সংসদীয় সরকার ব্যবস্থায় সংসদে বিরোধী দলের ভূমিকা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। নোবেল পুরস্কার বিজয়ী অমর্ত্য সেনের কথায়, ‘শক্তিশালী বিরোধী দল না থাকলে সরকার ভয় করে না।’ পুরো রাজনৈতিক ব্যবস্থাকে একটি ‘চেক অ্যান্ড ব্যালান্স’-এর মধ্য দিয়ে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার জন্য সংসদে বিরোধী দল দরকার। আধুনিক সংসদীয় ব্যবস্থায় বিরোধী দল নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে তাদের দায়িত্ব পালন করে। সংসদে বিরোধী দল ব্যবহূত কৌশলসমূহ প্রত্যেক দেশের সংবিধান, সংসদ পরিচালনা বিধি, সংশ্লিষ্ট আইনসমূহ এবং প্রথা ও রীতি দ্বারা নির্ধারিত। সংসদের কার্যক্রমে অংশগ্রহণের মাধ্যমে বিরোধী দল সরকারি সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে জনমত সৃষ্টি করতে চায়। এজন্যই সংসদে বিভিন্ন বিষয়ের উপর আলোচনায় অংশ নিয়ে বিরোধী দল নির্ধারিত ইস্যুতে সরকারি অবস্থানের দুর্বলতাসমূহ তুলে ধরে ও বিকল্প নির্দেশ করে। বিরোধী দলের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব হলো সরকারকে জবাবদিহি করতে বাধ্য করা। সরকারের কোনো কাজই জনগণ ও পার্লামেন্টের কাছে অস্পষ্ট ও গোপন থাকবে না। সরকারকে স্পষ্ট, জবাবদিহিমূলক আচরণ করতে বাধ্য করার জন্য বিরোধী দল পার্লামেন্টে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ করবে। এজন্যই বলা হয়েছে: The first task of the Opposition in Parliament is to minimize secrecy in Government. এর ফলে সরকারের পক্ষে একক ক্ষমতা প্রয়োগ করে স্বৈরতান্ত্রিক চরিত্র ধারণ সম্ভব হয় না। এজন্যই আর্নেস্ট বার্কার বিরোধী দলকে রাজনৈতিক ব্যবস্থায় ‘safety valve’ বলেছেন।
গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা, রক্ষা ও গণতন্ত্রের শাসন সুসংহতকরণে বিরোধী দলের ভূমিকা কী হবে—এ নিয়ে রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও পার্লামেন্ট-বিশেষজ্ঞদের অনেক গবেষণালব্ধ মত পাওয়া যায়। ব্রিটিশ পার্লামেন্ট ও ব্রিটিশ গণতন্ত্রের পটভূমিতে গ্রিফিথ ও রাইল বলেছেন, The duty of Her Majestry’s Official Opposition is to oppose Her Majestry’s Government. বিরোধী দলের কাজ হলো সরকারের বিরোধিতা করা। কিন্তু কেন? সরকারের বিরোধিতা থেকে শেষ পর্যন্ত বিরোধী দল কী পেতে চায়? বিরোধী দলের লক্ষ্য থাকে সরকারের দুর্বলতা জনসমক্ষে তুলে ধরা। ভোটারদের মনে সরকার বিরোধী মনোভাব চাঙ্গা করা এবং শেষ পর্যন্ত সরকারি দলকে নির্বাচনে পরাজিত করে সরকার গঠন করা। বাংলাদেশের ক্ষেত্রে বলা যায়, সরকারের সমালোচনা করার ক্ষেত্রে সংসদ অধিবেশন হচ্ছে বিরোধী দলের জন্য উপযুক্ত স্থান। কারণ, সংসদ অধিবেশন সরাসরি সমপ্রচার করা হয় রাষ্ট্রায়ত্ত টেলিভিশনে। যেহেতু বাংলাদেশের ১৬ কোটি জনগণের সিংহভাগের মধ্যেই স্যাটেলাইট চ্যানেলের প্রবেশগম্যতা নেই, সংবাদপত্রের পাঠকও ১০ শতাংশেরও কম; তাই সংসদ অধিবেশনে বসে বিরোধী দল নিরাপদ ও আরামদায়ক পরিবেশে বাংলাদেশ টেলিভিশনে সরাসরি সম্প্রচারের সুযোগ আছে—এমন একটি স্থানে বিনা খরচ ও ঝুঁকিতে সরকারের নেতিবাচক কর্মকাণ্ড ও নিজেদের দাবি-দাওয়া গ্রামে-গঞ্জের তৃণমূল পর্যায়ের জনগণ ও সম্ভাব্য ভোটারদের কাছে তুলে ধরতে পারে। সংসদ অধিবেশনে বিরোধী দলের মুখে সরকারবিরোধী কর্মকাণ্ডের কথা আর মাঠে-ময়দানে বক্তৃতার মধ্যে অনেক পার্থক্য আছে। শেয়ারবাজার কেলেঙ্কারির পর বিজেপি চেয়ারম্যান আন্দালিব রহমান পার্থের সংসদ অধিবেশনে প্রদত্ত একটি বক্তব্য ইউটিউবের মাধ্যমে ব্যাপক হারে ছড়িয়ে পড়ে। পল্টন ময়দানে রাজনৈতিক সমাবেশের তার কোনো বক্তব্য এতটা প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করতো না নিশ্চয়ই। আর সরকার দলীয় এমপিরা সত্য গোপন করে সরকারের যতই গুণকীর্তন করেন না কেন, তা বিশ্বাসযোগ্য হবে না। কারণ, দেশের অর্থনীতি ও দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি—সবকিছু মিলিয়ে বাস্তব অবস্থার প্রেক্ষাপটে একজন সাধারণ মানুষ সহজেই সরকার দলীয় এমপিদের বক্তব্য বিচার করতে পারবে। সংসদের মাধ্যমে সরকারবিরোধী জনমত গঠনের সুযোগ পাওয়ার পরও দেশের বিরোধী দল বছরের পর বছর ধরে কোন্ যুক্তিতে সংসদ বর্জন করছেন, তা সত্যিই বোধগম্য নয়। আসলে এটা ঠিক যে, আমাদের দেশে সরকারবিরোধী জনমত তৈরি হয় বিরোধী দলের কৌশলগত প্রচারণার কারণে নয়; বরং সরকারের অপকর্ম ও দুঃশাসনের কারণে।
সংসদে ওয়াকআউট আপত্তি জ্ঞাপন বা বিরোধিতা প্রকাশের একটা ক্ষণকালীন ব্যবস্থা হলেও এখন তা লাগাতার হয়ে যাচ্ছে। বিরোধী দল ওয়াক আউট করে সরকারকে যে ওয়াক ওভার দিচ্ছে সে সম্পর্কে কোনো দুশ্চিন্তা নেই। সরকারকে মোকাবিলা করার জন্য যেখানে বিরোধী দলকে সংসদে মাটি কামড়ে পড়ে থাকার কথা, সেখানে সংসদ বর্জন করে অতি সহজেই সংসদ সদস্যরা তাদের দায়িত্ব পালন করেন। বিরোধী দলের অব্যাহত সংসদ বর্জনের কারণে বিরোধী দল হিসেবে রাজনৈতিক দলগুলোর ভাবমূর্তিও প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে। কারণ নির্বাচনী এলাকার একজন ভোটার একজন প্রার্থীকে ভোট দিয়ে নির্বাচিত করছেন এই আশায় যে, নির্বাচিত হয়ে তিনি সংসদে এলাকার উন্নয়ন ও সমস্যার কথা বলবেন। আরেকটি বিষয় হলো, সরকারকে বেকায়দায় ফেলার জন্য সংসদ অধিবেশন বয়কট ও ওয়াকআউট করা হলেও আমাদের দেশের সরকারের কাছেও তা এখন গা-সহা হয়ে গেছে। দুর্ভাগ্যজনক হলেও ১৯৯১ সাল থেকে গত প্রায় দুই যুগ ধরে বার বার এই নিষ্প্রাণ সংসদেই চলছে আমাদের গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা। এ কারণে গণতান্ত্রিক মূল্যবোধসম্পন্ন কাঙ্ক্ষিত রাজনীতি এ দেশে ইতিবাচক মাত্রায় বিকশিত হয়নি আজও। বর্তমান সংসদেও অতীতের বর্জন-সংস্কৃতি অব্যাহত আছে। মাঝে-মধ্যে বিরোধী দল সংসদে গেছে কেবল সদস্যপদ রক্ষার জন্য ৯০ কার্যদিবসের বাধ্যবাধকতার কারণে। হাজিরা খাতা সই করে আবার প্রত্যাখ্যানের পূর্ব অবস্থানে ফিরে গেছেন বিরোধী সাংসদরা।
পরিসংখ্যানে দেখতে পাই, পঞ্চম সংসদে মোট ৪০০ কার্যদিবসের মধ্যে বিরোধী দল বয়কট করেছে ১৩৫ দিন। সপ্তম সংসদে মোট ৩৮২ কার্যদিবসের মধ্যে বিরোধী দল বর্জন করেছে ১৬৩ দিন। অষ্টম সংসদের পুরো মেয়াদে ৩৭৩ কার্যদিবসের মধ্যে আওয়ামী লীগ অনুপস্থিত ছিল ২২৩ দিন, উপস্থিত ছিল ১৫০ দিন। অষ্টম সংসদে বিরোধী দলীয় নেতা শেখ হাসিনা উপস্থিত ছিলেন ৪৫ কার্যদিবস। চলতি সংসদের প্রথম চার বছরে মোট ৩৩৭ কার্যদিবসের মধ্যে বিরোধী দল উপস্থিত ছিল মাত্র ৫৪ দিন। অনুপস্থিত ছিল ২৮৩ কার্যদিবস। আর বিরোধী দলীয় নেতা খালেদা জিয়া চলতি সংসদে উপস্থিত ছিলেন মাত্র আট কার্যদিবস। বিরোধী দলের একটি পুরনো অভিযোগ, তাদের কথা বলতে দেয়া হয় না বলে তারা সংসদে যান না। এটি অত্যন্ত খোঁড়া যুক্তি। সংসদে কথা বলতে না দিলে তারা সেখানে গিয়ে অবস্থান ধর্মঘট ও মানববন্ধন করে প্রতিবাদ করতে পারেন। রাজপথে আন্দোলন করতে গিয়ে, কথা বলতে গিয়েও তো বিরোধী দল সরকারের বাধা, পুলিশের হামলা-মামলার শিকার হচ্ছে; কিন্তু রাজপথ তো বর্জন করা হচ্ছে না।
আবার সংসদ বর্জন করলেও বেতন-ভাতা, বিনাশুল্কে গাড়ি আমদানিসহ অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা ঠিকই হাতিয়ে নিচ্ছেন বিরোধী দলের সাংসদরা। এমনকি সংসদে না গিয়ে দৈনন্দিন যাতায়াত ভাতা পর্যন্ত তুলে নিচ্ছেন। এটি কতটা নৈতিক? রাজপথে মিছিল করতে না পারলে প্রায়শই এমপিরা সংসদ এলাকায় গিয়ে মিছিল-সমাবেশ ও মানববন্ধন করেন; অথচ সংসদ অধিবেশনে তাদের দেখা যায় না। ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি) সম্প্রতি জানায়, ১৬৩ কার্যদিবসের মধ্যে ১৫৩ কার্যদিবস সংসদ বর্জন করেও বিরোধী দলীয় সংসদ সদস্যরা প্রাপ্য আর্থিক সুবিধাদি গ্রহণ করেছেন। প্রাপ্য আর্থিক সুবিধাদির ভিত্তিতে একজন সংসদ সদস্যের একদিনের অনুপস্থিতির প্রাক্কলিত অর্থমূল্য তিন হাজার ৫৫৮ টাকা। এ হিসেবে চলতি সংসদে প্রথম থেকে ১৫তম অধিবেশন পর্যন্ত বিরোধী জোটের সকল সদস্যের সংসদ বর্জনের অর্থমূল্য চার কোটি এক লাখ ৩৪ হাজার টাকা।
যা হোক, এতদিন পর প্রধান বিরোধী দল বিএনপি সংসদে যোগ দিয়েছে নিঃসন্দেহে এ মুহূর্তে সবচেয়ে বড় ইতিবাচক খবর। সংসদ সদস্যপদ রক্ষা তথা নিয়ম রক্ষার জন্য হলেও বিএনপির বাজেট অধিবেশনে যোগ দেয়া জাতীয় সংসদের গত ২২ বছরের ইতিহাসে একটা নতুন ঘটনাও। কেননা ১৯৯১ সাল থেকে এ পর্যন্ত কোনো বিরোধী দলই বাজেট অধিবেশনে যোগ দেয়নি। প্রতিটি বাজেট পাস হয়েছে বিরোধী দলহীন সংসদে। সেদিক থেকেও এই যোগদান তাত্পর্যপূর্ণ। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, এই অধিবেশনে উত্থাপিত ২০১৩-১৪ অর্থবছরের বাজেট কার্যকর হবে তিনটি সরকারের আমলে। প্রথম কয়েক মাস বর্তমান ক্ষমতাসীন সরকার। এরপর তিন মাসের জন্য দেশ পরিচালিত হতে পারে নির্বাচনকালীন সরকারের অধীনে। তারপর প্রায় পাঁচ বছর পরিচালিত হবে নতুন নির্বাচিত সরকারের অধীনে। সুতরাং, এই বাজেট অধিবেশনে বিরোধী দলের অংশগ্রহণ খুব দরকার। আজ যারা বিরোধী দলে, কাল তারা সরকারি দলে থাকতেও পারে। তখন এ বাজেট অনুসারেই তাদের দেশ চালাতে হবে।
আরেকটি বিষয় হলো, নির্বাচনকালীন সরকারের বিষয়ে যে সংলাপ-সমঝোতার কথা এতদিন আলোচনায় ছিল, সেই সম্ভাবনা ইতোমধ্যেই ক্ষীণতর হয়েছে। কারণ, দুই দল এখনো এ প্রশ্নে দুই বিপরীত মেরুতে অবস্থান করছে। এমতাবস্থায় আশার কথা হলো, স্পিকার শিরীন শারমিন চৌধুরী গত কয়েকদিন আগে জানিয়েছিলেন তত্ত্বাবধায়ক বা অন্য কোনো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আলোচনার জন্য দুই দল একমত হলে প্রয়োজনে নতুন অধিবেশন ডাকা হবে। এখন সরকারের দিক থেকেও সমঝোতার মনোভাব দেখানো এবং সংসদে অর্থবহ আলোচনার উদ্যোগ নেয়ার সুযাগ তৈরি হলো। আবার বিরোধী দলও তাদের অবস্থান পরিবর্তন করতে পারে—একটি পক্ষপাতহীন পরিবেশে সব দলের অংশগ্রহণের মাধ্যমে কীভাবে আগামী জাতীয় সংসদের নির্বাচন করা যায়, সে প্রস্তাব বিরোধী দল সংসদে রাখতে পারে। এতে তাদের মৌলিক অবস্থানে ভাটা পড়বে এমনটা মনে করার কারণ নেই। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবিতে চলা তাদের আন্দোলন কর্মসূচির অংশ হতে পারে সংসদে যোগদান। তাতে মাঠের পাশাপাশি সংসদেও তাদের দাবির বিষয়ে সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টির সুযোগ থেকে যায়। যদিও তত্ত্বাবধায়ক সরকারের বিষয়ে ‘নির্বাচনকালীন সরকার ব্যবস্থা নিয়ে আলোচনা’ মুলতবি প্রস্তাব প্রত্যাহার করায় অনেকের মধ্যে এ ধারণা হয়েছে যে, তারা হয়তো এ অধিবেশনে বেশিদিন থাকবেন না। তারপরও চলতি অধিবেশনে বিরোধী দলের যোগদানে নতুন আশার আলো দেখছে দেশের ১৬ কোটি মানুষ।
লেখক: সহকারী অধ্যাপক, যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়
