আবারও পুলিশ হেফাজতে মৃত্যু

আপডেট : ০৮ জুন ২০১৩, ২২:১৫
মাত্র ১৫ দিনের মধ্যে আবারও পুলিশ হেফাজতে মৃত্যুর গুরুতর অভিযোগ উঠিয়াছে। নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁ থানা পুলিশের হেফাজতে থাকা অবস্থায় গত ২২ মে মর্মান্তিকভাবে নিহত হইয়াছিলেন শামীম রেজা নামের এক ব্যক্তি। আইন বহির্ভূতভাবে প্রায় ছয়দিন তাহাকে আটক করিয়া রাখা হইয়াছিল। আটকাবস্থায় তাহার উপর নির্দয়ভাবে নির্যাতন চালানোর অভিযোগ উঠিয়াছিল। অভিযোগের সত্যতাও প্রমাণিত হইয়াছে পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে। সেই ঘটনার রেশ কাটিতে না কাটিতেই গত ৫ মে গভীর রাত্রে সাভারের হেমায়েতপুরে পুলিশি নির্যাতনে শামীম সরকার নামে এক যুবকের মৃত্যুর অভিযোগ উঠিয়াছে। এই ঘটনায় সাভার ও আশুলিয়া থানার তিনজন কর্মকর্তাকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হইয়াছে। অবশ্য অনুরূপ কিছু ব্যবস্থা নারায়ণগঞ্জেও নেওয়া হইয়াছিল। কিন্তু রোগের ভয়াবহতার তুলনায় এই ধরনের প্রতিষেধক যে একেবারেই কার্যকর নহে—সাভারের ঘটনায় তাহা স্পষ্ট হইয়া গিয়াছে। লক্ষণীয় যে, দুইটি ঘটনার স্থান-কাল-পাত্র ভিন্ন হইলেও অপরাধের উদ্দেশ্য, ধরন ও কৌশল অভিন্ন। উভয় ক্ষেত্রেই ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে আটক ব্যক্তিদ্বয়ের স্বজনদের নিকট মোটা অংকের অর্থ দাবি করা হইয়াছিল। সরকারি ক্ষমতার অপব্যবহারকারী কতিপয় ব্যক্তির সেই অন্যায় দাবি পূরণে অপারগতা কিংবা অস্বীকৃতির পরিণাম কতোখানি ভয়াবহ হইতে পারে—উল্লিখিত ঘটনা দুইটি তাহার সামান্য উদাহরণ মাত্র। অপ্রিয় হইলেও সত্য যে, সমাজের সর্বক্ষেত্রে আইন-কানুন ও নিয়ম-নীতির প্রতি অবজ্ঞা প্রদর্শনের যে মহোত্সব চলিয়া আসিতেছে— ইহা সেই বিশাল ডুবো পাহাড়ের চূড়া ছাড়া কিছু নয়। ঘটনার প্রতিবাদে সাভারের জনগণ বিক্ষোভ করিয়াছে। একইভাবে নারায়ণগঞ্জেও দিনের পর দিন বিক্ষোভ হইয়াছে। সংক্ষুব্ধ জনগণের দাবি একটাই: দায়ী ব্যক্তিদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি। দাবিটি যৌক্তিক শুধু নয়, সর্বজনীনও বটে। এই দাবির সহিত কাহারো দ্বিমত নাই। কিন্তু প্রশ্ন হইল, বিচ্ছিন্নভাবে গুটিকয় ব্যক্তিকে শাস্তি দিলেই কি আইন ও মানবাধিকারের প্রতি চরম অবজ্ঞা প্রদর্শনের এই ঘৃণ্য প্রবণতা বন্ধ হইবে? বন্ধ যে হইবে না— তাহা লইয়া দ্বিমত প্রকাশের কোনো অবকাশ নাই। প্রবাদ আছে যে, ‘সর্বাঙ্গে ব্যথা ঔষধ দিব কোথা’। আমাদের অবস্থাও অনেকটা সেই রকমই। সমস্যা শুধু থানায় নহে, সমাজ ও রাষ্ট্রের সর্বত্রই ছড়াইয়া পড়িয়াছে নিয়মনীতি না মানার, আইনের প্রতি তোয়াক্কা না করার এবং ক্ষমতার যথেচ্ছ অপব্যবহারের এই ব্যাধি। পা হইতে মাথা পর্যন্ত একই অবস্থা। অনিয়মই নিয়ম হইয়া দাঁড়াইয়াছে। অর্থ ও ক্ষমতার দাপটই হইয়া দাঁড়াইয়াছে যাবতীয় সাফল্যের চাবিকাঠি। নিয়োগ-বদলি-পদোন্নতি শুধু নয়, অর্থ ছাড়া যে কোথাও কোনো কাজই হয় না তাহা কোনো নূতন কথা নহে। ফলে সকলেই যেইখানে যে-কোনো উপায়ে অর্থ হস্তগত করিবার জন্য মরিয়া হইয়া উঠিয়াছে, সেইখানে আলাদাভাবে পুলিশকে দোষারোপ করিবার অবকাশই বা কোথায়? এই অবস্থা যে হঠাত্ করিয়া সৃষ্টি হইয়াছে—এমনও নহে। নির্বাচিত-অনির্বাচিত সকল সরকারের আমলে এইভাবেই চলিয়া আসিতেছে। সরকার বদলাইলেও অবস্থা বদলাইতেছে না। বরং যতো দিন যাইতেছে, ক্ষেত্রবিশেষে পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটিতেছে। প্রসারিত হইতেছে দুর্নীতির থাবা। বৃদ্ধি পাইতেছে ক্ষমতার অপব্যবহার এবং সীমালঙ্ঘনের প্রবণতা। যাহারা ইহার লাগাম টানিয়া ধরিতে পারিতেন—বিস্ময়করভাবে তাহারা নির্বিকার। হয়তো সুদূর ভবিষ্যতের সমষ্টিগত ভালোমন্দের তুলনায়, মোহময় বর্তমানের ব্যক্তি বা দলগত নগদপ্রাপ্তিই তাহাদের নিকট অধিক মূল্যবান বলিয়া বিবেচিত হইয়া থাকে। কিন্তু আখেরে ইহার ফল যে শুভ হয় না—তাহার উদাহরণ অঢেল।

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন