প্রধানমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগ সভানেত্রী শেখ হাসিনা বিরোধী দলের নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি আবারো নাকচ করে দিয়ে বলেছেন, খাল কেটে কুমির (তত্ত্বাবধায়ক সরকার) আনতে দেয়া হবে না। বাংলাদেশের গণতন্ত্র নিয়ে আর খেলা চলবে না। বিশ্বের যেসব দেশে সংসদীয় গণতন্ত্র আছে সেসব দেশে যেভাবে নির্বাচন হয় বাংলাদেশেও আগামী নির্বাচন সংবিধান অনুযায়ী সেভাবেই হবে। আসন্ন চার সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে বিএনপি সমর্থিত প্রার্থীরা অংশ নেয়ায় বিরোধী দলীয় নেত্রী খালেদা জিয়াকে ধন্যবাদ জানিয়ে তিনি বলেন, আশা করি, আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচনেও বিএনপি অংশ নেবে।
গতকাল শনিবার সকালে গণভবনে ফরিদপুর জেলা আওয়ামী লীগের তৃণমূল নেতৃবৃন্দের সঙ্গে মতবিনিময় সভায় সূচনা বক্তব্যে প্রধানমন্ত্রী এসব কথা বলেন। শেখ হাসিনা বলেন, জনগণের ভোটের অধিকার ও গণতন্ত্র রক্ষায় বর্তমান সরকার বিশ্বাসী। আওয়ামী লীগ ভোট চুরির নীতিতে বিশ্বাস করে না, ভবিষ্যতেও করবে না। ভোট দেয়ার মালিক জনগণ উল্লেখ করে তিনি বলেন, আওয়ামী লীগ সর্বদা জনগণের রায় নিয়ে ক্ষমতায় যেতে চায়, ভোট কারচুপি অথবা জনগণের ভোটাধিকার হরণ করে নয়। জনগণ আমাদের পক্ষে তাদের রায় দিলেই কেবল আমরা ক্ষমতায় থাকবো, অন্যথায় নয়। জনগণের ভোটের মালিকানা যাতে সম্পূর্ণ নিশ্চিত হয়, সে লক্ষ্যেই আমরা কাজ করছি।
তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা চালু করাকে খাল কেটে কুমির আনার সঙ্গে তুলনা করে প্রধানমন্ত্রী আরো বলেন, তাদের সামর্থ্য ও প্রজ্ঞা সম্পর্কে জনগণের অভিজ্ঞতা রয়েছে। বিগত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ও তাদের প্রবক্তারা ২০০৭ থেকে ২০০৮ সাল পর্যন্ত জনগণের ভাগ্য নিয়ে অনেক খেলেছেন। সে সময় একজন সংবিধান বিশেষজ্ঞ আন্তর্জাতিক খ্যাতিসম্পন্ন আইনজীবীসহ অনেক হোমড়াচোমড়াই পরামর্শ দিয়েছিলেন পরবর্তী নির্বাচিত সরকার না আসা পর্যন্ত অর্থাত্ রোজ কেয়ামত পর্যন্ত তত্ত্বাবধায়ক সরকার ক্ষমতায় থাকতে পারবে। এখন যারা ‘সংবিধানে এই আছে, ওই আছে’ বলে গলা ফাটাচ্ছেন, পত্রিকার পাতায় লিখে লিখে তোলপাড় করছেন, তাদের বলবো ২০০৭-২০০৮ সালের পত্রিকার পাতা খুলে দেখুন, কারা এ পরামর্শ দিয়েছিলেন? সংবিধান বিশেষজ্ঞ দেশবরেণ্য আইনজীবী ও সুশীল বাবুরাই তো দিয়েছিলেন।
নির্বাচনকে অবাধ ও সুষ্ঠু করার বিষয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয়েছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, প্রয়াত রাষ্ট্রপতি জিল্লুর রহমান সবার পরামর্শে প্রথমবারের মত সার্চ কমিটি গঠনের মাধ্যমে নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ দিয়েছেন। সেখানে বিএনপিও রাষ্ট্রপতির আমন্ত্রণে আলোচনায় যোগ দিয়ে পরামর্শ দিয়েছেন। এ প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ সরকারের নিয়ন্ত্রণের বাইরে ছিল। তিনি বলেন, দায়িত্ব পালনে ইসিকে পূর্ণ আর্থিক স্বাধীনতা দেয়া হয়েছে। এছাড়া নির্বাচন চলাকালে আইন প্রয়োগকারী সংস্থা ও প্রশাসন কমিশনের সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে থাকছে। এ কারণে বর্তমান সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত প্রায় সাড়ে ৫ হাজারের অধিক নির্বাচনের সবগুলোই অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষ হয়েছে উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, গত সাড়ে চার বছর মেয়াদকালে বর্তমান সরকার কোন নির্বাচনেই হস্তক্ষেপ করেনি যা অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষভাবে সকল নির্বাচন অনুষ্ঠানে সহায়ক হয়েছে। কোন প্রার্থীই এমনকি বিএনপিও এসব নির্বাচনের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলতে পারেনি।
প্রধানমন্ত্রী বর্তমান সরকারের চার বছরের উন্নয়নের বিবরণ তুলে ধরে এগুলো জনগণের মধ্যে প্রচারের জন্য দলীয় নেতা-কর্মীদের প্রতি আহ্বান জানান। একই সঙ্গে দলকে শক্তিশালী করতে দ্রুত সদস্য সংগ্রহ অভিযান ও তৃণমূল সম্মেলনসহ সাংগঠনিক কার্যক্রম জোরদারের আহ্বান জানান।
প্রধানমন্ত্রীর সূচনা বক্তব্যের পর তার সভাপতিত্বে নেতৃবৃন্দের সঙ্গে রুদ্ধদ্বার বৈঠক শুরু হয়। এতে দলের ফরিদপুর জেলার সাংগঠনিক রিপোর্ট তুলে ধরেন জেলা আওয়ামী লীগের সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ মাসুদ হোসেন। এ সময় জেলার সভাপতি কাজী জায়নুল আবেদীনসহ জেলা-উপজেলা আওয়ামী লীগ ও মহিলা আওয়ামী লীগ নেতৃবৃন্দ বক্তব্য রাখেন। আওয়ামী লীগের ঢাকা বিভাগের দায়িত্বপ্রাপ্ত কেন্দ্রীয় সাংগঠনিক সম্পাদক আহমদ হোসেন সভা পরিচালনা করেন।
মতবিনিময় সভায় কেন্দ্রীয় নেতাদের মধ্যে সংসদ উপনেতা সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী, আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য শেখ ফজলুল করিম সেলিম, প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার খন্দকার মোশাররফ হোসেন, আওয়ামী লীগের উপদেষ্টামণ্ডলীর সদস্য অধ্যাপক ড. আলাউদ্দিন আহমেদ, যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক মাহবুব-উল-আলম হানিফ, সাংগঠনিক সম্পাদক আফম বাহাউদ্দিন নাছিম, বিএম মোজাম্মেল হক, উপ-দপ্তর সম্পাদক মৃণাল কান্তি দাস, কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য একেএম এনামুল হক শামীম, আব্দুস সোবহান গোলাপ প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।
সূত্র জানায়, ফরিদপুর জেলা আওয়ামী লীগের সিনিয়র যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ মাসুদ হোসেনকে জেলার ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদকের দায়িত্ব দিয়েছেন দলীয় সভানেত্রী শেখ হাসিনা। এ সময় প্রধানমন্ত্রী সকলে ঐক্যবদ্ধ থেকে একযোগে কাজ করে আগামী নির্বাচনের জন্য দলকে প্রস্তুত করার নির্দেশ দেন। উল্লেখ্য, ফরিদপুর জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক হাসিবুল হাসান লাবলুর মৃত্যুর পর থেকে এই পদটি শূন্য ছিল। সভায় তৃণমূল নেতৃবৃন্দ বক্তব্য রাখলেও ফরিদপুর জেলার অধিবাসী কেন্দ্রীয় দুই নেতা আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য সৈয়দা সাজেদা চৌধুরী এবং প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রী ইঞ্জিনিয়ার খন্দকার মোশাররফ হোসেন বক্তব্য রাখেননি।
