কেন এই আত্মহননের প্রবণতা

আপডেট : ০৬ জুন ২০১৩, ২১:০৮
দেশের বিভিন্ন পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যা করার খবর প্রায় সময়ই পত্রিকার পাতায় দেখা যায়। বিশ্বায়ন ও তথ্য-প্রযুক্তির এই যুগে বিশ্বদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মাঝে আত্মহত্যার প্রবণতা যে অধিকমাত্রায় বৃদ্ধি পেয়েছে তা বলাই বাহুল্য। বিভিন্ন পত্রিকায় প্রকাশিত প্রতিবেদন অনুযায়ী ২০১১ সালের শুধু মার্চ মাসেই রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের তিনজন শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেন এবং অপর দুইজন শিক্ষার্থী আত্মহত্যার চেষ্টা করেন। এদের মধ্যে মাত্র তিনদিনের ব্যবধানে দুইজন শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেন। একই বছরের ২৪ জুন একই বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিং বিভাগের এক ছাত্রী এবং ওই বছরের ৩০ সেপ্টেম্বর একই বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবস্থাপনা বিভাগের এক ছাত্রী আত্মহত্যা করেন। এর পরবর্তী বছরগুলোতেও রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগের বেশ কয়েকজন শিক্ষার্থী আত্মহত্যা করেন এবং বেশ কয়েকজন আত্মহত্যা করার চেষ্টাও করেন। আত্মহত্যার এ ধরনের চিত্র শুধু রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মাঝেই নয়, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বিভিন্ন পাবলিক ও প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মাঝেও এ ধরনের অনেক চিত্র খুঁজে পাওয়া যায়। প্রেমে ব্যর্থতা, মনোমালিন্যসহ সামাজিক-পারিবারিকসহ বিভিন্ন কারণে হতাশা এবং মানসিক অশান্তির ফলে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের শিক্ষার্থীদের মাঝে যে আত্মহত্যার প্রবণতা বেড়ে চলেছে তা বলার অপেক্ষা রাখে না। তবে আশ্চর্যের বিষয়, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের মাঝে আত্মহত্যার ও আত্মহত্যার চেষ্টার প্রবণতা দিন দিন বেড়ে চললেও অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয়েই নেই কোন পরামর্শক বা কাউন্সিলার। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের হতাশা ও মানসিক অশান্তি থেকে উত্তরণের জন্য বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে দ্রুত পরামর্শকদাতা বা কাউন্সিলার নিয়োগ করা প্রয়োজন। তাহলে শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যার চেষ্টা চালানো কিংবা আত্মহত্যা করার প্রবণতা অনেকটাই কমে আসবে বলে আশা করা যায়। আইন অনুয়ায়ী আত্মহত্যার চেষ্টা করা দণ্ডনীয় অপরাধ এবং একই সাথে তা মহাপাপও বটে। আত্মহত্যার চেষ্টা চালানো এবং এর শাস্তি সম্পর্কে বাংলাদেশ দণ্ডবিধির ৩০৯ ধারায় বলা হয়েছে—কেউ যদি আত্মহত্যার চেষ্টা চালিয়ে বেঁচে যান তবে দণ্ডবিধির ৩০৯ ধারা অনুযায়ী তিনি এক বছরের বিনাশ্রম কারাদণ্ড অথবা জরিমানা অথবা উভয় দণ্ডে দণ্ডিত হবেন। যারা আত্মহত্যার চেষ্টা করে বেঁচে গেছেন তাদের বিরুদ্ধে আইন অনুযায়ী যথাযথ শাস্তি কার্যকর করা হলে পরবর্তীতে তা আত্মহত্যা রোধে কার্যকর ভূমিকা রাখবে বলে সকলের বিশ্বাস। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের কোন শিক্ষার্থী যদি আত্মহত্যা করেন বা আত্মহত্যা করার চেষ্টা করেন, তবে তা সমাজ, দেশ ও জাতির জন্য অত্যন্ত লজ্জাজনক ও ঘৃণার একটি বিষয়। কারণ, তাদের নিকট হতে তাদের পরিবারসহ সমাজ, দেশ ও জাতি ভালো অনেক কিছু প্রত্যাশা করে। তারা আত্মহত্যা করুক বা আত্মহত্যা করার চেষ্টা করুক তা কেউ কখনো চান না। এ কথা ধ্রুব সত্য যে, একজন শিক্ষার্থীকে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে আসতে তার অভিভাবকসহ ওই শিক্ষার্থীকে অনেক ধরনের ত্যাগ-তিতিক্ষা স্বীকার করতে হয়। করতে হয় অনেক সংগ্রাম, পাড়ি দিতে হয় অনেক দুর্গম ও বন্ধুর পথ। প্রত্যেক শিক্ষার্থীরই স্মরণ রাখা উচিত, অনেক আশা-ভরসা নিয়ে তাদের বাবা-মা তাদেরকে বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াতে পাঠান। পাশাপাশি দেশ-জাতিও তাদের নিকট হতে ভালো অনেক কিছু আশা করে। মানুষ শারীরিক রোগের মতো অনেক সময় মানসিক রোগেও ভুগে থাকেন। একজন শিক্ষার্থী বা কেউ যখন আত্মহত্যা করেন বা আত্মহত্যার চেষ্টা চালান তখন স্বাভাবিকভাবেই ধরে নেয়া হয় যে, এটি হচ্ছে তার মানসিক অস্থিরতা বা মানসিক অশান্তি বা আবেগ দ্বারা তাড়িত হওয়ার ফলাফল। প্রেমঘটিত কারণ, পারিবারিক সমস্যা, পারিপার্শ্বিক অশান্তি, মানসিক অশান্তিসহ বিভিন্ন হতাশাজনিত কারণে এমন অবস্থার সৃষ্টি হতে পারে। জীবন চলার পথে এ ধরনের কোন সমস্যা আসলে শিক্ষার্থীদের প্রয়োজনে কোন মনোরোগ বিশেষজ্ঞ বা পেশাদার কোন কাউন্সিলারের বা পরামর্শক বা প্রকৃত অর্থেই ভালো এমন কোন শিক্ষক, বন্ধু-বান্ধব বা ভালো কোন অভিভাবকের শরণাপন্ন হওয়া। এ কথা সত্য যে, মানুষের জীবনেই সমস্যা আসে এবং জীবন চলার পথে সমস্যা আসবেই, আর এটিই স্বাভাবিক। তার মানে এই নয় যে, জীবনে সমস্যা আসলে বা সমস্যায় পড়লে আত্মহত্যা করে জীবনটাকে একেবারে শেষ করে দিতে হবে বা আত্মহত্যার চেষ্টা চালাতে হবে। বরং জীবনে সমস্যা আসলে বা সমস্যায় পড়লে শিক্ষার্থীসহ সকলকেই আবেগনির্ভর না হয়ে সুস্থ মস্তিষ্কে বাস্তবতার আলোকে সেই সমস্যার সমাধান করা উচিত বা যে কোন মূল্যে সেই সমস্যা প্রতিহত করা উচিত। আর এখানেই জীবনের চরম সার্থকতা নিহিত। শিক্ষার্থীসহ সকলের স্মরণ রাখা প্রয়োজন, বাস্তবতার কাছে আবেগ সব সময়ই পরাজিত হয়। শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যা রোধে বা আত্মহত্যার চেষ্টা চালানো রোধে শিক্ষার্থীদেরকেই সর্বাগ্রে সচেতন হতে হবে। পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের আত্মহত্যা রোধে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর কর্তৃপক্ষের উচিত কমপক্ষে একজন করে হলেও পরামর্শক বা কাউন্সিলার নিয়োগ দেয়া। এসবের পাশাপাশি আত্মহত্যা যে মহাপাপ ও দণ্ডনীয় অপরাধ এবং আত্মহত্যার বিভিন্ন নেতিবাচক দিক তুলে ধরে বিভিন্নভাবে তার প্রচার-প্রচারণারও ব্যবস্থা করা প্রয়োজন। সর্বোপরি, শিক্ষার্থীসহ সকলকেই জীবনের গুরুত্ব বুঝতে হবে। তাদেরকে বুঝতে হবে যে, জীবন একটাই এবং তা মহামূল্যবান। জীবন একবার হারালে তা আর কোন কিছুর বিনিময়েই ফিরে পাওয়া সম্ভব নয়। তাদের এও ভালোভাবে অনুধাবন করা উচিত যে, জীবনটাকে যদি সুন্দরভাবে সাজানো যায়, তাহলে একে সুন্দরভাবে উপভোগও করা যায়। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের শিক্ষার্থীসহ সকলেরই উচিত তাদের জীবনকে ভালোভাবে উপভোগ করা, নিশ্চয়ই আত্মহত্যার মাধ্যমে জীবনটাকে শেষ করে দেয়া নয়। লেখক :বিভাগীয় প্রধান, আইন বিভাগ, ইউআইটিএস; অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনালের আন্তর্জাতিক সদস্য [email protected]

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন