প্রভারতের প্রবীণ কলামিস্ট কুলদীপ নায়ার তার সাম্প্রতিক এক কলামে আশা প্রকাশ করেছেন, পাকিস্তানে নওয়াজ শরিফের নেতৃত্বে একটি নির্বাচিত সরকার ক্ষমতায় আসায় গণতন্ত্রের জয় হলো এবং ভারতের সঙ্গে পাকিস্তানের সম্পর্ক উন্নত হবে। অন্যদিকে বয়সে অপেক্ষাকৃত তরুণ আরেক ভারতীয় কলামিস্ট বাংলাদেশ সম্পর্কে আশা প্রকাশ করেছেন যে, সাবেক সামরিক শাসক বর্তমানে জাতীয় পার্টির নেতা জেনারেল হোসেন মোহাম্মদ এরশাদ হয়তো বাংলাদেশের আগামী নির্বাচনে একটি তৃতীয় শক্তি হিসেবে আবির্ভূত হবেন এবং রাষ্ট্র ক্ষমতায় সরাসরি যেতে না পারলেও এই ক্ষমতায় কোন দল বসবেন, তা নির্ধারণে একটি নিয়ন্ত্রক শক্তি হবেন।
জেনারেল এরশাদকে নিয়ে বাজারে এই যে আশাবাদ, তাকে জাগ্রত করার জন্যই হয়তো তিনি সম্প্রতি দেশের রাজনীতিতে একটি তৃতীয় শক্তির জাগরণের জন্য নানা ধরনের তত্পরতায় লিপ্ত হয়েছেন। তিনি আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোটে থেকেও জোটের নীতি-আদর্শ এবং সরকারের নানা কার্যকলাপের সমালোচনা শুরু করেছেন। কিছুদিন আগে বর্তমান সরকার যখন হেফাজতিদের ভয়ানক হুমকির মুখে তখন তিনি ঢাকা অবরোধের জন্য আগত হেফাজতিদের মিছিলে সরবত, ডাবের পানি ইত্যাদি বিলিয়েছেন, তাদের সমর্থন দিয়েছেন। শাহবাগের গণজাগরণ মঞ্চকে তিনি প্রকাশ্যে সমালোচনা করেছেন।
এখন তিনি আবার একটি তৃতীয় শক্তি বা তৃতীয় জোট গঠনের জন্য নাকি আলাপ-আলোচনা শুরু করেছেন। যাদের সঙ্গে ইতিমধ্যেই আলোচনা করেছেন বলে খবরে প্রকাশ, তাদের মধ্যে আছেন কৃষক শ্রমিক জনতা লীগের কাদের সিদ্দিকি, জাসদের ভগ্নাংশের নেতা আ.স.ম রব এবং জেপি’র চেয়ারম্যান আনোয়ার হোসেন মঞ্জু। এদের মধ্যে একমাত্র জেপি নেতা আনোয়ার হোসেন মঞ্জু ছাড়া বাকি দু’জন বাংলাদেশের রাজনীতিতে এখন ‘মৃত সৈনিক’। আনোয়ার হোসেনও প্রস্তাবিত তৃতীয় জোটের এরশাদ সাহেবের নেতৃত্বের সমান ভাগিদার না হলে নাকি আসবেন না। এটা বাজারের গুজব। কতোটা সঠিক তা জানি না। আনোয়ার হোসেন মঞ্জু এরশাদ সাহেবের দলে ফিরে এলে জোট হোক আর না হোক জাতীয় পার্টিতে জোড়া লাগতো এবং দলটি শক্তিশালী হতো।
জেনারেল এরশাদের সম্পর্কে দেশে-বিদেশে আশা জাগ্রত হওয়ার কারণ, সাধারণত সামরিক শাসকেরা ক্ষমতা থেকে পতিত হলে কেউ কেউ হয়তো প্রাণে বেঁচে যান, কিন্তু রাজনীতি ও ক্ষমতায় আর ফিরে আসতে পারেন না। উদাহরণ, জেনারেল আইয়ুব এবং জেনারেল পিনোচেট। কিন্তু বাংলাদেশে জেনারেল এরশাদ দেশব্যাপী এরশাদ-হঠাও আন্দোলনের মুখে শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা হস্তান্তরের সুযোগ পেয়েছেন, জেলে ছ’বছর কাটানোর সময় সংসদে নিজে সদলে নির্বাচিত হয়ে নজির স্থাপন করেছেন। যে বিএনপি এবং তার নেত্রী বেগম জিয়া এক সময় এরশাদ সাহেবের বিচার ও কঠোর শাস্তি দাবি করেছেন, পরে তারই সঙ্গে রাজনৈতিক জোট গঠন করেছিলেন। এখন তিনি আওয়ামী জোটে আছেন। এই জোট সরকারে তার ছোট ভাই জিএম কাদের একজন মন্ত্রী। সামরিক শাসক হিসেবে পতনের পরেও তিনি বিস্ময়করভাবে রাজনীতিতে এবং একটি রাজনৈতিক দলের নেতৃত্বে টিকে আছেন। সংসদেও তার দলের সদস্যসংখ্যা একেবারে ফেলনা নয়।
সন্দেহ নেই, জেনারেল এরশাদ বাংলাদেশের রাজনীতিতে একজন সারভাইভালিস্ট। যে দেশের রাজনীতিতে ড. কামাল হোসেন, ডা. বদরুদ্দোজা চৌধুরী, কাদের সিদ্দিকী প্রমুখ তার চাইতে অনেক চতুর ও চৌকস রাজনীতিক হয়েও সারভাইভ করতে পারছেন না, নির্বাচনে দলসহ তাদের অনেকের জামানত বাজেয়াপ্ত হয়, সেখানে সংসদে একাধিক আসনে তার বার বার জয়ী হওয়া, দলের এক উল্লেখযোগ্য সংখ্যক নির্বাচন প্রার্থীকে জয়ী করে আনা কম কৃতিত্ব নয়। ২০০৮ সালের নির্বাচনে তার দল সংসদে আর তিন-চারটি আসন বেশি পেলে হয়তো বিএনপি’র বদলে প্রধান বিরোধী দল হতো।
রাজনীতিতে টিকে থাকার সাফল্যই জেনারেল এরশাদ সম্পর্কে দেশে-বিদেশে কোনো কোনো মহলে আগ্রহের সৃষ্টি করেছে। ভারতীয় কলামিস্ট কুলদীপ নায়ার যেমন আশা করেছেন, নওয়াজ শরিফ পাকিস্তানে ক্ষমতায় আশায় ভারত-পাকিস্তান সম্পর্কে উন্নতি হতে পারে, তেমনি দিল্লির ক্ষমতাসীন মহলের কোনো কোনো অংশের ধারণা, বাংলাদেশে আগামী সাধারণ নির্বাচনটি যদি হয় এবং আওয়ামী লীগের বদলে যদি বিএনপি ক্ষমতায় আসে, তাহলে তাদের খুশি হওয়ার কিছু নেই। রাষ্ট্রপতি প্রণব মুখার্জির ঢাকা সফরের সময় তার সঙ্গে খালেদা জিয়ার ব্যবহারেই সেটা তারা বুঝে ফেলেছেন।
এজন্যই দিল্লির ক্ষমতাসীন মহলের একটি প্রভাবশালী অংশের আশা, মন্দের ভালো হিসেবে বিএনপি’র বদলে যদি এরশাদ সাহেব বাংলাদেশের রাষ্ট্র ক্ষমতায় প্রভাব বিস্তার করতে পারেন, তাহলে দিল্লির সঙ্গে ঢাকার সম্পর্কের উন্নতি না ঘটুক, অবনতি ঘটবে না। অতীতে তিনি বাংলাদেশের রাষ্ট্র ক্ষমতায় থাকাকালে ভারতের প্রধানমন্ত্রী রাজীব গান্ধী এবং পাকিস্তানের ফৌজি শাসক জেনারেল জিয়াউল হকের সঙ্গে সম্পর্কের ভারসাম্য রক্ষায় চমত্কার কুশলী খেলা খেলেছেন। উড়ির চরের প্রলয়ঙ্করী ঝড়ের পর তার এই খেলাটি যখন ধরা পড়ে যায়, তখন তার পতনের পর্বের সূচনা হয়।
এরশাদ সাহেবের রাজনীতি সম্পর্কে দিল্লির শাসক জোটের মধ্যে এখনো একটা আশাবাদ আছে। তার ফলেই কিছুদিন আগে ভারত সরকার তাকে দিল্লিতে আমন্ত্রণ জানিয়ে রাজকীয় সংবর্ধনা দিয়েছিলো। ওয়াশিংটনে এবং সউদি রাজধানী রিয়াদেও ক্ষমতাসীন মহলে জেনারেল এরশাদের পক্ষে একটি শক্তিশালী সমর্থক গ্রুপ আছে। তার ব্যক্তিগত জীবন এবং রাজনীতিতে সেক্যুলার জোটে থাকা সত্ত্বেও পবিত্র ইসলাম সম্পর্কে তার বকধার্মিকতা এবং জামায়াত এবং হেফাজতিদের মধ্যযুগীয় দাবি-দাওয়ার প্রতি সমর্থন সউদি বাদশাহদের মনে তার প্রতি তেমন বিরূপ মনোভাব তৈরি হতে দেয়নি। প্রথম গাল্ফ যুদ্ধের সময় প্রেসিডেন্ট এরশাদের দ্বৈত ভূমিকা পেন্টাগনে যে সন্দেহ সৃষ্টি করেছিল, যা তার পতন ত্বরান্বিত করেছে, সেটা এখন নেই। কিন্তু ‘ইসলামিক জঙ্গিবাদ’ দমনে এরশাদ সাহেব কতোটা সহায়ক হবেন, এ সম্পর্কে ওবামা-প্রশাসনে বেশ সন্দেহ রয়েছে বলে ওয়াশিংটন সূত্র থেকে জানতে পেরেছি।
এতোসব সত্ত্বেও সাবেক প্রেসিডেন্ট দেশের রাজনীতিতে তৃতীয় শক্তি জোট গড়ে তুলতে পারবেন অথবা আগামী সাধারণ নির্বাচন যথাসময়ে যথানিয়মে অনুষ্ঠিত হলে তিনি বা তার দল আগের চাইতে সাফল্য দেখাতে পারবেন, কিংবা পাওয়ার ব্রোকারও হতে পারবেন তা আমার মনে হয় না। তিনি রাজনীতিতে সারভাইভ করেছেন, কিন্তু সাকসেস অর্জন করতে পারেননি। কারণ, তার বহুরূপী রাজনৈতিক চরিত্র। তিনি আজ যা বলেন, কাল নিজেই তার প্রতিবাদ করেন। তার পাশে ডান ও বাম রাজনীতির কিছু দক্ষ নেতা ছিলেন। তিনি তাদের সঙ্গে রেখে একটি মডারেট ডেমোক্রাটিক পার্টি হিসেবে বিলেতের লিবারেল ডেমোক্রাটদের মতো একটি দল গঠন করতে পারতেন। এই বিশ্বময় জোট অথবা কোয়ালিশন সরকারের যুগে বাংলাদেশে বড় দল দু’টিকে তিনি ক্ষমতায় যাওয়ার জন্য তার দলের সমর্থনের উপর নির্ভরশীল করে তুলতে পারতেন।
সাবেক রাষ্ট্রপতির সবচাইতে বড় অসাফল্য এই যে, তিনি সংসদে প্রথম দল হওয়া দূরের কথা, নির্বাচনগুলোতে দ্বিতীয় দলও হতে পারেননি। বরং তার পাশ থেকে মিজানুর রহমান চৌধুরী, মওদুদ আহমদ, আনোয়ার হোসেন মঞ্জু এবং আরও অনেক দক্ষ রাজনৈতিক সহকর্মী সরে গেছেন। তিনি কাউকে ধরে রাখতে পারেননি। এখনো তৃতীয় জোট গঠনের জন্য কাদের সিদ্দিকি বা আ.স.ম রবের মতো রাজনৈতিক এতিমদের সঙ্গে তার বৈঠক করা তার নেতৃত্বের দেউলিয়া দশার প্রমাণ দেয়। রাজনীতিতে তার অবস্থান কোথায়, ডানে, বামে, না মাঝখানে, তাও কেউ নিশ্চিতভাবে বলতে পারবেন না। তার অস্থির মানসিকতা এবং বহুরূপী চরিত্র ধরা পড়ে গেছে ৫ মে হেফাজতি অভ্যুত্থান-আশঙ্কায় চরম ক্রাইসিসের সময়। তিনি হেফাজত এবং তাদের ১৩ দফা মধ্যযুগীয় দাবিকে সমর্থন দিয়ে বসেছেন। অথচ দাবি করেন, তিনি একজন মডারেট ডেমোক্রাটিক নেতা। তার দলের লক্ষ্য আধুনিক গণতন্ত্র, মধ্যযুগের ধর্মতন্ত্র নয়।
আমাকে এক রাজনৈতিক নেতা, যিনি এক সময় তার দলে ছিলেন, বলেছেন, তার মধ্যে পাকিস্তানের সাবেক এক প্রেসিডেন্ট জেনারেল জিয়াউল হকের ধর্ম নিয়ে নিষ্ঠুর ব্যবসায়ের এবং সাবেক প্রেসিডেন্ট জেনারেল পারভেজ মোশাররফের রাজনৈতিক শঠতার মিশ্রণ দেখা যায়। ব্যক্তিগত পরিচয়ে তিনি সদালাপী এবং অমায়িক ভদ্রলোক। কিন্তু তার শত্রু বা মিত্র কেউ তাকে বিশ্বাস করে না। রাজনীতিতে তার সব গুণ ও সাফল্য সম্পূর্ণভাবে ঢাকা পড়ে গেছে ক্রেডিবিলিটি বা বিশ্বাসযোগ্যতার অভাবে। জিয়াপুত্র তারেক রহমান তার অত্যন্ত বিতর্কিত ও নিন্দিত অতীত সত্ত্বেও বাংলাদেশের রাজনীতিতে আবার একটি ফ্যাক্টর হয়ে উঠতে পারেন, কিন্তু জেনারেল এরশাদ তা হতে পারবেন না।
আমার নিজের বিশ্লেষণ, আগামী সাধারণ নির্বাচন যদি যথাসময়ে এবং অবাধ ও নিরপেক্ষভাবে অনুষ্ঠিত হয়, তাহলে এই নির্বাচনই তার ভাগ্য চূড়ান্তভাবে নির্ধারণ করবে। গত কয়েক মাসে তার রাজনৈতিক ভূমিকা, পরস্পর বিরোধী কথাবার্তা রাজনৈতিক নেতা হিসেবে তার ক্রেডিবিলিটি সম্পূর্ণ ধ্বংস করেছে। তবু তিনি তার দল নিয়ে যদি মহাজোটে থাকেন, সংসদে তার দলীয় সংখ্যাশক্তি কিছুটা বাড়তে পারে; কিন্তু তিনি যদি দেশের রাজনীতির ‘মৃত সৈনিকদের’ নিয়ে তৃতীয় জোট গঠন করেন এবং নির্বাচনে আলাদাভাবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন, তাহলে আমি জানি না, তিনি এই শেষ বয়সের শেষ ভরাডুবি কি করে এড়াবেন?
\ লন্ডন ১ জুন, শনিবার, ২০১৩ \
