সম্পর্কিত যে বিবরণ প্রদান করেছেন তা এক কথায় ভয়াবহ।
সরকার বিশেষ করে প্রধানমন্ত্রী আশ্বস্ত করেছেন যে, ক্ষতিগ্রস্তদের আর্থিক সাহায্য দেয়া হবে। যাদের দীর্ঘস্থায়ী পুনর্বাসনের প্রয়োজন হবে তাদের দীর্ঘমেয়াদি স্বাস্থ্যসেবা প্রদান করা হবে। এহেন মানবিক পদক্ষেপের প্রেক্ষিতে বিজিএমইএ ও অন্যান্য আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে করপোরেট সামাজিক দায়িত্বশীলতার আলোকে সহায়তার হাত প্রসারিত করতে হবে। বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান ও ব্যাংকসহ সাহায্য প্রদানের জন্য এগিয়ে এসেছে। অন্যদেরও অনুরূপ পদক্ষেপ নিতে হবে। মোবাইল কোম্পানিগুলোকে এই উদ্যোগে এগিয়ে আসতে হবে। কেননা ক্ষতিগ্রস্ত গার্মেন্টস শ্রমিকরা সকলেই মোবাইল ফোন ব্যবহার করে থাকে বা করেছে। পোশাকশিল্পের উন্নয়নে ও ইমেজ রক্ষায় বিজিএমইএ ও বিকেএমইএকে কতগুলো বিষয় পুনঃপরীক্ষা করে দেখতে হবে। ওভেন ও নীটওয়্যার উভয়ক্ষেত্রেই গার্মেন্টস ব্যবসায়ীদের আন্তর্জাতিক প্রয়োজনগুলো অক্ষরে অক্ষরে প্রতিপালন করতে হবে। তাদের ভুললে চলবে না যে, উত্তর আমেরিকা ও ইউরোপের শ্রমিক সংগঠনগুলোর মধ্যে এই ধারণা সৃষ্টি হয়েছে যে, আমাদের শ্রমিকদের মজুরি খবুই কম এবং তাদের কর্মক্ষেত্রে নিরাপত্তা নেই। তাদের মধ্যে এ বিশ্বাসও বদ্ধমূল হয়েছে যে, বিবেকবর্জিত বায়িং হাউজগুলো বাংলাদেশের পোশাক মালিকদের নানাভাবে এক্সপ্লয়েট করছে। আমাদের ভুললে চলবে না, বিদেশে ভোক্তা সমিতিগুলোর প্রভূত ক্ষমতা। বাংলাদেশের গার্মেন্টস শ্রমিকদের মজুরি খুবই সামান্য এবং তাদের ন্যূনতম অধিকারাদি উপেক্ষিত হয়ে থাকে এই ধারণা বদ্ধমূল হলে আমরা অবশ্যই আমাদের বিদ্যমান বাজার হারিয়ে ফেলব।
এদিকে হাইকোর্টের এ সম্পর্কিত একটি রায়ও মানা হচ্ছে না। সেফটি অ্যান্ড রাইটস সোসাইটি, ব্লাস্ট, বাংলাদেশ অকুপেশনাল সেফটি, হেলথ অ্যান্ড এনভায়রনমেন্ট ফাউন্ডেশন ২০১১ সালের ৩ নভেম্বর হাইকোর্টে ঐ রিটটি করেছিল। রিটের প্রেক্ষিতে হাইকোর্ট সরকারকে এক বছরের মধ্যে একটি ডেজিগনেটেভ এজেন্সি গঠনের নির্দেশ দিয়েছিল। ঐ নির্দেশে দেশে একটি ভবন নির্মাণ নীতিমালা প্রণয়নের নির্দেশ দেয়া হয়েছিল বিশেষ করে যেসব ভবনে কলকারখানা বা শিল্প স্থাপন করা হবে।
হাইকোর্টের ঐ উপদেশনামূলক নির্দেশনায় রাজউক ও পৌরসভাগুলোকে শুধু ভবন নির্মাণ সম্পর্কিত নীতিমালা লংঘিত হচ্ছে কীনা তাই যাচাই করতে বলা হয়নি। প্রতি তিনমাস অন্তর একটি রিপোর্টও হাইকোর্টে পাঠাতে বলা হয়েছিল। দুঃখজনক ঘটনা হল, হাইকোর্টের ঐ অভিমত সংশ্লিষ্টরা সিরিয়াসলি নেননি। সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য হল হাইকোর্টের ঐ নির্দেশনা প্রতিপালনে তাদের যেমন যথেষ্ট প্রশিক্ষিত লোকবল নেই এবং নেই প্রয়োজনীয় উপকরণাদিও। এক্ষেত্রে তাজরীন গার্মেন্টসে ভয়াবহ দুর্ঘটনার কথা স্মরণ করা যেতে পারে। ঐ দুর্ঘটনার পর ব্যাপক সমালোচনা হয়েছিল। তাজরীন গার্মেন্টসের ক্ষেত্রে দেখা গেল ডেজিগনেটেড দক্ষ ইন্সপেক্টর এটি নিয়মিত দেখভাল করেননি। আর দুর্ঘটনার মূলেও ছিল কারখানাটি পরীক্ষিত না হওয়া। ঐ সময় আরো দেখা গিয়েছিল যে, প্রয়োজনের তুলনায় নগণ্য সংখ্যক ভবন পরিদর্শক রয়েছেন এবং প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধাদিও তাদের নেই।
হিউম্যান রাইটস ওয়াচ এবং হিউম্যান রাইটস কাউন্সিল কর্মস্থলে সুষ্ঠু ও স্বাস্থ্যকর পরিবেশ সৃষ্টি, সেগুলো নিয়মিত পর্যবেক্ষণ ও ট্রেড ইউনিয়ন কার্যক্রম চালানোর অধিকার প্রদানে সরকারকে পুনঃ পুনঃ বলে আসছে বলে জানা গেছে।
জনকল্যাণকর তাদের এহেন ভূমিকাকে স্বাগতম। তবে তাদের জন্য আরেকটি ভাল কাজ হবে ইউরোপ ও উত্তর আমেরিকার বায়িং হাউজগুলোকে বলা যাতে বাংলাদেশের গার্মেন্টস শ্রমিকদের যথাযথ পারিশ্রমিক দেয়। ক্রেতা এবং এই শিল্পের মধ্যস্বতভোগীকে লাভের হারটা কমিয়ে আনতে হবে। তাদের আমি একটি বিশেষ তহবিল গঠনেরও অনুরোধ জানাই। এই তহবিল থেকে গার্মেন্টস শ্রমিকদের আরো যাতে বাড়তি বেতনভাতাদি দেয়া যায়। এই তহবিল গার্মেন্টস মালিক, ক্রেতা ও শ্রমিকদের যৌথ পরিচালনায় চলতে পারে। এরকম একটি জবাবদিহিতা ও স্বচ্ছতা নিশ্চিত করবে।
সাভারে যাই ঘটুক তা বিষয়টিকে রাজনীতির ঊর্ধ্বে রেখে বিচার-বিশ্লেষণ করতে হবে। সাভার ট্র্যাজেডি সারাদেশে উদ্বেগাকুল পরিস্থিতিতে উদ্রেক করেছে। সরকারকে এক্ষেত্রে দেখভাল করার জন্য একটি কমিটি গঠন করতে হবে। একজন ন্যায়পাল নিয়োগ করে তার অধীনে পরিদর্শক নিয়োগ করতে হবে। তাদের কাজ হবে অভিযোগের ভিত্তিতে গার্মেন্টস শিল্পকে মনিটর করা। পোশাকশিল্পের সাথে সংশ্লিষ্ট কারো কাছ থেকে অভিযোগ এলে বিশেষ করে নিরাপত্তা সংক্রান্ত অভিযোগ এলে তা ১৪ দিনের মধ্যে তার সমাধান করতে হবে। বিজিএমইএ ও বিকেএমইএ ন্যায়পালের অফিসের যাবতীয় খরচাদি বহন করবে।
আমাদের সামনের দিকে এগুতে হবে। এ শিল্পে বিশৃঙ্খরা দেখা দিলে আমরা সকলেই ক্ষতিগ্রস্ত হব। রাজনীতিক এবং ব্যবসায়ী কারোরই রেহাই নেই। বিষয়টি গার্মেন্টস শ্রমিক ইউনিয়নের নেতাদেরও ভেবে দেখতে হবে।
উপসংহারে ধসে পড়া রানা প্লাজায় আমি একটি স্মৃতিসৌধ প্রতিষ্ঠার আহ্বান জানাচ্ছি। সরকার এই জমি অধিগ্রহণ করে আহত ও নিহত শত শত শ্রমিকের সম্মানে এই স্মৃতিসৌধ নির্মাণ করতে পারে। দুর্নীতি অর্থগৃধুতাকে বশ করুক এই স্মৃতিসৌধ।
ভাষান্তর :কায়কোবাদ মিলন
লেখক :সাবেক রাষ্ট্রদূত ও আন্তর্জাতিক বিশ্লেষক
[email protected]
