যাত্রাবাড়ি সড়কে অন্তহীন জনদুর্ভোগ

আপডেট : ০৪ জুন ২০১৩, ২১:০৩
যাত্রাবাড়ি সড়কটি কোনো সাধারণ সড়ক নহে। ইহাকে রাজধানী ঢাকার সর্বাপেক্ষা গুরুত্বপূর্ণ প্রবেশদ্বারও বলা যাইতে পারে। বন্দরনগরী চট্টগ্রামের সাথে শুধু নয়, সমগ্র চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগসহ দক্ষিণ বঙ্গের সাথে রাজধানীর যোগাযোগের প্রধানতম মাধ্যম হইল এই সড়ক। অত্যাবশ্যক আমদানি-রফতানি পণ্য পরিবহন ছাড়াও লক্ষ লক্ষ মানুষ নিয়মিত এই সড়কটি ব্যবহার করিয়া থাকেন। অথচ সেই সড়কটির অবস্থা এতোটাই বেহাল হইয়া পড়িয়াছে যে, এইবার খোদ সরকারের পক্ষ হইতেই বলা হইয়াছে যে, সড়কটি চলাচলের অনুপযোগী হইয়া পড়িয়াছে। ফলে প্রতিনিয়ত যানবাহন দুর্ঘটনায় পড়িতেছে। দুর্ভোগ পোহাইতে হইতেছে জনগণকে। ইতিমধ্যে স্থানীয় সরকার বিভাগ লিখিতভাবে সতর্ক করিয়া দিয়াছে ঢাকা দক্ষিণ সিটি কর্পোরেশনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদেরকে। বলা হইয়াছে যে, অবিলম্বে যাত্রাবাড়ি অঞ্চলের সড়কসমূহ মেরামত করা না হইলে তাহাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হইবে। যাত্রাবাড়ি সড়কের বেহাল অবস্থা লইয়া ভুক্তভোগী জনগণ শুধু নহে, স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীও যে অসন্তুষ্ট স্থানীয় সরকার প্রতিমন্ত্রী জাহাঙ্গীর কবির নানক তাহা অকপটেই স্বীকার করিয়াছেন। যোগাযোগ মন্ত্রীর উপর্যুপরি উদ্বেগ প্রকাশের সংবাদও গণমাধ্যমে প্রচারিত হইয়াছে। কিন্তু যেই বিষয়টি আমরা বুঝিতে অক্ষম তাহা হইল, রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গের এতো উদ্বেগ-উত্কণ্ঠা সত্ত্বেও সড়কটির এই দুরবস্থা কেন? কেন যাত্রীসাধারণকে অবর্ণনীয় দুর্ভোগ পোহাইতে হইতেছে প্রতিদিন? এই পথে চলাচলকারী লক্ষ লক্ষ নাগরিকের প্রতি সংশ্লিষ্ট কর্তাব্যক্তিদের সত্যিকারের দরদ ও দায়িত্ববোধ থাকিলে যে এমনটি ঘটিতে পারিত না—তাহাও বলার অপেক্ষা রাখে না। যাত্রাবাড়ি সড়ক ও সংলগ্ন সড়কসমূহের অবস্থা যে হঠাত্ করিয়া বেহাল হইয়া পড়িয়াছে তাহাও নহে। মূলত মেয়র মোহাম্মদ হানিফ (গুলিস্তান-যাত্রাবাড়ি) উড়াল সড়কের কাজ শুরু হইবার পর হইতেই এই দুঃসহ অবস্থা চলিয়া আসিতেছে। একদিকে বিদ্যমান সড়কসমূহের বেহাল দশা, অন্যদিকে যানবাহন চলাচলের জন্য বিকল্প কোনো সড়কের ব্যবস্থা না থাকায় প্রতিদিন ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজটে অবরুদ্ধ হইয়া থাকিতে হইয়াছে কর্মব্যস্ত মানুষকে। প্রদত্ত কার্যাদেশ বা চুক্তির অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসাবে রাস্তায় বড়ো ধরনের নির্মাণ কাজ চলাকালে সংশ্লিষ্ট সড়ককে যানবাহন চলাচলের উপযোগী রাখিবার দায়িত্ব সাধারণত নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠানই পালন করিয়া থাকে। সদ্যসমাপ্ত মিরপুর-বনানী ফ্লাইওভারের ক্ষেত্রেও তাহাই হইয়াছে। ফলে অতি ব্যস্ত এই সড়কে জনগণকে কোনো দুর্ভোগ পোহাইতে হয় নাই। কিন্তু যাত্রাবাড়ির ক্ষেত্রে কেন ব্যতিক্রম হইল তাহা আমাদের বোধগম্য নহে। কারণ প্রথমাবধি সংলগ্ন সড়কসমূহ যানবাহন চলাচলের উপযোগী রাখার ব্যাপারে নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠানের তেমন একটা ভূমিকা পরিলক্ষিত হয় নাই। এই ব্যাপারে ভুক্তভোগী জনগণের অভিজ্ঞতা খুবই ভয়াবহ। দীর্ঘ ভোগান্তির পর এখন সড়ক মেরামত লইয়া স্থানীয় সরকার বিভাগ ও সিটি কর্পোরেশনের মধ্যে চিঠি চালাচালি চলিতেছে। দেখানো হইতেছে নানা অজুহাতও। গত বত্সরের ডিসেম্বরে ক্ষতিগ্রস্ত সড়কসমূহ সংস্কারের দায়িত্ব দেওয়া হইয়াছিল সেনাবাহিনীকে। ইহাতে সেনাবাহিনীরও আপত্তি ছিল না। কিন্তু অর্থাভাবে সেই কাজ হয় নাই। জানা যায়, ইহার পর ১৫ কোটি টাকা ব্যয়ে জয়কালী মন্দির হইতে যাত্রাবাড়ি পর্যন্ত এবং ডেমরা ও কাঁচপুর প্রান্তে আরও এক কিলোমিটার রাস্তা মেরামত করা হইয়াছিল কয়েক মাস আগে। সামান্য বৃষ্টিতেই সেই রাস্তার অবস্থাও খারাপ হইয়া গিয়াছে। সঙ্গত কারণেই জনগণের এতোগুলি টাকা জলে গেল কিনা সেই প্রশ্ন উঠিতে পারে। ইহার জুতসই উত্তরও আছে। তন্মধ্যে সেবা সংস্থাগুলির নিয়ন্ত্রণহীন খোঁড়াখুঁড়ির অভিযোগই প্রধান। রাস্তার বেহাল দশার জন্য যে এই খোঁড়াখুঁড়িই অনেকাংশে দায়ী তাহা অস্বীকার করা যাইবে না। ইতিমধ্যে জনদুর্ভোগ চরমে পৌঁছিয়াছে। মারাত্মকভাবে ব্যাহত হইতেছে জরুরি পণ্য পরিবহনসহ গুরুত্বপূর্ণ সড়ক যোগাযোগ। বৃদ্ধি পাইতেছে দুর্ঘটনার ঝুঁকি। কোনো অজুহাতেই নীতিনির্ধারকদের নাকের ডগায় রাজধানীর প্রবেশদ্বারে দিনের পর দিন এই বিড়ম্বনা মানিয়া লওয়া যায় না। আমরা অনতিবিলম্বে যাত্রাবাড়ি সড়ক ও সংলগ্ন সড়কসমূহকে যানবাহন চলাচলের উপযোগী দেখিতে চাই। কে করিবেন, কিভাবে করিবেন—তাহা আমাদের বিবেচ্য বিষয় নহে।

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন