শত্রুর সঙ্গে বন্ধুত্ব কেন জরুরি

আপডেট : ০৮ জুন ২০১৩, ২১:৪৪
জীবনের জন্য বন্ধুত্ব ভীষণ প্রয়োজন। কিন্তু প্রশ্ন হলো, সেটা কার সঙ্গে? যে আমার প্রিয়, যার সঙ্গে আমার মনের মিল, যে আমার শুভাকাঙ্ক্ষী তার সঙ্গে। বন্ধু এমন কেউ যে বিপদে পাশে দাঁড়ায়; সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনার অংশীদার। যে আত্মীয় নয়, অথচ তারচেয়েও বেশি; যে আমার পক্ষে নিভৃতে কাজ করে যায়। বন্ধু সে যে মনের ভেতর সারাক্ষণ থাকে। দূরে গেলেও যে আসলে খুব কাছের; প্রতিদানের কথা না ভেবেই যে দুঃসময়ের সাথী, কঠিন কাজে অনুপ্রেরণার উত্স। এমন মানুষের সঙ্গেই তো আমরা সাধারণত বন্ধুত্ব করি এবং তা জিইয়ে রাখি। আমরা চাই আমাদের প্রিয় মানুষেরা আমাদের চারপাশ ঘিরে থাকুক। তাদের নিয়েই পরিপূর্ণ হোক আমাদের একান্ত জগত্। এর প্রতিদানে আমরা চাই আমাদের বন্ধুদের একান্ত জগত্টাকেও অনুরূপ প্রিয়তা আর ভালোবাসা দিয়ে পূর্ণ করে রাখতে। এটাই তো স্বাভাবিক নয় কি? অবশ্যই। তবে এখানেই শেষ নয়। বন্ধু নিয়ে এটা সাধারণ চিন্তা। এর বাইরে অসাধারণ চিন্তা থেকেও বন্ধুত্ব হতে পারে। হয়। আর তাতে অনেক লাভ—ব্যক্তি ও সমাজের। বাস্তব জীবনে আমরা যেমন চাই, তেমন বেশিরভাগ ক্ষেত্রে হয় না। প্রতিদিনের খবরের কাগজে, টিভির পর্দায়, অনলাইনে, অফ লাইনে বিভিন্ন মাধ্যমে চোখ রেখে যা দেখি তার বেশিরভাগ হচ্ছে আমরা যা চাই তার বিপরীত। সেখানে প্রধানত যা থাকে তা বন্ধুতা নয়, প্রিয়তা নয়, অবন্ধুতা, অপ্রিয়তার সবিস্তার বিবরণ। খুন, জখম, হানাহানি, লুণ্ঠন, হরণ-অপহরণ, সংঘাত-সহিংসতা, যুদ্ধ, অন্যায়-অত্যাচার, ক্ষমতার অপব্যবহার— কোনোটাই বন্ধুতার ফসল নয়, বরং তার বিপরীত। গণমাধ্যম ঠাসা থাকে এসব খবরে। এর মাধ্যমে যে বাস্তবতার ছবিটা আমরা পাই সেটি এ সাক্ষ্যই দেয় যে, আমাদের প্রাত্যহিক জীবনকে বেশি আলোড়িত করে প্রেম নয়, অপ্রেম; ভালোবাসা নয়, ভালোবাসাহীনতা। এর বিপরীতে ভিন্নতর সুন্দর-শান্তিময় জীবন প্রতিষ্ঠার মানবিক চেষ্টা নিভৃতে চলতে থাকে। তবে সেটা সচরাচর খবর হিসেবে সামনে আসে না। কারণ এটা স্বাভাবিক প্রবণতা। এটি নিয়মিত নতুন করে মানুষকে জানানোর প্রয়োজন হয় না। অন্যদিকে শত্রুকে বন্ধু করা অথবা দৃশ্যমান অপ্রেমকে প্রেমে পরিণত করার কাজটা অনেক বড় মাপের এবং বেশ কঠিন। কিন্তু সমাজে যখন মিলেমিশে চলার স্বাভাবিক প্রবণতার বিপরীতে দ্বন্দ্ব-সহিংসতার মাত্রা বেড়ে যায়, বিশেষ করে দেশে যখন গৃহযুদ্ধের অবস্থা বিরাজ করে তখন অবন্ধুকে বন্ধু করা, অপ্রিয়জনকে প্রিয় করার তাগিদ আরো তীব্রভাবে অনুভূত হয়। সেদিক থেকে যার সঙ্গে মেলে না, যে প্রতিপক্ষ, যে অষ্টপ্রহর বিরুদ্ধ অবস্থানে, যে প্রতিপক্ষের নিন্দা-সমালোচনার জন্যই কেবল সোচ্চার হয়, কখনো কখনো মারাত্মক ঘৃণা এমনকি সহিংস রূপ নিয়ে সামনে আসে—এমন লোক যাকে কেবল শত্রু বলেই চিহ্নিত করা যায়, তার সঙ্গেও কি কোনোরকম বন্ধুত্ব হতে পারে? উত্তর হলো, হয়। আর সাধারণত তা না হলেও সেরকম কিছু যাতে হয় সেজন্য আমাদের সচেষ্ট থাকা একান্ত প্রয়োজন। কারণ সব সময় না হলেও কোনো কোনো সময় এই শেষোক্ত ধরনের বন্ধুতা ভীষণ দরকার হয়ে পড়ে। যেমন বাংলাদেশে এখন আমাদের সমাজে এই ধরনের বন্ধুতা ভীষণ জরুরি হয়ে দেখা দিয়েছে। কিছুটা ব্যতিক্রমধর্মী বিষয়টি সম্পর্কে আমি আমার মতো করে একটা ব্যাখ্যা দাঁড় করিয়েছি। কিন্তু এ ব্যাখ্যার নেপথ্যে যে মূল ধারণা সেটি পুরোনো। সেটা আসলে বাইবেলের একটা বিখ্যাত শিক্ষা। সেখানে যীশু খ্রিস্টের জবানিতে যে উপদেশটা দেয়া হয়েছে সেটা এইরকম: তুমি তোমার শত্রুকে ভালোবাসো, তার ভালো করো যে তোমাকে ঘৃণা করে। তাকে আশীর্বাদ করো যে তোমাকে অভিশাপ দেয়। তার জন্য প্রার্থনা করো যে তোমাকে নির্যাতন করে। যে তোমার এক গালে চড় দেয় তার দিকে অন্য গালটাও পেতে দাও। যে তোমার আলখাল্লাটা নিয়ে গেছে তাকে তোমার পরনের জামাটাও দিয়ে দিতে দ্বিধা করো না। যে যা চায় তা তাকে দিয়ে দাও। যে তোমার সম্পদ হরণ করে তাকে আর এ নিয়ে কিছু জিজ্ঞেস করো না। তুমি অন্যের কাছ থেকে যেমন আচরণ আশা করো তুমি তার সঙ্গে তেমন আচরণ করো। বাইবেলে আরো বলা হয়েছে, ‘তোমার শত্রু যদি ক্ষুধার্ত হয় তবে তার মুখে অন্ন তুলে দাও। সে যদি তৃষ্ণার্থ হয় তবে তাকে পানীয় দাও। খারাপের সঙ্গে খারাপ আচরণ করে তার কাছে পরাজিত হইও না, বরং খারাপকে জয় করো ভালো দিয়ে।’ পরম শত্রুকেও ক্ষমা করে দেয়া, মনে-প্রাণে তার কল্যাণ কামনা, তার প্রতি দয়া প্রদর্শন, তার জন্য ত্যাগ স্বীকার করার এই বাইবেলীয় শিক্ষা নিয়ে অনেক লেখালেখি হয়েছে। বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই অহিংসার আদর্শে অনুপাণিত এ উপদেশকে এক মহান মানবিক শিক্ষা হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে। তবে এর সমালোচনা করতে গিয়ে বলা হয়েছে যে, এটি বাস্তবসম্মত নয়। রক্ত-মাংসের মানুষ তার বাস্তব জীবনে এ নীতি মেনে চলতে পারে না। কারণ মানুষের সহজাত প্রবণতা হলো, কেউ তাকে আঘাত করলে সে পাল্টা আঘাত করে, কেউ তার ক্ষতি করলে সে পাল্টা ক্ষতি করে এর প্রতিশোধ নিতে চায়। নেয়। মানুষ চোখের বদলে চোখ, দাঁতের বদলে দাঁত চায়। অনেকটা মধ্যযুগীয় এ নীতির পক্ষে যুক্তি দিতে গিয়ে বলা হয়, হিংসাকে হিংসা দিয়ে মোকাবিলা করলে ভয়ে মানুষের সহজাত অপরাধ তত্পরতা নিরুত্সাহিত হয় এবং সে ভালো হয়ে আইন-কানুন, বিধি-বিধান মেনে চলতে বাধ্য হয়। পক্ষান্তরে উন্নত, উদার শিক্ষার আদর্শে উদ্বুদ্ধ আধুনিক, সংবেদনশীল, সুবিবেচক মানুষ যুক্তি দেন যে, ওরকম প্রতিহিংসাপরায়ণ নীতি অনুসরণ করে চললে সমগ্র মানবজাতি অন্ধ হয়ে যাবে। হানাহানি ও সহিংসতা অনন্তকাল ধরে চলতে থাকবে। তাই ব্যক্তি ও সামাজিক অঙ্গনে বৃহত্তর স্বার্থের কথা মনে রেখে প্রতিপক্ষকে ছাড় দিতে হয়। অন্ধকারকে দূর করতে হলে আরো অন্ধকার নয়, আলো ছড়াতে হয়। আর তাই শত্রু কিংবা প্রতিপক্ষের সঙ্গে অনিবার্য প্রতিদ্বন্দ্বিতা, সংঘাত-সহিংসতার অন্তরালে হলেও এক ধরনের বন্ধুতার চর্চা অব্যাহত রাখাটা ভীষণ জরুরি। এজন্যই সম্ভবত বিজ্ঞ কূটনীতিকরা এমনকি যুদ্ধের সময়টাতেও এ চেষ্টা চালিয়ে যান। এই প্রেক্ষাপটে তাত্ক্ষণিক স্বার্থ চিন্তা, কূট-কৌশল, হঠকারিতাকে পরিহার করে আমাদের আত্মপক্ষ বা বন্ধুর সঙ্গে যেমন, তেমনি শত্রু বা প্রতিপক্ষের সঙ্গেও যতটা সম্ভব ভালো এবং ন্যায্য আচরণ করা দরকার। প্রয়োজন সহানুভূতিশীল, সহূদয় আচরণের মাধ্যমে তাকে ক্রমান্বয়ে জয় করবার জন্য সচেষ্ট থাকা। এমন নীতি অনুসরণ করা উচিত, যাতে আমাদের শত্রু এক পর্যায়ে বন্ধু হয়ে যায়। নিজেদের কাজের সৌন্দর্য দিয়ে প্রতিপক্ষকে আকৃষ্ট ও জয় করবার পথই প্রকৃত মুক্তির পথ । লেখক : সম্পাদক ও প্রধান, প্রকাশনা ও জনসংযোগ বিভাগ, বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট, ব্রি, গাজীপুর-১৭০১ । ইমেইল:[email protected]

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন