লন্ডনে বাস করছি চল্লিশ বছরের বেশি হয়ে গেছে। এতো দীর্ঘকালেও বিদেশি সাংবাদিক মহলে বাংলাদেশ সম্পর্কে বড় ধরনের ঔত্সুক্য কালেভদ্রে ছাড়া কখনো দেখেছি বলে মনে পড়ে না। হালে দেখছি বাংলাদেশ সম্পর্কে শুধু ব্রিটেনে নয়, ইউরোপের বহু দেশেই ঔত্সুক্য বেড়েছে। বিশেষ করে গত ৫ মে’র ঢাকায় শাপলা চত্বরে মৌলবাদী হেফাজতিদের উত্থান এবং তা দমনে হাসিনা সরকারের সাফল্য ইউরোপ-আমেরিকার অনেককেই বিস্মিত করেছে। জঙ্গি মৌলবাদ দমনে আওয়ামী লীগ সরকারের সাফল্যকে তারা প্রকাশ্যেই প্রশংসা করছেন।
আফগানিস্তানে মার্কিন অভিযানের শুরু থেকেই বাংলাদেশেও যে ইসলামি জঙ্গিরা শক্ত ঘাঁটি গাড়ছে সে সম্পর্কে অধিকাংশ পশ্চিমা দেশের সরকারই অবহিত ছিলেন। কোনো কোনো পশ্চিমা মিডিয়া বাংলাদেশকে সতর্কও করেছে। কিন্তু হাসিনা সরকার কতোটা শক্ত হাতে এদের দমন করতে সমর্থ হবেন সে সম্পর্কে পশ্চিমা বিশ্বে সন্দেহ ছিল। বাংলাদেশে আফগানিস্তান ও পাকিস্তানের মতো পরিস্থিতির উদ্ভব ঘটতে পারে বলে তারা শঙ্কিত ছিলেন। ৫ মে’র ঢাকার ঘটনা পশ্চিমা মিডিয়া ও অধিকাংশ সরকারের মন থেকে সেই শঙ্কা ও সন্দেহ অনেকটা দূর করেছে।
ব্রিটেনে ও আমেরিকায় প্রশাসনিক স্তরে একটি শক্তিশালী মহল চান, বাংলাদেশের আগামী নির্বাচনটি যেন যথাসময়ে হয় এবং আওয়ামী লীগ যেন তাতে জয়ী হয়। তাদের আশা, তাহলে বাংলাদেশে জঙ্গিবাদ মাথা চাড়া দিয়ে উঠতে পারবে না এবং এদেশটি নিয়েও তাদের কোনো নতুন ঝুঁকির মধ্যে পড়তে হবে না। বাংলাদেশের জামায়াত একটি ‘মডারেট মুসলিম দল’ এবং বিএনপি’র রাজনীতির একটা শক্তিশালী গণতান্ত্রিক ভিত্তি আছে, এই ইল্যুশন ওবামা প্রশাসনের একটা প্রভাবশালী অংশের মধ্যে এখন অনেক কম।
লন্ডনে বড় বড় সংবাদপত্রের এশিয়ান ডেস্কের অনেক সাংবাদিককে এখন দেখছি দেখা হলেই বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিস্থিতি, সকল দলের অংশগ্রহণে যথাসময়ে সাধারণ নির্বাচনটি অনুষ্ঠিত হবে কিনা, হলে আওয়ামী লীগের জয়ের সম্ভাবনা কতোটুকু তা জানতে চান। ‘দি ইকোনিমিস্টের’ বাংলাদেশ সম্পর্কিত প্রচারণা দ্বারা তারা আগের মতো প্রভাবিত নন। ব্রিটেনসহ সারা ইউরোপে বাংলাদেশের বর্তমান সরকারের বিরুদ্ধে প্রচার-প্রচারণা ও শক্তিশালী লবী সৃষ্টির কাজে জামায়াত যে দু’হাতে অর্থ ঢালছে এবং কোনো কোনো বিগ মিডিয়াতেও অনুপ্রবেশ ঘটাতে সক্ষম হয়েছে এটা এখন লন্ডনে ওপেনসিক্রেট। ফলে শুধু মিডিয়ায় নয়, ব্রিটিশ রাজনৈতিক মহলেও বাংলাদেশ নতুন আগ্রহের সৃষ্টি করেছে।
সাভার ট্রাজেডি, শাহবাগের গণজাগরণ মঞ্চ এবং শাপলা চত্বরে জঙ্গি মৌলবাদীদের ব্যর্থ অভ্যুত্থান চেষ্টা আন্তর্জাতিক মিডিয়ায় বাংলাদেশের উপস্থিতি প্রায় নিয়মিত করে তুলেছে। অনেকেই জানতে চান, অর্থনৈতিক এবং রাজনৈতিক এই দুই বিপর্যয়ই সামাল দিয়ে আওয়ামী লীগ আগামী নির্বাচনে ক্ষমতায় প্রত্যাবর্তন করতে পারবে কিনা! সবচাইতে বড় কথা, বিএনপি জোট নির্বাচনে আসবে কিনা। এলে কি হবে এবং না এলে কি হবে?
প্রশ্নটি বাংলাদেশের মানুষের মনকেও নিরন্তর দোলা দিচ্ছে। আমি একজন সাংবাদিক জেনে দেশি-বিদেশি অনেকেই জানতে চান বাংলাদেশে কি হতে যাচ্ছে? বিএনপি তো অবিরাম বলে চলেছে, তত্ত্বাবধায়ক সরকারের দাবি মানা না হলে তারা শুধু নির্বাচন বর্জন করেই ক্ষান্ত থাকবে না, তারা নির্বাচন হতেও দেবে না। তার অর্থ বল প্রয়োগ, সংঘর্ষ, রক্তপাত। দেশ আরও বড় ধরনের বিপর্যয়ের মুখে পড়বে। আওয়ামী লীগ কি পারবে হেফাজতি তাণ্ডব দমন করার মতো এই বিপর্যয়ও রোধ করতে?
দেশি-বিদেশি সকল প্রশ্নকর্তাকেই বলি, আমি একজন সাংবাদিক। জ্যোতিষী নই। পরিস্থিতি বিশ্লেষণ করতে পারি, কিন্তু কি ঘটবে তা আগাম বলার ক্ষমতা আমার নেই। সাধারণ দৃষ্টিতে মনে হয়, আসন্ন পাঁচটি সিটি কর্পোরেশনের (গাজীপুরসহ) নির্বাচনের ফল হয়তো আমাদের জাতীয় রাজনীতির গতিপথ অনেকটা নির্ধারণ করবে। এই পাঁচটি নির্বাচনের তিনটিতে যদি বিএনপি সমর্থিত প্রার্থী জয়ী হয়, তাহলে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে গঠিত একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের অধীনে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে অংশগ্রহণে বিএনপি হয়তো উত্সাহী হবে।
কিন্তু পরাজিত হলেই বিএনপি’র নেতানেত্রীরা শোরগোল তুলবেন, নির্বাচনে ক্ষমতাসীন দল কারচুপি করেছে। তাদের অধীনে আর কোনো নির্বাচনে অংশ নেওয়া যায় না। আবার আওয়ামী লীগের সমর্থিত প্রার্থীরা যদি পাঁচটির মধ্যে অন্তত তিনটি কেন্দ্রে জয়ী না হয়, তাহলে দলটির মনোবল নষ্ট হবে একথা সত্য, কিন্তু এই পরাজয়ের প্লাস পয়েন্ট হবে নির্বাচনে কারচুপির অভিযোগ আনা বিএনপি’র পক্ষে সহজ হবে না। সাধারণ নির্বাচন বর্জনের কোনো অজুহাত তারা পাবে না এবং আওয়ামী লীগও এই ভেবে তাদের মনোবল ফিরে পেতে পারেন যে, সিটি কর্পোরেশনের নির্বাচনের ফলাফল জাতীয় নির্বাচনে তেমন কোনো প্রভাব ফেলবে না। সাধারণত ফেলে না।
আমি মনে মনে প্রার্থনা করছি, সিটি কর্পোরেশনগুলোর আসন্ন মেয়র নির্বাচনে দুই জোটের কোনো জোটেই যেন একচেটিয়া বিজয় না পায়, বরং দুই জোটের মধ্যে ভারসাম্যমূলক জয়-পরাজয় ঘটে। তাতে বিএনপি বা ১৮ দলীয় জোট (ভবিষ্যতে হয়তো জোটের শরিক দলের সংখ্যা আরও বাড়বে) সাধারণ নির্বাচন বর্জনের সুযোগ ও অজুহাত পাবে না। বরং সকল দলের অংশগ্রহণে দেশে যথাসময়ে শান্তিপূর্ণ একটি সাধারণ নির্বাচনের সম্ভাবনা বাড়বে।
আমার ধারণা, বিএনপি যখন সিটি কর্পোরেশনগুলোর বর্তমান নির্বাচনগুলোতে এসেছে, তখন এই নির্বাচনের ফল দুই জোটের মধ্যে ভারসাম্যমূলক (কোনো এক পক্ষের একচেটিয়া জয় নয়) হলে তারা সাধারণ নির্বাচনে অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের ব্যবস্থাতেই যাবেন। যদি তারা নির্বাচনে অংশ নেন তাহলে তাদের দল বাঁচবে, দেশ বাঁচবে, গণতন্ত্র বাঁচবে এবং দেশে সন্ত্রাস ও অরাজকতা বন্ধ হবে; অরাজক শক্তির মাথা তোলার আশঙ্কা দূর হবে।
তবে একটি শান্তিপূর্ণ, অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন কি ফল প্রসব করবে তা হয়তো আগাম আন্দাজ করা যাবে না। বর্তমান রাজনীতি যদি ভবিষ্যতের পূর্বাভাস দেয়, তাহলে বলা চলে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি কোনো দলই বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে জয়ী হবেন না। নির্বাচনে আসন এমনভাবে বণ্টিত হতে পারে যে, দু’দলকেই সরকার গঠনের প্রয়োজনীয় সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভের জন্য স্বতন্ত্র ও ছোট দলের সদস্যদের সমর্থন সংগ্রহের জন্য হাত বাড়াতে হবে। নির্বাচনটি শান্তিপূর্ণভাবে ও বিনা বাধায় অনুষ্ঠিত হলে একটি কোয়ালিশন সরকারই হয়তো বাংলাদেশের ভাগ্যে নির্ধারিত হয়ে আছে। এক্ষেত্রে আমার প্রার্থনা, এই সরকার যেন আওয়ামী কোয়ালিশন সরকার হয়। তবে গণতান্ত্রিক পন্থায় বিএনপি কোয়ালিশন সরকার (জামায়াত বর্জিত) ক্ষমতায় এলেও আমার আপত্তি নেই।
এখন আমাদের সকলের আশা, প্রত্যাশা, আকাঙ্ক্ষা এবং প্রার্থনা ব্যর্থ করে যদি বিএনপি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক চক্রী মহলের পরামর্শে ৭১-এর যুদ্ধাপরাধীদের বাঁচানোর জন্য জামায়াতের উস্কানিতে নির্বাচনে অংশ না নেয়ার সিদ্ধান্ত নেয় এবং নির্বাচন বানচাল করার ঘোষিত লক্ষ্যে সক্রিয় হয় তাহলে কি ঘটতে পারে? বিএনপি-জামায়াত হরতাল-ধর্মঘটের নামে যে ভাঙচুর, সন্ত্রাস ও অরাজকতা সৃষ্টিতে নামবে তাতে প্রচুর গাড়ি, দোকানপাট ধ্বংস হবে; জনজীবনে নিরাপত্তা বিঘ্নিত হবে এবং নাগরিক জীবনে অচলাবস্থা সৃষ্টি হবে। দেশ অর্থনৈতিক সঙ্কটের দিকে দ্রুত এগুবে। বিদেশি লগ্নিকারকেরা বাংলাদেশ ছেড়ে দ্রুত পালাবে।
এরপর সরকার (আওয়ামী লীগ অথবা অন্তর্বর্তীকালীন যে সরকারই তখন ক্ষমতায় থাকুক) শক্তি প্রয়োগে পরিস্থিতি মোকাবিলা করার জন্য এগুলে রক্তক্ষয় ও গৃহযুদ্ধ অনিবার্য হয়ে উঠবে। এই যুদ্ধে বিএনপি-জামায়াত কি জয়ী হবে? সাম্প্রতিক ইতিহাস ও অভিজ্ঞতা তা বলে না। সামরিক বাহিনী অভ্যুত্থান ঘটাবে সে সম্ভাবনা ক্ষীণ। বেগম খালেদা জিয়া সামরিক বাহিনীকে সম্প্রতি সেই উস্কানি দিয়ে সফল হননি। পশ্চিমা অভিভাবকদের সমর্থন ও সহায়তায় সুশীল সমাজ এগিয়ে এসে কিছু একটা করবেন তেমন সাহস ও জনসমর্থন তাদের নেই।
সম্ভাব্য যেটা ঘটতে পারে, হাসিনা সরকার আরো কঠোর হবেন। জামায়াত নিষিদ্ধ হবে। জঙ্গি মৌলবাদীদের উপর ক্রাক ডাউন হবে। বিএনপি গ্রেফতার ও মামলার ভয়ে আবার মাঠ ছেড়ে পালাবে। চাই কি দলটি বিভক্ত হয়ে যেতে পারে। এতোকিছু করার পরেও আওয়ামী লীগ যদি ক্ষমতায় থাকতে না পারে, তাহলেও বিএনপির কোনো লাভ নেই। দেশে যদি বড় ধরনের অরাজকতার সুযোগে কোনো তৃতীয় শক্তি মাথা তোলে, তাতে বিএনপি’র কোনো সুবিধা হবে না। শেখ হাসিনা ক্ষমতা হারালেও তিনি এবং তার দল বাংলার মাটিতে টিকে থাকবেন। কিন্তু বেগম জিয়া এক এগারোর সময় রিয়াদ-যাত্রা থেকে বেঁচে গেলেও এবার তা থেকে আত্মরক্ষা করতে পারবেন সে সম্ভাবনা খুব কম। নির্বাচনে না গেলে বেগম জিয়ার নেতৃত্ব এবং তার দলের অস্তিত্ব কোনোটাই রক্ষা পাবে না।
\ লন্ডন ৭ জুন শুক্রবার, ২০১৩ \
