“নির্দলীয়-নিরপেক্ষ অন্তর্বর্তীকালীন সরকার” ধারণাগতভাবে কল্পনীয় হলেও বাস্তবতা ও প্রায়োগিক অর্থে অকল্পনীয় এবং দুর্বোধ্য। বাস্তবতার নিরিখে পরবর্তী জাতীয় সংসদ নির্বাচনে সকল দলের বা জোটের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা এবং সুষ্ঠু, নিরপেক্ষ ও সর্বজন গ্রহণযোগ্য সাধারণ নির্বাচন সম্পন্ন করার লক্ষ্যে প্রায়োগিক অর্থে অকল্পনীয় পন্থায় হলেও নির্দলীয়-নিরপেক্ষ সরকার বা তত্ত্বাবধায়ক সরকার বা যে নামেই বলা হোক না কেন নির্বাচনকালীন নির্দলীয় সরকার ব্যবস্থা প্রণিধানযোগ্য। এক কথায় বলতে গেলে এটা এখন সময়ের দাবী। যদিও বাংলাদেশের বর্তমান সংবিধানের ৫৭ (৩) অনুচ্ছেদ মোতাবেক “প্রধানমন্ত্রী উত্তরাধীকারী কার্যভার গ্রহণ করা না পর্যন্ত প্রধানমন্ত্রীকে স্বীয় পদে বহাল থাকিতে এই অনুচ্ছেদে কোন কিছুই অযোগ্য করিবে না”। অর্থাত্ অন্য কোন ধরনের সরকার ব্যবস্থা নিঃসন্দেহে অকল্পনীয়।
সম্প্রতি ক্ষমতাসীন সরকার দলীয় মহাজোটের শীর্ষ নেতৃবৃন্দ যে ভাষায় বক্তব্য ও বিবৃতি দিয়ে আসছেন তাতে সন্দেহ সৃষ্টির অবকাশ নেই যে, মহাজোট সরকার নির্দলীয়-নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনঃপ্রবর্তন করা বা এ ব্যবস্থায় ফিরে যাবে। অন্যদিকে বিরোধী জোট দ্ব্যর্থহীন কণ্ঠে ঘোষণা দিয়েছেন, যে নামেই বলা হোক না কেন নির্দলীয়-নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার পদ্ধতি ছাড়া জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবেন না। দু’ জোটের এহেন মনোভাব বা Tag of war এ নিশ্চিত রাজনৈতিক মাঠে অন্ধকার কালোমেঘের ঘনঘটা দেখা যাচ্ছে। সরকার দলীয় জোটের দাবী, তাদের ভাষায় এ ধরনের দাবী অসাংবিধানিক বা অযৌক্তিক। অন্যদিকে বিরোধী জোট দাবীতে অনড় এবং দাবীর সপক্ষে হাজারো যুক্তির অভাব নেই।
সত্যি কথা বলতে কি, গণতান্ত্রিক সমাজ ব্যবস্থায় অনির্বাচিত বা দল নিরপেক্ষ সরকার ব্যবস্থা অকল্পনীয়। কিন্তু আমাদের রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে অবিশ্বাস ও আস্থার অভাব এবং আলোচনা ও সহ-মর্মিতা, সমন্বয়হীনতাই নির্দলীয় সরকার পদ্ধতি অনিবার্য হয়ে পড়েছে।
মোদ্দাকথা, নির্দলীয়-নিরপেক্ষ তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা পুনরায় সংবিধানে প্রতিস্থাপন না করলে বিরোধীদল জাতীয় সংসদ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করবে কিনা সে বিষয়ে যথেষ্ট সন্দেহ রয়েছ। নির্দলীয়-নিরপেক্ষ অন্তর্বর্তী সরকার ব্যবস্থা দাবীর পক্ষে সরকারি দল আন্তরিক হলে সংবিধানের ষোড়শ সংশোধনীই অনিবার্য নিয়তি। আর ষোড়শ সংশোধনী পাসের জন্য সরকারি দলের যথেষ্ট সংখ্যাগরিষ্ঠতা রয়েছে সংসদে বা এ ধরনের বিল-এ বিরোধী দল বিনাবাক্যে ভোট প্রদান করবে, সে বিশ্বাস আছে।
আমার প্রস্তাব হলো: নির্দলীয়-নিরপেক্ষ অন্তর্বর্তী সরকার বা তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা আগামী তিনটি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের লক্ষ্যে রাখা যেতে পারে। সে লক্ষ্যে সংবিধানের পঞ্চম ভাগে ১ম পরিচ্ছেদ সংসদ প্রতিষ্ঠার বিধানে ৬৫ অনুচ্ছেদ সংশোধন করা যেতে পারে। ৬৫(২) অনুচ্ছেদ ‘৩০০ জন সাধারণ সদস্য’, ৬৫(৩) অনুচ্ছেদ ‘৫০ জন মহিলা সদস্যদের জন্য সংরক্ষিত’ সংসদ সদস্য থাকার বিধান রয়েছে। সংবিধানের বর্তমান কাঠামোতে এই প্রবিধানের বাইরে মহামান্য রাষ্ট্রপতির কোটায় আরো ১৩ জন সংসদ সদস্য নির্বাচনের বিধান সন্নিবেশিত করা যেতে পারে। এই ১৩ জন সদস্য নির্বাচিত হবেন রাজনৈতিক দল বা জোটের সংসদ নির্বাচনের প্রাপ্ত ভোটের সংখ্যাধিক্যের অনুপাতে। রাষ্ট্রপতির নির্দেশে নির্বাচন কমিশন রাজনৈতিক দল বা জোটের প্রাপ্ত ভোটের সংখ্যাধিক্যের অনুপাতে এক বা ততোধিক মনোনীত প্রার্থী হতে সংসদ সদস্য নির্বাচিত করবে। তবে শর্ত থাকে যে, দল/জোটের মনোনীত প্রার্থিগণ কোন্ স্তরে রাজনৈতিক দলের বা সহযোগী সংগঠনের সদস্য হবেন না এবং সাধারণ নির্বাচনে অংশগ্রহণ করতে পারবেন না। এই ১৩ জন সদস্য যেহেতু কোন রাজনৈতিক দলের প্রত্যক্ষ/পরোক্ষ সদস্য হবেন না সেহেতু তাদের জন্য ‘৭০ অনুচ্ছেদ’ প্রযোজ্য হবে না এবং তারা সংসদের স্বাভাবিক কার্যপ্রণালীতে অংশগ্রহণ করবেন এবং সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য হিসেবে (সভাপতির পদ বাদে) দায়িত্ব পালন করবেন এবং প্রশাসনিক আইনি দক্ষতা বৃদ্ধি করবেন। তবে শর্ত থাকে যে, রাষ্ট্রপতির কোটায় মনোনীত নির্বাচিত সদস্যগণ সংসদীয় কার্যাবলীতে বিভক্তি ভোটে অংশগ্রহণ করবেন না।
যেহেতু সংসদ ভেঙ্গে যাবে এবং সংসদ কর্তৃক নির্বাচিত রাষ্ট্রপতি আছেন বিধায় নতুন মন্ত্রিসভা যৌথভাবে রাষ্ট্রপতির নিকট দায়ী থাকবেন। এবং নতুন মন্ত্রিসভা দৈনন্দিন কার্যাবলী অনুচ্ছেদ ৫৫(৫) এবং ৫৫(৬) মোতাবেক সম্পাদন করবেন। উল্লেখ্য যে, এই মন্ত্রিসভা অনূর্ধ্ব ৯০ দিনের মধ্যে একটি নির্দলীয়-নিরপেক্ষ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সম্পন্ন হওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিবেন এবং ৫৭(৩) অনুচ্ছেদ মোতাবেক “উত্তরাধীকারী প্রধানমন্ত্রীর নিকট কার্যভার হস্তান্তর করিবেন”। এ ক্ষেত্রে সংবিধানের ৫৬(৪) অনুচ্ছেদের (সংসদ ভাঙ্গিয়া যাওয়া কিংবা সংসদ সদস্যদের অব্যবহিত পরবর্তী সাধারণ নির্বাচন অনুষ্ঠানের মধ্যবর্তীকালে এই অনুচ্ছেদে (২) দফায় প্রধানমন্ত্রী ও অন্যান্য মন্ত্রী নিয়োগ ও (৩) দফায় সখ্যাগরিষ্ঠ সদস্যের আস্থাভাজন সদস্যকে রাষ্ট্রপতি কর্তৃক প্রধানমন্ত্রীর নিয়োগ দানের প্রয়োজন দেখা দিলে সংসদ ভাঙ্গিয়া যাইবার অব্যবহিত পূর্বে যাহারা সংসদ সদস্য ছিলেন, এই দফার উদ্দেশ্য সাধনকল্পে তাহারা সদস্যরূপে বহাল রহিয়াছেন বলিয়া গণ্য হইবেন”) কোন ব্যত্যয় ঘটবে না।
পরিশেষে বলা যায়, রাষ্ট্রপতির কোটায় সংসদ সদস্য নির্বাচনের মাধ্যমে ওই নির্বাচিত সদস্যদের সমন্বয়ে সরকার গঠন করলে অনির্বাচিতদের শাসন কাজে অংশগ্রহণের সুুযোগ হবে এবং নির্বাচিত নির্দলীয়- নিরপেক্ষ অন্তর্বর্তীকালীন/ তত্ত্বাবধায়ক সরকার ব্যবস্থা প্রবর্তন করা সম্ভব।
লেখক :এল,এল,বি (সম্মান) লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়, (ইউ,কে)
বি,এ (সম্মান), এম,এ (ইংরেজি) ঢা,বি
E-Mail: suruz 19702006@yahoo. com
