পঞ্চাশ ও ষাটের দশকে আমেরিকায় ‘আফ্রিকান-আমেরিকান সিভিল রাইট’ আন্দোলনের অন্যতম প্রতিবাদের ভাষা হয়ে উঠেছিল ‘উই শ্যাল ওভারকাম’ শিরোনামের গানটি। মিছিলে, মঞ্চে, উত্সবে প্রার্থনাসঙ্গীতের সুরে এই গান গেয়ে রীতিমতো তোলপাড় ফেলে দিয়েছিলেন পিট সিগার, জোয়ান বয়েসরা। কালক্রমে সেই গান পৃথিবীর সবচেয়ে বেশি ভাষায় গীত গানের একটিতে পরিণত হয়েছে। আমাদের বাংলা ভাষায়ও এর দু’ দু’টি সংস্করণ আছে!
বাংলায় গানটির সবচেয়ে জনপ্রিয় সংষ্করণ—আমরা করবো জয়।
এই ‘আমরা করবো জয়’ গানটাকে এখন আর সাধারণ একটা বাংলা গান বলা যায় না। বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের কল্যাণে এটা এখন ‘বিজয় সঙ্গীত’ হয়ে গেছে। টেস্ট, ওয়ানডে, টি-টোয়েন্টি; প্রতিটা জয়ের পর বাংলাদেশ দলের ড্রেসিংরুম কেঁপে ওঠে খেলোয়াড়দের কণ্ঠে এই গানের আওয়াজে। খেলোয়াড়-কোচ-কর্মকর্তা; সবাই গোল হয়ে পরস্পরের কাঁধে হাত রেখে গাইতে থাকেন—আমরা করব জয়।
এই প্রথম বাংলাদেশের ড্রেসিংরুম দীর্ঘকালের এই ‘বিজয়সঙ্গীত’কে দূরে সরিয়ে রাখল। সোমবার জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে চার বছর পর টেস্ট জয় পেল বাংলাদেশ, ১৮ টেস্ট অপেক্ষার অবসান ঘটল, কাছে এসে বারবার ফাঁকি দিতে থাকা জয়ের দেখা মিললো; তারপরও খেলোয়াড়রা উত্সবে মাতলেন না, বিজয়সঙ্গীত গাইলেন না!
অধিনায়ক মুশফিকুর রহিম সংবাদ সম্মেলনেই কারণটা ব্যাখ্যা করেছেন। কাল টেলিফোনে বাংলাদেশ দলের ম্যানেজার তানভীর হাসান সাদ বলছিলেন, ‘দেখুন, স্রেফ পেশাদারিত্বের কারণে খেলোয়াড়রা খেলছে। নতুবা দেশে যে ট্রাজেডি ঘটে গেছে, সাভারে যতো মানুষ মারা গেছেন; তাতে কারো আর আনন্দ-উচ্ছ্বাস করার মন নেই। এখন ছেলেরা খেলা শেষ করে দেশে ফিরে মানুষের পাশে দাঁড়াতে ব্যস্ত হয়ে পড়েছে।’ অধিনায়ক মুশফিক আগের দিন এই ব্যাপারেই বলছিলেন, ‘আমরা মাঠে তেমন উচ্ছ্বাস দেখাইনি, ড্রেসিংরুমে প্রথমবারের মতো ম্যাচ জিতেও গানটা গাইনি। আমরা জানি, এখানে বসে আমরা কিছুই করতে পারছি না। কিন্তু সবারই মন খারাপ। দেশে ফিরে হয়তো সবাই কিছু করার চেষ্টা করবো।’ এখানেই বাংলাদেশের ক্রিকেটাররা বারবার প্রমাণ করেণ—আগে তারা মানুষ! যে মানুষের বুকের মধ্যে দেশের মানুষের জন্য অফুরান ভালোবাসা। যে মানুষ আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মনে করে মানুষের পাশে দাঁড়ানোকে।
মানুষের পাশে ক্রিকেটাররা এসে দাঁড়াবেন। তার আগে বাধ্যবাধকতাই আছে আরো বেশ কিছুদিন জিম্বাবুয়েতে কাটিয়ে আসার। এখন জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে তিন ম্যাচ ওয়ানডে সিরিজ ও ২ ম্যাচ টি-টোয়েন্টি সিরিজ খেলে তবে ফিরতে হবে বাংলাদেশকে। ওয়ানডে সিরিজের একেবারে আর দেরী নেই; আগামী ৩ মে, শুক্রবার থেকেই বুলাওয়েতে শুরু হতে এই সিরিজ। বুলাওয়ের এই কুইন্স স্পোর্টস ক্লাব মাঠেই অনুষ্ঠিত হবে তিনটি ওয়ানডে। মে মাসেরই ১১ ও ১২ তারিখে টি-টোয়েন্টি ম্যাচ দুটোও এখানেই হবে। ফলে হারারেতে শুরু হওয়া সফরটা শেষই হচ্ছে বুলাওয়েতে। আর প্রায় পনেরো দিনের এই বুলাওয়ে সফরে আজ সকালে হারারে ছাড়ছে বাংলাদেশ দল। একেবারেই গাট্টি-বোচকা গুছিয়ে হারারে থেকে চলে যাবেন আজ সব ক্রিকেটার-কর্মকর্তা; শুধু থেকে যাবেন পেসার রুবেল হোসেন। জলবসন্তে আক্রান্ত রুবেলকে বাধ্য হয়েই এখানে রেখে যাচ্ছে টিম ম্যানেজমেন্ট। ম্যানেজার সাদ জানালেন, আগামী রবিবার নাগাদ একটু সুস্থ হয়ে উঠলে হয়তো ঢাকার উদ্দেশ্যে বিমান ধরবেন রুবেল। রুবেলের এই অসুস্থতা বাদ দিলে এখন জিম্বাবুয়েতে বাংলাদেশের যে স্কোয়াড আছে শারীরিক সুস্থতা ও আত্মবিশ্বাসের দিক থেকে অন্তত তারা খুব ভালো অবস্থায় আছে বলেই দাবি করছেন ম্যানেজার, ‘প্রথম টেস্টে হারের পর মূল সমস্যা হয়েছিল—আত্মবিশ্বাসটা ধসে গিয়েছিল। ছেলেদের মোটিভেটেড করতেই খুব সমস্যা হচ্ছিল। এখন খুব একটা হইচই না করলেও অন্তত চনচমনে ব্যাপারটা ফিরে এসেছে। ওয়ানডে সিরিজে এটা কাজে লাগবে।’
ওয়ানডে স্পেশালিস্ট হিসেবে যারা দলের সঙ্গে যোগ দিয়েছেন, সেই আব্দুর রাজ্জাক ও সামসুর রহমান শুভই গতকাল শুধু অনুশীলন করেছেন। বাকীরা জয়ের পর একটু ছুটি কাটিয়েছেন। আজও বুলাওয়েতে গিয়ে তেমন অনুশীলন হবে না হয়তো। তারপরও আগামীকাল থেকে আবার শুরু হবে ওয়ানডে উপলক্ষে ছোটা। আর চলতেই থাকবে দেশে ফেরার অপেক্ষা। সেই ফেরাটা কিছু সাফল্য হাতে হলে অন্তত কিছু সান্ত্বনার প্রলেপ হবে দেশের জন্য।
