সংসদ বর্জন—এটা আমাদের ট্র্যাডিশন। এ অপসংস্কৃতির সঙ্কট উত্তরণে কোন রাজনৈতিক দলই এগিয়ে আসছে না। না বিএনপি, না আওয়ামী লীগ। নবম সংসদে দীর্ঘ সময় ধরেই সংসদমুখী নয় বিএনপি। এর আগে সদস্যপদ টিকিয়ে রাখতে তারা সংসদে যোগদান করে আর ফিরে আসেনি। এবারও বিএনপি সদস্যপদ ঠেকাতে আগামী ১৮তম বাজেট অধিবেশনে সংসদে যাচ্ছে। এটাই এখন দেশে আলোচ্য বিষয়। বিএনপি রাজপথেই আন্দোলন করেছে বেশি। সংসদে যায়নি খুব একটা। পরিসংখ্যান মতে বলা যায়, বিএনপি এবার সংসদ বর্জনের রেকর্ড ভেদ করেছে। অবশ্য আওয়ামী লীগকে এ সংস্কৃতির প্রবর্তক বললে অত্যুক্তি হবে না। আমাদের রাজনৈতিক দলগুলোর সংসদ বর্জনের এই আচরণগত বৈশিষ্ট্যজনিত সংসদীয় রাজনীতির ললাটলিপি যদি তাই হয়, তাহলে এ জাতীয় পন্থায় সংসদীয় গণতন্ত্র বিকাশ কি আদৌ সম্ভব? আমরা (জনগণ) অনেক আশা নিয়ে স্ব-স্ব এলাকা থেকে একজন প্রতিনিধিকে ভোটের মাধ্যমে নির্বাচিত করে জাতীয় সংসদে পাঠাচ্ছি। গণতন্ত্রে জনগণের এটাই চরম প্রাপ্তি। কিন্তু কি দেখছি আমরা? আমাদের নির্বাচিত প্রতিনিধিদের সংসদে দেখছি না কেন? তারা কেন সংসদে গিয়ে কথা বলেন না? তারা কেন সংসদ বর্জন করেন? তা অনুচিত। দেশের জন্য এটা ফলদায়ক নয়। এ অপসংস্কৃতি কেন বন্ধ হচ্ছে না। তাহলে প্রশ্ন, এ দেশে সংসদ বর্জনের অপসংস্কৃতি কি চিরস্থায়ী হয়েই থাকবে? সংসদের বাইরে থেকে সংসদীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। সংসদ বর্জনের ব্যাপারে একটা বিহিত হওয়া উচিত। এ চর্চা সহসাই বন্ধ হওয়া দরকার। প্রয়োজনে আইন প্রণয়ন করে হলেও তা বন্ধ করা হোক। মহান সংসদে যারা আইন প্রণয়ন করবেন তারাই যদি সংসদে উপস্থিত না থাকেন, তা হলে দেশে আইনের সুশাসন প্রতিষ্ঠা হয় কি করে?
চলতি সংসদের চার বছরে মোট ৩৩৭ কার্যদিবসের মধ্যে বিএনপি উপস্থিত ছিল মাত্র ৫৪ দিন। অনুপস্থিত ছিল ২৮৩ কার্যদিবস। আর অষ্টম সংসদের পুরো মেয়াদে ৩৭৩ কার্যদিবসের মধ্যে তত্কালীন বিরোধী দল আওয়ামী লীগ অনুপস্থিত ছিল ২২৩ দিন, উপস্থিত ছিল ১৫০ দিন। সপ্তম সংসদে ৩৮২ দিনের মধ্যে ওই সময়ের বিরোধী দল বিএনপি অনুপস্থিত ছিল ১৬৩ দিন। পঞ্চম সংসদের ৪০০ কার্যদিবসে আওয়ামী লীগ বর্জন করে ১৩৫ কার্যদিবস। বিরোধীদলীয় নেতা হিসেবে সংসদে অনুপস্থিতির দিক থেকেও এগিয়ে আছেন খালেদা জিয়া। তিনি চার বছরে সংসদে উপস্থিত ছিলেন মাত্র আট কার্যদিবস। অষ্টম সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা শেখ হাসিনা উপস্থিত ছিলেন ৪৫ কার্যদিবস। সপ্তম সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা খালেদা জিয়া উপস্থিত ছিলেন ২৮ কার্যদিবস, আর পঞ্চম সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা শেখ হাসিনা উপস্থিত ছিলেন ১৩৫ কার্যদিবস। সংসদ বর্জন করলেও বেতন-ভাতাসহ অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা ঠিকমতোই নিয়েছেন বিএনপির সাংসদরা। এমনকি সংসদে না গিয়ে দৈনন্দিন যাতায়াত ভাতা পর্যন্ত তুলে নেয়া হয়েছে। অতীতে সংসদ বর্জন আওয়ামী লীগও করেছে। তবে সংসদ বর্জনের সর্বোচ্চ ইতিহাস সৃষ্টি করেছে প্রধান বিরোধী দল বিএনপি। ৪ বছরের ৩৩৭ কার্যদিবসে কেবল বিএনপির সাংসদরাই নন, সরকারের ১১ মন্ত্রী-প্রতিমন্ত্রী সংসদে গেছেন ২শ’ দিনেরও কম। নবম জাতীয় সংসদে মন্ত্রী ও সাংসদদের উপস্থিতি সন্তোষজনক নয়, যা কার্যদিবসের অর্ধেকেরও বেশি। এক পরিসংখানে দেখা গেছে, নবম সংসদে বিরোধীদলীয় নেতার সংসদে উপস্থিতি হচ্ছে মাত্র ২.৯ শতাংশ। অষ্টম সংসদে এই হার ছিল ১২ শতাংশ। সংসদ পরিচালনা করতে প্রতি মিনিট গড় ব্যয় ৪২০০০ টাকা। এই হিসাবে আর্থিক ক্ষতি চলতি সংসদের ৭ম অধিবেশন পর্যন্ত ১৮,৭১,১০,০০০ টাকা। এছাড়া কোরাম সংকটের জন্য কত সময় নষ্ট হয়েছে। দ্বিতীয় অধিবেশনের কোরাম সংকট ছিল ১৩ ঘণ্টা ১৪ মিনিট, তৃতীয় অধিবেশনের কোরাম সংকট ছিল ৭ ঘণ্টা ৪০ মিনিট, চতুর্থ অধিবেশনের কোরাম সংকট ছিল ২৫ ঘণ্টা ৫০ মিনিট, পঞ্চম অধিবেশনের কোরাম সংকট ছিল ১৭ ঘণ্টা ২৮ মিনিট, ষষ্ঠ অধিবেশনের কোরাম সংকট ছিল ৬ ঘণ্টা ৪৭ মিনিট, সপ্তম অধিবেশনের কোরাম সংকট ছিল ৩ ঘণ্টা ১৬ মিনিট। জনপ্রতিনিধিদের জবাবদিহিতা না থাকার কারণে সংসদ অধিবেশন কার্যকরী হচ্ছে না।
প্রশ্ন হলো, রাজপথ না কাঁপিয়ে সংসদ কাঁপানো যায় কি? সংসদ বর্জনের এ অপসংস্কৃতি থেকে নিজেদের বের করে আনতে পারেনি দেশের প্রধান রাজনৈতিক দল বিএনপি, এমনকি আওয়ামী লীগও। গণতন্ত্রের জন্য তা মোটেও শুভকর নয়। এর আগে ক্ষমতাশীন আওয়ামী লীগ ১৯৯১ সালে নির্বাচনে হেরে যাওয়ার পর বিরোধী দলে থেকে প্রায় ২ বছর সংসদ অধিবেশন বর্জন করে। এটি সংসদ বর্জনের সংস্কৃতিতে এ যাবত্ রের্কড ছিল। আর এ রেকর্ড বিএনপি ভাংলো। চলতি সংসদের চার বছরে মোট ৩৩৭ কার্যদিবসের মধ্যে বিএনপি উপস্থিত ছিল মাত্র ৫৪ দিন। এভাবে চলতে থাকলে গণতন্ত্রের জন্য কতটুকু সহায়ক হবে এ প্রশ্নই বোধ করি আমার মতো আমজনতারও। দেশের সাধারণ নাগরিক হিসেবে আমাদের জোর অনুরোধ থাকবে, যারা সরকারে ও বিরোধী দলে আছেন রাজনীতি ও গণতন্ত্র তাদের যদি মুখ্য হয়ে থাকে, তাহলে নিজেদের গোঁ (জেদ) ধরে রাখার অঙ্গীকার থেকে ফিরে এসে দয়া করে দেশ ও গণতন্ত্র রক্ষা করার অঙ্গীকার নিয়েই জোর কদমে এগিয়ে আসুন। এটা গণতন্ত্রের জন্য, দেশের জন্য, সর্বোপরি জনগণের জন্য খুবই প্রয়োজন।
আর বিলম্ব নয়। সংসদ বর্জনের এ অপসংস্কৃতি থেকে আমাদের সহসাই বেরিয়ে আসার পথ খুঁজতে হবে। পৃথিবীর অন্য কোনো দেশে আমাদের মতো সংসদ বর্জনের এরকম দৃষ্টান্ত নেই। এ অপসংস্কৃতির ধারা থেকে বেরিয়ে আসতে এর আগে সংসদ বর্জন বন্ধে আইন করার পরামর্শ দিয়েছে ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ টিআইবি। পাশাপাশি সংসদ অধিবেশনে টানা ৩০ দিন অনুপস্থিত থাকলে সদস্যপদ খারিজের বিধান করার প্রস্তাবও দিয়েছে তারা। আমরা আবারও আইন করে সংসদ বর্জন বন্ধ করার জোর সুপারিশ করছি। এছাড়া দলগতভাবে সংসদের অধিবেশনে যোগদান থেকে সর্বোচ্চ ৯০ দিন বিরত থাকার রীতির পরিবর্তে ৩০ দিন করার প্রস্তাব করছি। তবে কিছুতেই একাধারে ১৪ দিনের বেশি অনুপস্থিত থাকা যাবে না। সংসদ বর্জন—এটা গণতন্ত্রের বিধিবিধান নয়। দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার স্বার্থে, জনগণের স্বার্থে, উন্নয়নের স্বার্থে জাতীয় সংসদকে কার্যকর করতেই হবে। সংসদীয় গণতন্ত্রে এর কোনো বিকল্প নেই।
লেখক :সাংবাদিক
