চলতি হিসাবের উদ্বৃত্ত :সুসংবাদ না দুঃসংবাদ

আপডেট : ০২ জুন ২০১৩, ২০:৪৮
চলতি অর্থ বত্সরের প্রথম নয় মাসে, অর্থাত্ জুলাই হইতে মার্চ পর্যন্ত, দেশের চলতি হিসাবের ভারসাম্যে বড় ধরনের উদ্বৃত্ত দেখা দিয়াছে। এই উদ্বৃত্তের পরিমাণ দাঁড়াইয়াছে দুইশত বিরাশি কোটি পঞ্চাশ লক্ষ ডলার। আগের অর্থ বত্সরের একই সময়ে চলতি হিসাবে বারো কোটি ডলারের ঘাটতি ছিল। আলোচ্য সময়ে বাণিজ্য ঘাটতি গত অর্থ বত্সরের প্রথম নয় মাসের তুলনায় কমিয়া গিয়াছে। চলতি অর্থ বত্সরের পণ্য বাণিজ্যের ঘাটতি দাঁড়াইয়াছে চারশত ছিয়াশি কোটি ত্রিশ লক্ষ ডলার। আর গত অর্থ বত্সরে এই সময়ে ঘাটতির পরিমাণ ছিল ছয়শত পঁচাত্তর কোটি ত্রিশ লক্ষ ডলার। বাংলাদেশ ব্যাংকের হালনাগাদ পরিসংখ্যান হইতে এইসব তথ্য পাওয়া গিয়াছে। এইসব তথ্য হইতে বোঝা যায় যে, লেনদেনের ভারসাম্যের পরিস্থিতি যথেষ্ট অনুকূলে রহিয়াছে। কিন্তু পাশাপাশি এই ভারসাম্য ও উদ্বৃত্ত, দেশে বিনিয়োগ এবং অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের যে শ¬্লথগতি তাহার কথাও বলিতেছে। আমরা যখন দেখিতে পাইতেছি যে, বাণিজ্য ঘাটতি কমিয়া গিয়াছে, তাহার মানে আমাদের রপ্তানি যে গতিতে বাড়িতেছে তাহার সাথে পাল¬্লা দিয়া আমাদের আমদানি বাড়িতেছে না। অনেকটা সময় ধরিয়া আমাদের আমদানির প্রবৃদ্ধি ঋণাত্মক ছিল। মনে রাখিতে হইবে যে, আমাদের আমদানির প্রায় চারভাগের তিনভাগ হইল মূলধনী যন্ত্রপাতি (ক্যাপিটাল মেশিনারি) এবং কাঁচামাল (ইন্টারমিডিয়েট গুডস)। অর্থাত্, আমাদের যে দ্রব্য এবং সেবাসামগ্রী, তাহার উত্পাদনের সাথে জড়িত যে উপকরণ বাহির হইতে আনিতে হয় সে উপকরণ এবং মূলধনী যন্ত্রপাতির জন্য আমাদেরকে আমদানির ৭৫ ভাগ খরচ করিতে হয়। তাহার মানে আমদানি যখন কমিয়া গিয়াছে, আমাদের মূলধনী যন্ত্রপাতি এবং কাঁচামাল সেগুলির আমদানিও কমিয়া গিয়াছে। সেগুলির আমদানি কমিয়া যাওয়া কিন্তু প্রকারান্তরে উত্পাদন এবং বিনিয়োগ শ¬্লথ হইয়া যাওয়ার কথাই বলিতেছে—যাহা আমাদের অর্থনীতির জন্য দুঃসংবাদ । আজকে আমরা যে দেখিতে পাইতেছি আমাদের বিনিয়োগের প্রবৃদ্ধি ধীরে ধীরে কমিয়া যাইতেছে, আমাদের কর আয়ের যে প্রবৃদ্ধি প্রত্যাশিত ছিল তাহা অর্জিত হইতেছে না - এগুলির প্রত্যেকটাই কিন্তু প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে আমাদের অর্থনৈতিক যে প্রবৃদ্ধি তাহার সাথে সংশি¬্লষ্ট। ফলে আজকে চলতি হিসাবের যে অনুকূল অবস্থা আমরা দেখিতেছি, তাহা কিন্তু অর্থনীতির জন্য প্রতিকূল অবস্থার কথাই বলিতেছে। সেদিক হইতে চিন্তা করিলে, আমাদেরকে একটুখানি অর্থনীতির প্রেক্ষাপট হইতে ভাবিতে হইবে। কী কারণে আমাদের মূলধনী যন্ত্রপাতি ও কাঁচামালের আমদানি কমিয়া যাইতেছে তাহা নিয়া ভাবিতে হইবে। ভাবিয়া দেখিতে হইবে মূল্যস্ফীতি কমাইতে গিয়া আমরা মুদ্রানীতির যে সংকোচনের পথে হাঁটিতেছি তাহা অতিমাত্রায় সংকোচন করা হইয়াছিলো কি না। সেই কারণ খুঁজিয়া বাহির করিয়া আমাদেরকে যথাযথ পদক্ষেপ নিতে হইবে। তাহা না হইলে অর্থনীতিকে ৬-৭ শতাংশের প্রবৃদ্ধি হইতে ৮ শতাংশের প্রবৃদ্ধির দিকে আগাইয়া নিয়া মধ্য আয়ের দেশে পরিণত করার যে লক্ষ্য আমরা স্থির করিয়াছি সেখান হইতে হয়তো আমরা বিচ্যুত হইয়া পড়িব। মোট কথা, অর্থনীতির গতি-প্রকৃতির ভালমন্দ দুই দিক মাথায় রাখিয়া, কোনটা দুঃসংবাদ আর কোনটা সুসংবাদ তাহা বুঝিয়া নিয়া প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করিতে হইবে।