একটি আত্মমর্যাদাশীল জাতি হিসাবে বাঁচার তাগিদে বাঙালি ১৯৭১ সনে অস্ত্র হাতে তুলে নিয়েছিল। বঙ্গবন্ধুর রাজনৈতিক নেতৃত্বে সেদিন লাখো বাঙালির মুখে মুখে উচ্চারিত হয়েছিল, ‘বীর বাঙালি অস্ত্র ধরো, পূর্ব বাংলা স্বাধীন করো’। মুক্তিযোদ্ধারা নয়টি মাস জীবন বাজী রেখে যুদ্ধ করে ১৯৭১ সনের ১৬ ডিসেম্বর বিজয় ছিনিয়ে এনেছিলেন। অতঃপর রাজনৈতিক নেতৃত্বের হাতে সে বিজয় ধরে রাখার দায়িত্ব দেয়া হয়েছিল। কিন্তু দুঃখের বিষয়, পরবর্তী সময়ের কোন রাজনৈতিক দল বা সরকারই যথাযথভাবে তাদের দায়িত্ব পালন করতে পারেননি।
প্রাক স্বাধীনতাকালে যে রাজনৈতিক দল বা নেতৃবৃন্দ স্বাধীনতার প্রশ্নে এক এবং অভিন্ন ছিলেন পরবর্তীকালে তারাই একে-অপরের বিরুদ্ধে উঠেপড়ে লেগে গেলেন। মাত্র আড়াই বছরের মাথায় বঙ্গবন্ধুকে নিষ্ঠুরভাবে সপরিবারে হত্যা করা হলো। আর বঙ্গবন্ধু হত্যার পর যিনি বা যারাই ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হলেন তারাই ক্ষমতা কুক্ষিগত করে নতুন রাজনৈতিক দল গঠনের মাধ্যমে তা দীর্ঘায়িত করতে চাইলেন। যার সর্বশেষ সংস্করণ লে. জে. হু. ম. এরশাদের জাতীয় পার্টি। এসব দল গঠন করতে তারা দেশে যত প্রকার ধান্ধাবাজ নেতা-কর্মী আছেন তাদেরসহ অনেক চোর-গুন্ডা, বদমায়েশকে পর্যন্ত রাজনৈতিক নেতা বানিয়ে ফেললেন। ফলে রাজনীতি চোর-গুন্ডা বদমায়েশের একটি ভাগাড়ে পরিণত হয়ে গেল। কে কাকে টেক্কা দিয়ে কত খারাপ লোক রাজনীতিতে ঢুকাতে পারেন রীতিমত তার একটা প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে গেল। অনেক রাজনৈতিক নেতা-কর্মী কেনা-বেচার মাধ্যমে দলবদল শুরু করলেন। এভাবে দল ভাঙার রাজনীতিও শুরু হয়ে গেল। এ অবস্থায় সুস্থ মানসিকতার মানুষের পক্ষে রাজনৈতিক অঙ্গনে পা রাখা সম্ভব হলো না। এসব প্রতিযোগিতায় স্বাধীনতার নেতৃত্বদানকারী আওয়ামী লীগও বাদ পড়লো না। প্রতিযোগিতায় ঢোকার জন্য তাদের দলেও কিছু খারাপ লোক ঢুকে পড়লো। সেসাথে শুরু হয়ে গেল এক অভূতপূর্ব রাজনৈতিক কাইজা। কলহপ্রিয় রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ মাঠে-ময়দানে বক্তৃতার নামে এমন সব কথাবার্তা চালাচালি শুরু করলেন যে তা আর শালীনতার মধ্যে রাইলো না। বেতার-টেলিভিশন পত্রিকা ইত্যাদির মাধ্যমে তাদের আকথা, কুকথা দেশের ঘরে ঘরে পৌঁছে গেল এবং সম্পূর্ণ দেশটি বিবদমান শিবিরে বিভক্ত হয়ে গেল। স্থূল কথাবার্তায় একদলের লোক তাদের নেত্রীকে ফেরেশতা বলেন তো অন্যদলের নেত্রীকে শয়তান বা তার চাইতেও খারাপ বিশেষণে বিশেষিত করেন। গ্রাম-গঞ্জের চা দোকান হতে শুরু করে হাট-বাজার বন্দরসহ অফিস-আদালতে এসব পাল্টাপাল্টি কথায় দিনে দিনে কলহ বাড়তেই থাকলো। ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, প্রফেসর হতে শুরু করে এমন কোন পেশার লোক নেই যে, তারা সংগঠন করে এক একটি রাজনৈতিক দলের লেজুড়বৃত্তি শুরু করে অনুরূপ ফেরেশতা-শয়তানের খেলায় যোগ দিলেন না। শেষমেশ অবস্থা এখন এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, সেখান হতে ফেরা অসম্ভবের পর্যায়ে চলে গিয়েছে। আর সে সাথে দেশের সাধারণ মানুষের ত্রাহি মধুসূদন অবস্থা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সাধারণ মানুষের গায়ে, যানবাহনে, চলাচলের রাস্তায় রেললাইনে, ব্যাংকে অফিসে, ফুটপাতের দোকান, বাড়ি-ঘরসহ সবখানে আগুন লাগিয়ে দেয়া হচ্ছে। কেউ আর স্বাধীনভাবে চলাফেরা, উঠাবসা, ব্যবসা-বাণিজ্য, স্কুল-কলেজ, অফিস-আদালত করতে পারছেন না। দুই দলের নেত্রীর ঝগড়া-ফ্যাসাদের শিকার দেশের সাধারণ মানুষের এই অবস্থার মধ্যে মাতব্বরী করতে আমেরিকা হতে ছুটে আসছেন মিনিস্টার, সেক্রেটারি, আন্ডার সেক্রেটারি, জাতিসংঘের দূত এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের কর্তাব্যক্তিরা আবার দুই নেত্রীর দূত বা প্রতিনিধিরাও দেশে-বিদেশে তাদের কাছে ধর্ণা দিয়ে নালিশ জানাচ্ছেন। আর ঐসব বিদেশিরাও দুই নেত্রীকে হতাশ করছেন না। মাতব্বরী ফলাতে তারাও মাঝে-মধ্যেই সালিশ করতে বসে যাচ্ছেন। স্বাধীনতার ৪২ বছর পরও এসব দেখে-শুনে তাই মনে প্রশ্ন হচ্ছে আমরা স্বাধীন তো?
লেখক : মুক্তিযোদ্ধা, কলামিস্ট
