তুরস্কে আচমকা গড়িয়া উঠা আন্দোলন প্রসঙ্গে

আপডেট : ০৭ জুন ২০১৩, ২১:১৮
যেমন করিয়াই হউক জনগণকে উন্নয়নের জোয়ার দেখাইবার উদ্গ্র বাসনা তাড়িত হইয়া ইস্তাম্বুলে একটি পুরানো পার্ক গুঁড়াইয়া বিলাসবহুল বিপণিবিতান নির্মাণের সরকারি প্রচেষ্টার প্রতিবাদ করিতে যাইয়া গত মাসের একেবারে শেষের দিকে সরকারবিরোধী আন্দোলনের একটি বীজ রোপিত হইয়াছিল তুরস্কে। এক্ষণে, সপ্তাহখানেকের ব্যবধানে তাহা বিপুলাকার হইয়া উঠিতেছে বলিয়া প্রতীয়মান হইতেছে। সরকারবিরোধী আন্দোলন ছড়াইয়া পড়িয়াছে ইস্তাম্বুল, রাজধানী আঙ্কারাসহ অন্যান্য নগরীতে। ইতিমধ্যে একাধিক প্রাণহানি হইয়াছে; আহতের সংখ্যা দাঁড়াইয়াছে কয়েক হাজারে। আন্দোলনকারীদের দাবি-দাওয়ার দিকে দৃকপাত না করিয়া দমন-নিপীড়নের উপর নির্ভর করিতেছে রেসেপ তাইয়েপ এরদোগান এর নেতৃত্বাধীন জাস্টিস অ্যান্ড ডেভেলাপমেন্ট পার্টি (একেপি) সরকার। ইহা ছাড়াও আন্দোলনকারীদিগকে ‘‘উগ্রপন্থী’, ‘‘অন্তর্ঘাতক’’ ও ‘‘ধ্বংসযজ্ঞকারী’’ হিসাবে আখ্যায়িত করা হইতেছে। তুরস্কে ঘটনাপ্রবাহ কতদূর বিস্তৃত হইবে তাহা এখন অবধি স্পষ্ট নহে। তবে আন্দোলনের কয়েক দিন যাইতে না যাইতে হাজার-হাজার নাগরিকের রাস্তায় নামিয়া আসার ঘটনাকে তিনবারের নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী এরদোগানের বিরুদ্ধে বড় ধরনের অনাস্থা বলিয়া মনে হইতেছে। বিশ্লে¬ষকদের অনেকের মতে, ইস্তাম্বুলের গেজি পার্ক ভাঙিয়া ফেলার বিরোধিতা করাটা একটা উছিলা মাত্র। বস্তুত, উদারপন্থী তুর্কিদের মধ্যে এরদোগানের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরিয়াই বিশেষ কয়েকটি কারণে ক্ষোভের আগুন সঞ্চারিত হইতেছিল। তুর্কিরা ব্যাপকভাবে ধর্মপ্রাণ কিন্তু তাহারা রাষ্ট্রকর্মে ধর্ম দেখিতে চাহেন না। তুর্কীরা নিত্যদিন নিয়মিত প্রার্থনা করেন কিন্তু রাষ্ট্রকর্মে ধর্মগুরু বা ধর্মগ্রন্থের উপস্থিতি চাহেন না। জনগণের এই অংশটি মনে করেন এরদোগান ও তাহার সরকার জাতির জনক কামাল আতাতুর্কের আমল হইতে চলিয়া আসা রাষ্ট্রের এমত চরিত্রকে নানা প্রকারে বিনষ্ট করিবার চেষ্টাতে তত্পর আছেন। ইহা ছাড়াও সংখ্যাগরিষ্ঠতার সুযোগ লইয়া এরদোগান একজন ‘‘গণতন্ত্রী’’ শাসকের মতো আচরণ না করিয়া অতীতের অটোমান সাম্রাজ্যের সুলতানের মতো হইয়া উঠিতেছে বলিয়া অভিযোগ করিতেছেন বিরোধীরা। এই ব্যাপারে দীর্ঘদিন ধরিয়া আপত্তি-প্রতিবাদ করিয়া কাজ হয় নাই। বিশ্লে¬ষকদের অনেকের ধারণা এইবার পার্ক ধ্বংসের উদ্যোগটির বিরোধিতাকে সম্বল করিয়া উদারপন্থীরা মাঠে নামিয়াছেন। বাস্তবতা এই যে এরদোগান এখন অবধি তুরস্কের সর্বাপেক্ষা জনপ্রিয় রাজনীতিক। তবে তাহার সর্বাপেক্ষা বড় শক্তি পাশ্চাত্য বিশ্বের অকুণ্ঠ সমর্থন। উল্লে¬খ করিবার মতো বিষয় এই যে সারা দুনিয়া জুড়িয়া উদারনীতিবাদ কায়েমের কথা বলিলেও তুরস্কের ক্ষেত্রে উদারনীতিবাদীদের পরিবর্তে ধর্মবাদী-রক্ষণশীল এরদোগানের প্রতিই যুক্তরাষ্ট্রসহ অন্যান্য পশ্চিমা দেশগুলির অকুণ্ঠ সমর্থন দেখা যাইতেছে। উদাহরণস্বরূপ, এরদোগানকে অন্যতম একজন মিত্র হিসাবে বিবেচনা করে ন্যাটো। ২০১১ সালে টাইম ম্যাগাজিন তাহাকে ‘‘পার্সন অফ দ্য ইয়ার’’ ঘোষণা করে। এরদোগানের উপরে আস্থা এতখানি যে বারাক ওবামা তাঁহার প্রধান পাঁচ মিত্রের একজন হিসাবে রেসেপ তাইয়েপ এরদোগানের নাম ঘোষণা করিয়াছেন। ইহা ছাড়াও শিয়া ইরান ও সিরিয়ার বিরুদ্ধে কট্টর অবস্থান গ্রহণ করিবার মধ্য দিয়া নিজেকে সুন্নী বিশ্বের কাছেও গুরুত্বপূর্ণ করিয়া রাখিতে সক্ষম হইয়াছেন এরদোগান। এমতাবস্থায় দেশের ভিতরে আন্দোলনের যত ঝড় বহিয়া যাক না কেন সেই ঝড়ে এরদোগানের বড় কোন বিপদ ঘটিবার কোন সম্ভাবনা আছে বলিয়া মনে হয় না। তবে উদারপন্থীদের আচমকা গড়িয়া উঠা আন্দোলন এই ইঙ্গিত প্রদান করিতেছে যে আগামী দিনগুলিতে রক্ষণশীল এজেন্ডাগুলি বাস্তবায়নে অগ্রসর হওয়াটা এরদোগানের জন্য খুব একটা সহজ হইবে না।

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন