প্রস্তাবিত শিশু আইন

আপডেট : ০৮ জুন ২০১৩, ২২:১৫
আমাদের দেশে মতলববাজ সুবিধাবাদী মহলেরা সবকিছুতেই দূষণ ঘটায়। তাহাদের নৃশংস নখর হইতে শিশুরাও নিস্তার পায় না। সমপ্রতি আমরা অত্যন্ত উদ্বেগের সহিত দেখিতে পাইয়াছি—ভিক্ষাবৃত্তি, বিপজ্জনক পরিবেশে শ্রমবৃত্তি, গৃহকর্মে এক ধরনের ‘দাসবৃত্তি’ হইতে শুরু করিয়া যৌনবৃত্তিতেও নিযুক্ত করা হইতেছে অসহায়-ছিন্নমূল-দরিদ্র শিশুদের। এই তালিকায় রাজনীতির দূষিত অংশের দৌরাত্ম্যও এক্ষণে আশঙ্কজনকহারে বৃদ্ধি পাইয়াছে। মূলত এই সকল বিষয় নজরে আনিয়া নূতন শিশু আইন করা হইতেছে। রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে শিশুদের ব্যবহারের উপর নিষেধাজ্ঞার বিধান রাখিয়া সমপ্রতি শিশু আইন-২০১৩ বিলের প্রতিবেদন চূড়ান্ত করিয়াছে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটি। আশা করা হইতেছে সংসদের চলতি অধিবেশনেই বিলটি পাস হইয়া যাইবে। এমন আইন প্রণয়ন ও তাহার যথার্থ প্রয়োগের বিকল্প নাই একটি সুষ্ঠু সমৃদ্ধ জাতি হিসাবে নিজেদের গড়িয়া তুলিবার। অসহায়-দীন-ছিন্নমূল শিশুদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে নিয়োজিত করার বিষয়টি অধিক ভয়ঙ্কর। কারণ, এইসকল রাজনীতিকরাই নির্বাচনে জিতিয়া আইন প্রণেতার আসন অলঙ্কৃত করেন। সুতরাং তাহাদের বোধ বিবেচনার বৈকল্য বা দেউলিয়া কর্মকাণ্ড জাতিকে পিছাইয়া দেয় সব দিক দিয়াই। রাজনীতির অস্থির নাজুক ময়দানে শিশুদের ব্যবহার করিয়া হানাহানি, পিকেটিং ও সহিংতা কর্মকাণ্ডের বিষয়টি উদ্বিগ্ন করিয়াছে জাতিসংঘের শিশুবিষয়ক সংস্থা ইউনিসেফ-কে। জাতিসংঘ শিশু অধিকার সনদের বিধানাবলী বাস্তবায়নের লক্ষ্যেও বৈষম্যহীন শিশুর সার্বিক সুরক্ষা, যত্ন-পরিচর্যা, অধিকার প্রতিষ্ঠা এবং উন্নয়ন বিকাশের পথ মসৃণ করা জরুরি। এই উদ্দেশ্যেও ‘শিশু আইন-১৯৭৪’ রহিত করিয়া ‘শিশু আইন-২০১৩’ একটি নতুন আইন প্রণয়নের গুরুত্ব দিয়া সংসদীয় কমিটি যে মতামত দিয়াছে তাহা প্রণিধানযোগ্য। এই আইনে রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে শিশুদের ব্যবহারের সর্বোচ্চ শাস্তি হিসাবে পাঁচ বছরের জেল ও এক লাখ টাকা জরিমানার বিধান রাখা হইয়াছে। তাহাছাড়া এমন কোনো কাজ করা যাইবে না, যাহাতে শিশুর প্রতি নিষ্ঠুরতা, ভোগান্তি সৃষ্টি বা শিশুর অঙ্গহানি হয়। এ ছাড়া কোনো রাজনৈতিক কার্যক্রমের মাধ্যমে শিশুকে শোষণ এবং শিশুকে ভিক্ষাবৃত্তিতে উত্সাহিত করা হইলে তাহাও অপরাধের আওতায় আসিবে। এই আইনের আওতায় শিশুর কল্যাণ ও অধিকার রক্ষায় জেলা পর্যায়ে শিশুর আদালতও স্থাপন করিবার পরিকল্পনাও রহিয়াছে। বাংলাদেশ শিশু অধিকার সনদে (সিআরসি) স্বাক্ষরদানকারী একটি দেশ। ওই সনদে বলা হইয়াছে, ‘সকল প্রকার শারীরিক বা মানসিক সহিংসতা, আঘাত বা হয়রানি, অবহেলা, দুর্ব্যবহার বা শোষণ হইতে শিশুদের রক্ষা করিতে হইবে।’ দেশের জাতীয় শিশুনীতি-২০১১-তেও স্পষ্টভাবে উল্লেখ রহিয়াছে, ‘রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে শিশুদের ব্যবহার করা যাইবে না; এ ধরনের কর্মকাণ্ডে তাহাদের সম্পৃক্ত হইতে প্রলুব্ধ বা বাধ্যও করা যাইবে না।’ কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন। সামান্য টাকার বিনিময়ে বা একটি বেলার খাবারের লোভ দেখাইয়া সহিংস রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে শিশুদের জড়াইবার উদাহরণ ভূরি ভূরি। জাতীয় শিশুনীতিতে শিশুদের রাজনৈতিক কর্মসূচিতে ব্যবহার না করিবার কথা থাকিলেও তাহার ব্যত্যয় দেখা গিয়াছে। তাই প্রয়োজন পড়িয়াছে এই নতুন ও কঠোর ‘শিশু আইন ২০১৩’-এর। আমাদের স্মরণ রাখিতে হইবে, ছিন্নমূল অসহায় বলিয়া এই শিশুদের উপেক্ষা করিলে তাহারাই শিশুকাল উত্তীর্ণ করিয়া নানা প্রকার অপরাধ কর্মকাণ্ডে জড়াইয়া পড়িবে। নিরাপত্তাহীনতা ব্যাপকহারে বাড়াইয়া তুলিবে নাগরিকদের যাপিত জীবনের সকল ক্ষেত্রে। কেননা আজকের শিশুরাই ভবিষ্যতের সকল কিছুর কর্ণধার। সন্ত্রাসের পাঠশালায় যেই শিশুরা শিক্ষা লইতেছে তাহারা স্বাভাবিকভাবেই তাহার কর্ণধার হইবে জীবনের প্রয়োজনেই। সুতরাং রাজনৈতিক বা সামাজিকভাবে শিশুদের যেনতেন প্রকারেণ অপব্যবহার আমাদের জন্য আত্মঘাতী হইবে।

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন