প্রধানমন্ত্রীর সাহসী অবস্থান

আপডেট : ০৫ জুন ২০১৩, ২১:৩৫
আগামী দশম জাতীয় নির্বাচন লইয়া অনিশ্চয়তার ধূম্রজাল হইতে নিদেনপক্ষে একটি বিষয়ের ধূম্র অপসারিত হইয়াছে। তাহা হইয়াছে প্রধানমন্ত্রীর একটি উক্তি হইতে। তিনি বলিয়াছেন, পৃথিবীর গণতান্ত্রিক দেশে যেইভাবে নির্বাচন হইয়া থাকে, বাংলাদেশও সেই পথেই হাঁটিবে। অর্থাত্ নির্বাচন প্রশ্নে সংলাপ হইবে কি হইবে না, তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ব্যবস্থার মোড়কে নির্বাচন পরিচালনা করিবে কি করিবে না— এই সকল প্রশ্নের মীমাংসা স্পষ্ট হইয়া যায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার এই ‘অমোঘ’ বক্তব্য হইতে। ‘অমোঘ’ এই কারণে যে, যুক্তির শক্ত শেকড় গভীরঅব্দি প্রোথিত এই কথার ভিতরে। ‘বাংলাদেশে নির্বাচন হইবে পৃথিবীর অন্যান্য গণতান্ত্রিক দেশের নির্বাচন পদ্ধতির মতোই।’ সাধু কথা। আমাদের গণতান্ত্রিক দেশ, সুতরাং গণতন্ত্রের তুলনামূলক আদর্শধারা স্নাত অন্য দেশগুলির মতোই তো আমাদের নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়া উচিত। নির্বাচন করিবে নির্বাচন কমিশন। শেখ হাসিনা বলিতেছেন, তাহারা এক্ষণে স্বাধীন ও শক্তিশালী। সহস্রাধিক নির্বাচন অনুষ্ঠিত হইয়াছে তাহার এই জামানায়, কিন্তু গ্রহণযোগ্যতা ও বস্তুনিষ্ঠতা লইয়া অভিযোগ উঠে নাই একটিরও। সুতরাং নির্বাচন কমিশনের উপর যে তাহার সরকার ন্যূনতম প্রভাব বিস্তার করে নাই, তাহা প্রমাণিত। কিন্তু শেখ হাসিনার এমন প্রমাণে বিরোধী পক্ষ কোনো ভরসা বা আস্থা খুঁজিয়া পায় নাই এখন অব্দি। বিরোধী পক্ষ মনে করে, এইসকল নির্বাচন আপাত নিরপেক্ষ ও সুষ্ঠুর তকমা পাইলেও জাতীয় নির্বাচনে এর ব্যত্যয় ঘটিতে পারে। তাহাদের সন্দেহ—নির্বাচন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের জন্য সরকার ঘুঁটি সাজাইয়া রাখিয়াছে সর্বক্ষেত্রেই। সুতরাং নির্দলীয় নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা ব্যতীত ইহার আর কোনো সমাধান সম্ভব নহে। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় ক্ষমতা হস্তান্তরের স্বাভাবিক প্রক্রিয়ার যে পথ প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দ্ব্যর্থহীন দৃঢ়তায় দেখাইয়া দিয়াছেন— তাহার প্রতি অবিশ্বাসের আবিষ্কর্তা স্বয়ং তিনি। ১৯৯৬ সালের সাধারণ নির্বাচন তিনি তত্কালীন সরকারের অধীনে করিতে চাহেন নাই। তত্ত্বাবধায়ক ব্যবস্থায় সেইসময় ও পরবর্তীতে ২০০১ সালে অনুষ্ঠিত হইবার পর অতি বৃহত্ বিপর্যয় ঘটে ২০০৭ সনে। ২০০৭-২০০৮ সনের মতো পরিস্থিতি সৃষ্টির পরিবেশ সুপ্ত থাকে এই তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থার ভিতরেই। গণতান্ত্রিক ধারা অব্যাহত রাখিতেও ইহা বড় অন্তরায়। তাহা ছাড়া আদালতের রায়ের পর তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থায় ফিরিয়া যাইবার আর কোনো সুযোগ নাই। কিন্তু বিশ্বাস ও আস্থা যখন মেরুব্যবধানে বিরাজ করে, তখন সমস্যার সমাধান কীরূপে সম্ভব এত সহজে? আমাদের সন্নিহিত রাষ্ট্রের দিকে তাকাইলে দেখিতে পাই, বহু প্রতিবন্ধকতা অতিক্রম করিয়া শ্রীলঙ্কা, ভারত ও মালয়েশিয়া আগাইয়া চলিতেছে গণতন্ত্রের পথে। নেপালও নিয়মতান্ত্রিক গণতন্ত্রের পথে পা বাড়াইয়াছে। মালদ্বীপও দলীয় আধিপত্যের কবল হইতে মুক্ত হইয়াছে। সংসদীয় গণতন্ত্রে সরকারের অধীনেই আমাদের এক সময় না এক সময় নির্বাচন ধারায় ফিরিয়া যাইতে হইবে। অর্থাত্ অন্যান্য গণতান্ত্রিক দেশে যেই নিয়মে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়, সেই ধারায়। প্রধানমন্ত্রী তাহার অবস্থান সুস্পষ্ট করিয়াছেন এই ধারাতেই। তাহাতে বিরোধী পক্ষের নূতন করিয়া আরও হরতাল বা বিক্ষোভ বাড়িতে পারে, সংলাপ-সংলাপ বার্তা সময়ক্ষেপণের তরে বিচরণ করিতে পারে রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে, কিন্তু ইহা অতি স্পষ্ট যে, প্রধানমন্ত্রী যাহা বলিবার বলিয়া দিয়াছেন, তাহার অবস্থান সুস্পষ্ট করিয়াছেন। বিপদ হইল, কোনো পক্ষই ‘বিনাযুদ্ধে নাহি দিব সূচাগ্র মেদিনী’ প্রবাদের বাহিরে নহে। আরও বিপদের কথা হইল, আমাদের দেশে সরকারের মেয়াদ উত্তীর্ণ হইবার সন্ধিকালে তাহাদের ভিতরে একপ্রকার ‘ট্রেড ইউনিয়ন’ মনোভাব গড়িয়া উঠিতে দেখা যায়। এই ভয়ঙ্কর বেড়াজাল হইতে বাহির হইয়া আসিবার বিকল্প নাই। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সেই মুক্তির প্রথম সোপানে পা রাখিয়াছেন। এই প্রথম সোপান কুসুমাস্তীর্ণ নহে, বরং ইহাতে ঘাপটি মারিয়া রহিয়াছে ঝুঁকির বিষকণ্টক। প্রধানমন্ত্রীর নিশ্চয়ই তাহা অজ্ঞাত নহে। তবে ইহাও সত্য যে, একটি অবাধ নিরপেক্ষ সর্বজন গ্রহণযোগ্য নির্বাচন অনুষ্ঠানের জন্য সংশ্লিষ্ট সকল প্রতিষ্ঠানকে নিরপেক্ষ ও স্বাধীন হইতে হইবে। ইহা সময়সাপেক্ষও বটে। প্রধানমন্ত্রী সাহস করিয়া এই কণ্টকাকীর্ণ সোপানে প্রথম পা রাখিয়াছেন, তাহা সার্থক হইলে আমরা সুদূরপ্রসারী ইতিবাচক ফল পাইব। এমন সাহসী সোপানে পা রাখিবার জন্য ধন্যবাদ প্রধানমন্ত্রীকে।

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন