মালোয়েশিয়ার সাধারণ নির্বাচনের ফলাফল লইয়া সমপ্রতি কিছু অস্থিরতা দেখা দিয়াছে। দেশটির রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে ইহা সহজদৃশ্য নহে। জাতিগতভাবে তাহাদের ভিতরে সামপ্রতিক বত্সরগুলিতে যে বিভক্তি দেখা দিয়াছে তাহার চরম রূপ দৃশ্যমান হইয়াছে গত ৫ মে’তে অনুষ্ঠিত সর্বশেষ জাতীয় নির্বাচনের পর। তবে এই বিভেদ-বিভাজনের ক্ষত দ্রুত মেরামত করিতে মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী নাজিব রাজাক নূতন করিয়া উদ্যোগী হইয়াছেন। তিনি গত বুধবার জাতীয় ঐকমত্যের ভিত্তিতে মন্ত্রিসভা গঠনের কথা জানাইয়াছেন। নূতন এই মন্ত্রিসভায় একজন নৃতাত্ত্বিক চীনা মালয়েশিয়ানকে মন্ত্রী ও আরেকজনকে উপমন্ত্রী করা হইয়াছে। বিভাজনরেখা বিদূরণ করিতে তিনি যে আন্তরিক ইহা তাহারই ইঙ্গিত বলিয়া বিবেচনা যাইতে পারে।
তবে এই নির্বাচনে প্রতারণার অভিযোগ আনিয়া ফলাফল প্রত্যাখ্যান করিয়াছেন বিরোধীদলীয় নেতা আনোয়ার ইব্রাহিম। মোট ২২২টি আসনের মধ্যে ৮৯টি আসনে জয়লাভ করিলেও নানা কারণে বিরোধী দল বলিতেছেন, নির্বাচনে ‘ইতিহাসের নিকৃষ্টতম কারচুপি’ হইয়াছে। ইহার প্রতিবাদে সরকার বিরোধী বিক্ষোভের ডাকও দিয়াছিলেন আনোয়ার ইব্রাহিম। তবে প্রশাসন হইতে এ জাতীয় বিক্ষোভকে নিষিদ্ধ করা হইয়াছে। অন্যদিকে গত সপ্তাহে প্রধানমন্ত্রী পদে শপথের পর জাতীয় ঐক্যের ডাক দিয়াছেন প্রধানমন্ত্রী নাজিব রাজাক। তাঁহার নেতৃত্বাধীন জোট ন্যাশনাল ফ্রন্ট (বিএন) এই নির্বাচনে ১৩৩টিতেই জয়লাভ করিয়াছেন সত্য, কিন্তু তাহা মোট আসনের দুই-তৃতীয়াংশ নহে। তথ্যটি এই কারণে গুরুত্বপূর্ণ যে, ১৯৫৭ সালে স্বাধীনতা অর্জনের পর হইতেই দ্য ইউনাইটেড মালয়স ন্যাশনাল অর্গানাইজেশন (ইউএমএনও) বিভিন্ন জোট সরকারের মাধ্যমে মালয়েশিয়ার নিরঙ্কুশ ক্ষমতা নিয়ন্ত্রণ করিয়া আসিতেছে। তবে ২০০৮ সালে এই ক্ষমতাসীন জোট প্রথমবারের মতো পার্লামেন্টে দুই-তৃতীয়াংশ আসন সংরক্ষণ করিতে ব্যর্থ হইয়াছিল। অর্থাত্ সামপ্রতিক সময়ে তাহাদের প্রতি জনসমর্থন একটু একটু করিয়া হ্রাস পাইতেছে। কৌতূহলোদ্দীপক কথা হইল, মালয়েশিয়ার কিংবদন্তী নেতা মাহাথির মোহাম্মদ স্বয়ং আনোয়ার ইব্রাহিমকে ইউএমএনও’র নেতৃত্বের উত্তরসূরি হিসাবে নির্বাচন করিয়াছিলেন। তবে ১৯৯৮ সালে আনোয়ার ইব্রাহিমকে সরকার থেকে বহিষ্কার করা হয়। তিনি কারাবরণও করেন। এর প্রভাবে মালয়েশিয়ার রাজনীতি সাংঘাতিকভাবে বিভক্ত হইয়া পড়ে। এই নেতার বিরুদ্ধে যৌন হয়রানি এবং সমকামের অভিযোগ ওঠে। তাহাছাড়া ১৯৯৩ থেকে ১৯৯৮ পর্যন্ত দেশের উপপ্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব পালনকালে দুর্নীতির দায়েও ১৯৯৯ সালে তাহার ছয় বত্সরের সাজা হইয়াছিল।
মালয়েশিয়ার সমৃদ্ধির ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, ইউএমএনও’র অধীনে বহু জাতির মালয়েশিয়া অর্থনৈতিকভাবে সফল এক দেশ হিসেবে সমুজ্জ্বল উদাহরণ সৃষ্টি করিয়াছে। এমন একটি সময় ছিল যখন মালয়েশিয়ার অর্থনৈতিক অবস্থান আমাদের চাইতে অধিক উন্নত ছিল না। ব্রিটিশদের হইতে মুক্তিলাভের পর আজ তাহারা চোখ ধাঁধানো উন্নতিসাধন করিয়াছে। তাহাদের অভূতপূর্ব অগ্রগতির নেপথ্যে চোখ রাখিলে আমরা দেখিতে পাই সেখানে রহিয়াছে গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা, অসামপ্রদায়িক সমাজনির্মাণ, আইন-শৃঙ্খলা ও রাষ্ট্রব্যবস্থাপনার সুশৃঙ্খলা। দেশটির প্রথম প্রধানমন্ত্রী টুংকু আবদুর রাজ্জাক থেকে ড. মাহাথির এবং রাজাকপুত্র নাজিবতুন আবদুর রাজাক—সকলেই সব মানুষের এই শন্তিপূর্ণ সহবাসের বিষয়টিতে সতর্ক ছিলেন। নাজিব রাজাকের একটি তাত্পর্যপূর্ণ শ্লোগানই রহিয়াছে—‘সাতু মালয়েশিয়া’। অর্থাত্—ওয়ান মালয়েশিয়া। ওয়ান মানে—সকলের এক দেশ তো বটেই, এক নম্বরও বটে। অর্থাত্, দেশটিকে সকলে মিলিয়া এক নম্বরে নিয়ে যাওয়ার এই আহ্বান অতি গুরুত্বপূর্ণ।
গত বত্সর বৈশ্বিক মন্দা সত্ত্বেও দেশটির অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অব্যাহত রহিয়াছে। তবে রাজাকের নানা সংস্কারমূলক পদক্ষেপকে দায়সারা বলিয়া চিহ্নিত করিয়াছে বিরোধী দল। সরকারের বিরুদ্ধে অসংখ্য দুর্নীতিরও অভিযোগ রহিয়াছে বিরোধী দলের। ইহাই গণতন্ত্রের সৌন্দর্য। অর্থাত্ সরকারের গঠনমূলক সমালোচনা এবং তাহার সহিত জনগণকে প্রতিনিয়ত সচেতন রাখা। সরকার ভুল করিলে তাহার মূল্য দিতে হয় নির্বাচনের সময়। অর্ধশতাব্দীর নিরঙ্কুশ ক্ষমতার এই জোট সরকার সর্বশেষ দুইটি জাতীয় নির্বাচনে মোট আসনের দুই-তৃতীয়াংশ অর্জনে ব্যর্থ হইয়াছে। জয় আসিলেও তাহাতে আত্মতৃপ্তির সুযোগ নাই। এই ফলাফল তাহাদের নিশ্চয়ই আরো সতর্ক ও জনবান্ধব করিবে। তবে সকল বাকবিতণ্ডার ভিতরেও মালয়েশিয়ায় গণতন্ত্রের সুস্থ ধারা অব্যাহত রহিয়াছে, তাহাই সর্বাধিক গুরুত্ববহ।

