যেকোন দেশে বা সমাজে জনসংখ্যা যদি সঠিকভাবে ব্যবহার করা যায়, তবেই তা সম্পদ। কিন্তু যখন তা সঠিকভাবে ব্যবহার অসম্ভব হয়, তখনই বোঝা বা অভিশাপে পরিণত হয়। বাংলাদেশের প্রাণকেন্দ্র রাজধানী ঢাকার যে আয়তন, তাতে মাত্র ৩০/৩২ লাখ লোক বসবাস করতে পারে। অথচ এই নগরীতে জনসংখ্যা তার পাঁচ গুণেরও বেশি। তার মানে প্রায় দেড় কোটির বেশি মানুষের বসতি এখন রাজধানী ঢাকায়। এই বিপুলসংখ্যক মানুষের চাপে ঢাকার স্বাভাবিক জীবনযাত্রা মারাত্মকভাবে ব্যাহত। একদিকে গ্যাস, বিদ্যুত্, পানির অভাব, অন্যদিকে প্রচণ্ড যানজটে মহামূল্যবান হাজার হাজার ঘন্টার শ্রম সময় নষ্ট হচ্ছে। বাড়ছে মানুষের দুর্ভোগ। যানবাহনের তুলনায় জনসংখ্যা এত বেশি যে, প্রয়োজনীয় যানবাহনের অভাবে প্রতিদিন রাজপথে কর্মজীবী নারী/পুরুষদের দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে।
এছাড়া রাজধানী ঢাকার যারা স্থায়ী বাসিন্দা তাদের বিদ্যুত্, পানি ও গ্যাসের সংকট যত, তার চেয়ে কোনো অংশে কম নয় জলাবদ্ধতা বা পয়ঃনিষ্কাশন ব্যবস্থার অভাবে। সামান্য বৃষ্টি হলেই রাস্তা ডুবে যায়। বিশেষ করে বর্ষা মওসুমে দুর্গতির শেষ নেই। অথচ পয়ঃনিষ্কানের জন্য ঢাকায় দুই সিটি কর্পোরেশন ও ওয়াসা যে ভূমিকা পালন করার কথা, তা ঠিকমতো তারাও পালন করতে পারছে না।
সবচেয়ে বড় কথা হলো, ঢাকার পরিবেশ দূষণ এখন মারাত্মক পর্যায়ে গেছে যা পরিবেশ অধিদপ্তর শুধু নয়, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়সহ শীর্ষ পর্যায় থেকে ব্যবস্থা গ্রহণ করা উচিত। যেভোবে অপরিকল্পিত নগর ক্রমশ চারদিকে ছড়াচ্ছে, বিল্ডিং কোড অমান্য করে যেমন খুশি ভবন নির্মাণ করছে, তাতে রানা প্লাজা ট্রাজেডির মতো হাজার হাজার মানুষের প্রাণ কেড়ে নেয়া দুর্ঘটনা যে আরো ঘটবে না একথা কেউ নিশ্চিত করে বলতে পারবে না। অপরিকল্পিত নগর-বন্দরকে পরিকল্পনার মধ্যে আনা এখনো সম্ভব, যদি আইন মানতে সবাইকে বাধ্য করা যায়, এজন্য প্রয়োজন আইন সবার জন্য সমানভাবে প্রয়োগ করার নিশ্চয়তা।
আরো একটি বড় বিপদ এই রাজধানীবাসীর জন্য অপেক্ষা করছে। তা হলো জনসংখ্যার চাপ কমিয়ে যদি অন্যান্য সমস্যাগুলোর হ্রাস করা না যায়, তাহলে ভূমিকম্পের মতো যেকোনো দুর্ঘটনার বা দুর্যোগ নেমে এলে উদ্ধার করা সম্ভব হবে না। র্যাংগস ভবন ভাঙার পর আমরা দেখেছি মাত্র কয়েকজন মানুষকে উদ্ধার করতেও আমরা কত অক্ষম। ভবন ধস বা ভূমিকম্পের মতো বড় ঘটনা ঘটলে এই রাজধানী নগরী একদিন নির্মমভাবেই একটি পরিত্যক্ত নগরীতে পরিণত হবে। সুতারং এখনও সময় আছে। কোটি মানুষের জীবন বাঁচাতে ঢাকার পরিবেশ উন্নত করার দীর্ঘ মেয়াদী, মধ্য মেয়াদী ও স্বল্প মেয়াদী পরিকল্পনা নেয়া হোক। গাছপালা লাগিয়ে নগরীর তাপমাত্রা কমানো সম্ভব। দেশের অন্যান্য বড় শহরে ঢাকার মতো সুযোগ-সুবিধা তৈরি করে ঢাকার জনসংখ্যার চাপ কমানো সম্ভব।
তবে সব কথার শেষ কথা হচ্ছে, ঢাকা নিয়ে সরকারের শীর্ষ মহল থেকে ভাবনা জরুরি এখন। যদি জনসংখ্যার চাপ কমিয়ে পরিবেশের উন্নয়ন ঘটানো যায়, তাহলে ঢাকাকে এখনো বসবাসযোগ্য করে তোলা সম্ভব।
লেখক: ফ্রিল্যান্স সাংবাদিক
Email:[email protected]
