আলোকপাত

দারিদ্র্য হ্রাসে পিছিয়ে পড়ছে দক্ষিণ এশিয়া

আপডেট : ৩০ এপ্রিল ২০১৩, ২১:৪৫
বিশ্বব্যাংক বলেছে ২০৩০ সালের মধ্যে বিশ্বের চরম দরিদ্র মানুষের সংখ্যা ৩ শতাংশে নামিয়ে আনা সম্ভব হবে। মূলত দৈনিক সোয়া ডলার (একশ’ টাকারও কম) কিম্বা এরও নিচে আয় করে এমন জনগোষ্ঠীর আয় বাড়ানোর মাধ্যমেই এ উন্নয়ন ঘটবে। প্রেসিডেন্ট জিম ইয়ং কিম এপ্রিলের মাঝামাঝি বিশ্বব্যাংক ও আইএমএফ-এর বসন্তকালীন বৈঠকে বলেছেন, বিশ্বব্যাপী দারিদ্র্যের হার যে হারে কমছে তাতে এক প্রজন্মের সময়কালেই বিশ্বব্যাপী দরিদ্র্যের হার ৩ শতাংশের নিচে নেমে আসবে। টেকসই উন্নয়নের মধ্যমে বিশ্বের নিম্ন আয়ের ৪০ শতাংশ মানুষের আয়ও বাড়বে। ১৯৮১ সালে বিশ্বের অর্ধেক জনগোষ্ঠীর আয় ছিলো এই সোয়া ডলারের নীচে। সেই হিসেবে ২০১২ সালে বিশ্বের মোট জনসংখ্যার এক চুতর্থাংশ এই গণ্ডি পেরিয়েছে। অর্থাত্ বর্তমান বিশ্বের পাঁচ ভাগের এক ভাগ জনগোষ্ঠীর দৈনিক আয় শোয়া ডলারের নিচে। মূলত: দরিদ্র পরিস্থিতির এমন উন্নতি দেখেই বিশ্বব্যাংকের হিসেবে ২০৩০ সালের মধ্যে চরম দরিদ্রাবস্থার ব্যাপক উন্নতি হবে বলে ধারণা করছে। কিন্তু বিশ্ব পরিস্থিতি উন্নয়ন কী সমভাবে হচ্ছে? বিশ্বব্যাংকের তথ্যানুযায়ী বর্তমান বিশ্বে এক বিলিয়ন বা একশ’ কোটি মানুষ প্রতিদিন রাতে না খেয়ে ঘুমোতে যায়। শোয়া ডলারের আয়ের হিসেবে ১৯৯০ সালে বিশ্বব্যাপী ১৯০ কোটি ৯০ লাখ জনগোষ্ঠী দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করতো। যা মোট বিশ্বের জনসংখ্যার ৪৩ দশমকি ১ শতাংশ। ২০০৮ সালে চরম দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করে ১২৮ কোটি ৯০ লাখ মানুষ যা মোট জনসংখ্যার ২২ দশমিক ৪ শতাংশ। দরিদ্র মানুষের সংখ্যা কমলেও জনসংখ্যা যে হারে বেড়েই চলেছে তাতে সুফল মিলছে অনেক কম। দারিদ্র্য হার কমছে কোন্ দেশে? বিশ্বব্যাংকের তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, গত দুই-তিন দশকে বৃহত্ জনসংখ্যার দেশ চীনে চরম দারিদ্র্য হার কমেছে ব্যাপক হারে। মূলত এই কারণেই দারিদ্র্যের হার কমার বিষয়টি দৃশ্যমান হয়েছে। কিন্তু বিশ্বের অন্য দেশগুলোর কী অবস্থা! আমরা যদি দারিদ্র্য পীড়িত দক্ষিণ এশিয়া এবং সাব সাহারান আফ্রিকার দেশগুলোর দিকে তাকাই তাহলে বেরিয়ে আসবে মূল চিত্র। চিত্রে দেখা যাচ্ছে জনসংখ্যা বেশি হওয়ার ফলে বিশ্বের অধিকাংশ দরিদ্র্র মানুষের বসবাস চীন, দক্ষিণ এশিয়া ও সাব-সাহারার আফ্রিকার দেশগুলোতে। মোট দরিদ্র মানুষের উল্লেখযোগ্য বসবাস চীন ও ভারতে। এটা নিঃসন্দেহে বলা যায়, গত দুই-তিন দশকে বিশ্বের দারিদ্র্য পরিস্থিতির উন্নতি হয়েছে। কিন্তু এ উন্নতির মূলে রয়েছে কারা? ১৯৮১ সালে বিশ্বের মোট দরিদ্র মানুষের ৪৩ শতাংশ বাস করতো চীনে। মূলত জনসংখ্যার আধিক্য তাদেরকে এই হারে নিয়ে গেছে। তবে এটাও ঠিক যে চীন গত তিন দশকে চরম দারিদ্র্যের হার নামিয়ে এনেছে মাত্র ১৩ শতাংশে। অর্থাত্ বিশ্বের দরিদ্র মানুষের তালিকা থেকে চীন তাদের অবস্থার ব্যাপক উন্নতি করেছে। অন্যদিকে দক্ষিণ এশিয়ার চিত্র সম্পূর্ণ উল্টো। ১৯৮১ সালে দক্ষিণ এশিয়ায় বিশ্বের চরম দরিদ্র মানুষের সংখ্যা ২৯ শতাংশ ছিলো। চীনের অবস্থার উন্নতি ঘটায় দক্ষিণ ২০১০ সালে বিশ্বের মোট দরিদ্র মানুষের ৪২ শতাংশ এখন দক্ষিণ এশিয়ায় বসবাস। একই চিত্র সাব সাহারার আফ্রিকার দেশগুলোর। ১৯৮১ সালে ১১ শতাংশ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করলেও ২০১০ সালে এ অঞ্চলে ৩১ শতাংশ চরম দরিদ্র মানুষের বসবাস। বিশ্লেষকরা বলছেন, চীনের দুই অংকের প্রবৃদ্ধি তাদের এই ব্যাপক দারিদ্র্য হ্রাসে মূল নিয়ামক হিসেবে কাজ করেছে। কিন্তু দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে বড় দেশ ভরত সে তুলনায় এগিয়ে যেতে পারেনি। ২০০০ সালে মাত্র ৪ শতাংশ এবং ২০১১ সালে ৬ দশমিক ৩ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে। অন্যদিকে ভারতের প্রবৃদ্ধি ২০১৪ সালে ৬ দশমকি ৪ শতাংশে পৌঁছতে পারে। দক্ষিণ এশিয়ার আরেক জনবহুল দেশ বাংলাদেশের ও বিনিয়োগ ও আয় বিগত কয়েক বছরের মধ্যে কমে যাচ্ছে। বিগত কয়েক বছরে গড়ে ৬ শতাংশের উপরে প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা গেলেও আগামী বছর প্রবৃদ্ধি ৬ শতাংশের নিচে নেমে আসবে। বিশ্বব্যাপী দরিদ্র মানুষের সংখ্যা হ্রাস করতে বিভিন্ন দেশ যখন এগিয়ে যাচ্ছে তখন দক্ষিণ এশিয়ার জনবহুল দেশগুলোর প্রস্তুতি নিতান্তই অপ্রতুল। অবশ্য সহস্রাব্দ লক্ষ্যমাত্রা (এমডিজি) অর্জনে বাংলাদেশ ভারতের তুলনায় অনেক ক্ষেত্রে এগিয়ে থাকলেও আয়বর্ধন মূলক কর্মসূচি গ্রহণ বিশেষ করে ব্যাপক কর্মসৃজনীতে উন্নয়নশীল দেশগুলো থেকে অনেক পিছিয়ে রয়েছে। লেখক :সাংবাদিক

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন