আধুনিক বিজ্ঞান আমাদের কোথায় লইয়া যাইবে—তাহা সম্ভবত কল্পবিজ্ঞানেও পুরোপুরি অনুমান করা সম্ভব নহে। শত্রুপক্ষকে হত্যা করিতে রোবটের ব্যবহার খুব নূতন নহে। তবে এইবার রোবট হইয়া উঠিয়াছে স্বশাসিত। যুদ্ধক্ষেত্রে রোবট বা যন্ত্রমানবই সিদ্ধান্ত লইবে কাহাকে মারিবে আর কাহাকে দেবে নিস্তার। অর্থাত্, পূর্বে যোদ্ধারা তাহাদের প্রয়োজনে অস্ত্র ব্যবহার করিত, আর এখন অস্ত্রই যোদ্ধাতে পরিণত হইতে চলিতেছে এবং অস্ত্র নিজেই সিদ্ধান্ত লইতে যাইতেছে। এইভাবে অদূর ভবিষ্যতে যুদ্ধ হইয়া উঠিবে একপক্ষের যন্ত্রমানবের সঙ্গে অন্যপক্ষের যন্ত্রমানবের। কিন্তু অন্যপক্ষের উন্নত যন্ত্রমানব না থাকিলে সেই যুদ্ধ হইয়া উঠিবে একপেশে মানবহত্যা। এই সকল রোবট নূতন একটি অধ্যায়ের সূচনা করিতে যাইতেছে। অধিকতর ‘সূক্ষ্মভাবে’ খুন করিবার বিষয়ে পূর্বের প্রযুক্তি মানুষকে সক্ষম করিয়া তুলিয়াছে; কিন্তু যখন রোবটকে স্বশাসিত হিসাবে তৈরি করিয়া রণক্ষেত্রে ছাড়িয়া দেওয়া হয়, তখন আর যুদ্ধটা নিজে লড়া হয় না। যন্ত্র লড়ে।
প্রাচীনকাল হইতে মানুষ নিজের জীবনকে আরো সহজতর করিবার দুর্মর আকাঙ্ক্ষা ও প্রচেষ্টায় বিশেষ জ্ঞানে নিমগ্ন হইয়াছে। হাজার হাজার বত্সর ধরিয়া অধিকতর উত্কর্ষ সাধন করিতে করিতে আজকের বিজ্ঞান হইয়া উঠিয়াছে বিস্ময়ের আকর। একইসঙ্গে বিজ্ঞান হইয়াছে শক্তি ও ক্ষমতার প্রতিভূ। সুতরাং তাহা নিরঙ্কুশভাবে কেবল শান্তি-সুখ আনয়ন করে নাই, ধ্বংসের ঘ্রাণও ছড়াইছে এ বিশ্বের কোণে কোণে। সেই দুশ্চিন্তার ভাঁজ পৃথিবীর কপালেও পড়িয়াছে। পৃথিবীর পরিবেশের বিপন্নতা শুরু হইয়াছে বিজ্ঞানের হাত ধরিয়াই, শিল্পবিপ্লবের সেই তিন শতক পূর্ব হইতে। স্বাভাবিকভাবেই দুশ্চিন্তা এবং বিপন্নতায় আমরা সমাচ্ছন্ন হই, কারণ এই বিজ্ঞানেরই বিবিধ ক্ষমতার নীতিনির্ধারকেরা আবার বিজ্ঞানের দর্শন বোঝেন না। তাহারা বোঝেন ক্ষমতার দম্ভ, তাহা কুক্ষিগত করিতে যাহা যাহা করিবার দরকার, তাহারা তাহাই করেন।
সুতরাং স্বশাসিত হত্যাকারী যন্ত্রমানবের নৈতিকতা নিয়া প্রশ্ন তুলিয়া ইহার নীতিনির্ধারকরদের একটুখানি সতর্ক করা যাইতে পারে মাত্র। গত সপ্তায় জেনেভায় এই সকল হত্যাকারী রোবটের নৈতিকতা লইয়া প্রশ্ন তুলিয়াছে জাতিসংঘের মানবাধিকার কাউন্সিলও। কারণ, ইহারা কম্পিউটার প্রোগ্রামনির্ভর স্বয়ংক্রিয় যন্ত্রমানব। ইহাদের যেইরূপ নির্দেশনা দেওয়া হইবে, ইহারা সেইরূপ আচরণ করিবে, গুলিবর্ষণ করিবে, মানুষ হত্যা করিবে। তাহারা প্রতিপক্ষের যোদ্ধা কিংবা সাধারণ মানুষের মধ্যে তফাত্ করিতে পারিবে না। ফলে সাধারণ মানুষের উপর গুলি করিতেও দ্বিধা করিবে না তাহারা। জাতিসংঘের মানবাধিকার কাউন্সিল প্রশ্ন তুলিয়াছে, এই ক্ষেত্রে সাধারণ মানুষ হত্যার দায়দায়িত্ব কে লইবে? তাহাছাড়া যুদ্ধাপরাধের অভিযোগে কোনো রোবটের বিরুদ্ধে মামলা দায়েরও সম্ভব নহে।
আধুনিক পাইলট বিহীন বিমান (ড্রোন) আক্রমণও এক ধরনের রোবট হামলা। পাথর্ক্য শুধু দেখিতে তাহা মানবদেহের মতো নহে। এই ক্ষেত্রে বোতাম চাপিলেই রোবট উড়িয়া যায়, হত্যা করিয়া ফিরিয়া আসে। অন্যদিকে মানুষের আকারের এসব স্বশাসিত রোবট নিজের চারিপার্শ্বে ৩৬০ ডিগ্রি এলাকায় দেখিতে এবং লক্ষ্যবস্তু তাক করিয়া নিজের মেশিনগান হইতে গুলি ছুঁড়িতে পারিবে। স্বশাসিত এইসকল যন্ত্রমানবের পক্ষে যুক্তি দেওয়া হয়, ইহা স্বয়ংক্রিয় হওয়ায় যুদ্ধক্ষেত্রে সৈন্য ব্যবহার করা লাগিবে না। ফলে যুদ্ধ করিতে গিয়া যোদ্ধাদের মৃত্যুহারও হ্রাস পাইবে।
কিন্তু বাস্তবিকভাবে আমরা অধিক আশাবাদী হইতে পারি না। কারণ, সব প্রাযুক্তিক প্রোগ্রামিংয়ের মতোই রোবটের প্রোগ্রামেও নিয়মিতভাবে ভুল হইয়া থাকে। আজকের দুনিয়ায় সর্বাধিক রোবট ব্যবহূত হয় শিল্প-কারখানায়। এই ক্ষেত্রে শুধু যুক্তরাষ্ট্রেই প্রতিবত্সর প্রায় চার শতাংশ কারখানায় বড় ধরনের রোবট-সংশ্লিষ্ট দুর্ঘটনা ঘটিয়া থাকে। সুতরাং স্বশাসিত যন্ত্রমানব যে ফ্রাংকেনস্টাইন হইয়া উঠিবে না তাহার নিশ্চয়তা কোথায়?
পারমাণবিক বোমা তৈরিতে আলবার্ট আইনস্টাইন, রবার্ট ওপেনহেইমার ও আন্দ্রেই শাখারভসহ যে বিজ্ঞানীদের ভূমিকা অপরিহার্য ছিল তাহারা ইহার বিভীষিকার কথা ভাবিয়া নিজেদের সৃষ্টির বিরুদ্ধে দাঁড়াইয়াছিলেন। যন্ত্রমানবকে স্বশাসিত এবং হত্যাকারী যন্ত্রদানব হিসাবে উত্কর্ষসাধনের পূর্বে বিজ্ঞানের অপব্যবহারের ইতিহাস ও তত্সৃষ্ট বিপর্যয় হইতে শিক্ষা লইতে হইবে।
