বাজেট :প্রত্যাশা ও প্রাপ্তি

আপডেট : ০৪ জুন ২০১৩, ২১:২০
একটি দেশের জন্য বাত্সরিক বাজেট খুবই গুরুত্বপূর্ণ। ব্যবস্থাপনার সর্বশেষ সংযোজন “করপোরেট ম্যানেজমেন্ট” যেখানে মালিকের সাথে সরাসরি সম্পর্ক থাকে না সংগঠন ব্যবস্থাপনার। করপোরেট ম্যানেজমেন্টের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তর হচ্ছে বাত্সরিক বাজেট। আমাদের দেশে এর প্রচলন আছে কিন্তু তার সুফল জনগণ পায় কি না তা নিয়ে মতভেদ আছে। একদল দাবী করেন শতভাগ সুফলের, কিন্তু অন্যরা বলেন তা ব্যর্থ। অন্যান্য দেশের মত আমাদের দেশের মানুষের কাছেও তা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। দেশের আপামর মানুষের আলোচনা-সমালোচনা দেখলেই তা বোঝা যায় বা তার প্রমাণ মিলে। ভবিষ্যত্ নিয়ে দেশের মানুষ যে চিন্তিত তারও বহিঃপ্রকাশ ঘটে। দিন দিন এর মাত্রা বৃদ্ধি পাচ্ছে। যেনতেনভাবে সরকার এই দায়িত্ব শেষ করতে পারবে না, দেশে গণতন্ত্র কার্যকরী থাক বা না থাক। সমাজের সুশীল শ্রেণি অনেক সজাগ। দেশের মঙ্গলের মাধ্যমে প্রমাণ করতে হবে সাফল্য। সফলতার যাত্রা শুরু হয় পরিকল্পনা দিয়ে। বাত্সরিক বাজেট তার প্রথম ধাপ। বাজেটের মাধ্যমে দেশের মানুষ আশা করে তাদের সমস্যার সমাধানের যাত্রা শুরু হবে। এদেশের মানুষের প্রধান সমস্যা অপূর্ণ শিক্ষা, চিকিত্সা এবং খাদ্য। বাসস্থানের সমস্যাও কম নয়। বাংলাদেশের সংবিধানের সূত্র মতে জনগণ দাবী করতে পারে এসবের। দেশের সার্বিক প্রয়োজনের সাথে তাল মিলিয়ে বাত্সরিক বাজেট প্রণয়ন করতে হয়। সরকার তার জনসম্পৃক্ততা প্রমাণের জন্য বাজেট প্রণয়নের পূর্বে সংশ্লিষ্ট সকলের মতামত নেয়ার বা বোঝার চেষ্টা করেন। যা মাঝে-মধ্যে নাটকের মত মনে হয়। আমাদের সমস্যা যেহেতু বহুবিধ সে কারণেই দাবীর মাত্রাও অত্যাধিক মাত্রায় দেখা যায়। প্রয়োজনের অতিরিক্ত দাবীও মাঝে মধ্যে গণমাধ্যমে চলে আসে। সবচেয়ে বেশি দাবী আসে সাবসিডির জন্য। সাবসিডির প্রয়োজন আছে আমাদের মত উন্নয়নশীল অর্থনীতিতে, তবে আমার মতে সাবসিডি কোন সময় দীর্ঘস্থায়ী সমাধান দিতে পারে না। পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় এবং অর্থ মন্ত্রণালয় যদি এক সূতায় গাঁথা না যায় তাহলে সুফল আসে না, সমাজের মানুষের জীবনে শান্তি আসে না। বাংলাদেশের সমস্যা বহুবিধ। দেশ চলছে গণতান্ত্রিক পদ্ধতিতে নির্বাচিত সরকারের অধীনে এবং ফ্রি মার্কেট কনসেপ্টে। যদিও বাস্তবতা ভিন্ন। বিশ্ব সম্প্রদায়ের সমস্যা বিধায় বাংলাদেশকে নিজের ইচ্ছার বিরুদ্ধে হলেও কিছু কাজ করতে হয় বা কিছু সিদ্ধান্ত নিতে হয় অন্য দেশের সাথে তাল মিলিয়ে। সুতরাং বাংলাদেশের অর্থনীতি সম্পূর্ণ বাংলাদেশ সরকারের নিয়ন্ত্রণে আছে তা বলা যাবে না। অবশ্য আইনত দায় দায়িত্ব সম্পূর্ণ সরকারের। বাংলাদেশ সরকারের একটি বড় দায়িত্ব দেশের দারিদ্র্য দূরীকরণ। আন্তর্জাতিকভাবেও সরকারের উপর চাপ রয়েছে দেশের দারিদ্র্য বিমোচনের। সরকার রাজনৈতিকভাবে প্রচার করে যাচ্ছে অনেক কিছু করছে। সুফল হল এখনও দেশের এক-তৃতীয়াংশ মানুষের খাদ্য ক্রয়ের ক্ষমতা নেই, দেশের প্রায় অর্ধেক জনগোষ্ঠী অশিক্ষিত। ১৬ কোটি মানুষের দেশে মাধ্যমিক পরীক্ষায় প্রতি বছর অংশ নিচ্ছে মাত্র ১৫-১৬ লাখ ছেলে-মেয়ে আর দেশের শ্রম বাজারে প্রবেশ করছে প্রায় ২৫ লাখ। শিক্ষামন্ত্রী অবশ্য দাবী করছেন দেশের শিক্ষার হার বৃদ্ধি পাচ্ছে। সরকার শিক্ষার ক্ষেত্রে তেমন গুরুত্ব দিচ্ছে বলে মনে হয় না। বাত্সরিক বাজেটে শিক্ষা খাতে বরাদ্দ প্রয়োজনের তুলনায় যথেষ্ট কম। দারিদ্য বিমোচনের জন্য সরকারের আরও অনেক কাজ রয়েছে যা বাজেটে সামাজিক খাতে বরাদ্দ থাকে। দেশের জনসংখ্যাকে অশিক্ষীত রেখে দারিদ্র দূর করা যাবে একমাত্র একটি উপায়ে, যদি এ অশিক্ষিত জনগোষ্ঠীর সকল দায়িত্ব সরকার গ্রহণ করে। আমাদের যে ট্যাক্স-জিডিপি অনুপাত তা দিয়ে কি কোনদিন আশা করা যায় নাকি আশা করা উচিত? যে শিক্ষা উপকরণ আছে তা অবশ্যই যথেষ্ট নয়। তারপরেও যা আছে তাও যদি বাজেট, টাকা বা ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার জন্য যথাযথ ব্যবহার না হয় বা ব্যবহার না করা যায় তার মাশুল কে দিবে? আমাদের এক দৈনিক ইংরেজি পত্রিকার সাম্প্রতিক প্রকাশিত সংবাদ “প্রতি তিনটি সরকারি মাধ্যমিক স্কুলের মধ্যে দুটি স্কুলের হেড মাস্টারের পদ খালি”। আমাদের দেশে মোট ৩১৭টি সরকারি মাধ্যমিক স্কুল রয়েছে তার মধ্যে ২১৪টি স্কুলের হেড মাস্টারের পদ খালি। আমার জানা এবং বিশ্বাস মতে সরকারি স্কুলে তুলনামূলকভাবে একটু ভাল মানের শিক্ষা দেয়া হয়। এসব গুরুত্বপূর্ণ পদে নিয়োগ কেন বন্ধ আমার জানা নেই। যদিও এই সরকারের ক্ষমতায় আসার অঙ্গীকারের অন্যতম ছিল সরকারি পদে নিয়োগ বাড়ানোর। সরকারের হিসাবে দেশে বর্তমানে প্রাথমিক শিক্ষায় অন্তর্ভুক্ত আছে ১ কোটি ৯৩ লাখ ছেলে-মেয়ে। সরকারের উচিত এই সংখ্যা মাথায় রেখে পরবর্তী পরিকল্পনা গ্রহণ করা। বাত্সরিক বাজেট বরাদ্দ সে অনুপাতে রাখা। বেশীদিন দূরে নয় যখন ষষ্ঠ শ্রেণিতে ভর্তি হবে প্রায় ৪০ লাখ ছেলে-মেয়ে অর্থাত্ আরও কিছুদিন পর মাধ্যমিক পরীক্ষাগুলোতে অংশ নিবে এই পরিমাণ অর্থাত্ প্রায় ৪০ লাখ। আমার অনুরোধ সরকার যেন এসব নাগরিকের মৌলিক চাহিদার কথা মাথায় রাখেন। সরকারের পরিকল্পনায় তার প্রতিফলন থাকতে হবে। অর্থনীতির ভাষায় যাকে ইনফ্রাস্ট্রাকচার বলা হয়। জাহাজ থেকে মালামাল উঠা-নামার জন্য প্রয়োজন ঘাট। জাহাজ ভিড়ানোর আগে ঘাট প্রস্তুত থাকতে হবে। ৪০ হাজার টাকা খরচ করেও আমি আমাদের যুব সম্প্রদায়কে শ্রমিকের চাকরি নিয়ে বিদেশ গমন সমর্থন করি না কারণ এসব যুবকদের বিদেশে চাকরি জীবনে না থাকে পারিবারিক জীবন, না থাকে কোন ভবিষ্যত্। এভাবে আমাদের ৮০ লাখ যুবকের ভবিষ্যত্ চলতে দেয়া যায় না। বাজেট আলোচনায় অর্থমন্ত্রী মহোদয় অনেক ইস্যু নিয়ে কথা বলে থাকেন। আমি আশা করবো মাননীয় অর্থমন্ত্রী মহোদয়ের মাধ্যমে সমাজবিজ্ঞানীরা এ গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুটি নিয়ে চিন্তা করবেন। জনগণের সুস্বাস্থ্য নিশ্চিত করার মৌলিক দায়িত্ব সরকারের। সরকার দাবী করেন সব সরকারি মেডিক্যাল সেন্টারে বা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে সব পদে ডাক্তার নিয়োগ দেয়া আছে। আমরা তা বিশ্বাস করতে চাই ডাক্তারের উপস্থিতি দেখে বা সেবা পেয়ে। বাত্সরিক বাজেটে তার প্রতিফলন থাকা উচিত। দেশের পল্লী এলাকার জনগণের একটি বড় অংশ খাদ্য সংকটে ভোগে। তাদের সন্তানদের জন্য যা অসহনীয়। সরকারের পরিকল্পনা আছে এবং কিছু কিছু পদক্ষেপও আছে। আমি পল্লী এলাকার শিক্ষা ব্যবস্থার সাথে প্রত্যক্ষভাবে জড়িত দীর্ঘকাল থেকে। আমার অভিজ্ঞতা ভিন্ন। আমি ব্যক্তিগতভাবে দুটি প্রাইমারী স্কুলে সপ্তাহে একদিন দুপুরের খাবার সরবরাহ করে থাকি কিছুদিন যাবত্। সুফল আসছে ঐ দুটি স্কুলে। একটি স্কুল থেকে গত প্রাথমিক সমাপনী পরীক্ষায় ছয়জন জিপিএ ৫ পেয়ে ষষ্ঠ শ্রেণিতে উত্তীর্ণ হয়েছে। তাদের জন্য পরবর্তী মানসম্পন্ন শিক্ষা নিশ্চিত করা উচিত। আমার দাবী প্রাইমারী পর্যায়ে লেখাপড়ার মান এবং সার্বিক পরিবেশ বৃদ্ধিসহ শিক্ষা খাতের সার্বিক উন্নয়নের জন্য বাজেট বরাদ্দ বৃদ্ধি করার। কারণ বর্তমানের শিক্ষক সংখ্যা যথেষ্ট নয়, স্কুল ভবন পর্যাপ্ত নয়, শিক্ষা উপকরণও বাড়াতে হবে। সবকিছুর জন্য প্রয়োজন পর্যাপ্ত বাজেট। সমাজের বিভিন্ন অংশ থেকে অনেক দাবী আসছে। গার্মেন্টস খাতে ৭০ লাখ মানুষ শ্রম দিচ্ছে যাদের অধিকাংশ সরকারের কাছে দাবী রাখে কিছু পাওয়ার, কারণ তাদের শ্রমের বিনিময়ে মহামূল্যবান বৈদেশিক মূদ্রা আসছে। আমাদের বৈদেশিক মূদ্রার বড় বেশি প্রয়োজন কেননা মাঝে-মধ্যে আমাদেরকে আমদানীকৃত কাঁচা মরিচের উপরও নির্ভর করতে হয়। আদা বহু আগেই আমদানীকৃত পণ্যের তালিকায় ঢুকে গিয়েছে। বর্তমানে আদার ব্যাপারিদেরও জাহাজের খবর রাখতে হয়। আমাদের সমাজে বেশ কতক ব্যক্তি আছেন যাদের জন্য সব্জি, খাওয়ার পানি আমদানী করতে হয়। ফাইভ স্টার হোটেলের কথা আলাদা। সব কিছুর জন্য চাই উন্নয়ন নির্ভর বাজেট। মনে রাখতে হবে সমাজের সবার মঙ্গল। সরকারের হাতে সবকিছু নেই। দেশের সকল মানুষের দায়িত্বও সরকার নিতে পারবে না। আবার সকলকে আসামিও করা যাবে না। সাপও মারতে হবে এবং লাঠিও ভাঙ্গতে দেয়া যাবে না। লেখক :অর্থনীতি বিশ্লেষক ও এফসিএ [email protected]

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন