গত বৃহস্পতিবার সংসদে আসছে বছরের বাজেট প্রস্তাবনা পেশ করা হয়েছে। আগে থেকেই শুরু হওয়া বাজেট নিয়ে নানা ধরনের আলোচনা গত তিন দিন ধরে আরো জমজমাট হয়ে উঠেছে। চতুর্দিকে এখন গরমাগরম আলোচনা-পর্যালোচনা-বিশ্লেষণের প্রধান বিষয় হলো সদ্য পেশকৃত এই বাজেট। এবার (এবং প্রতিবারই) বাজেট নিয়ে যে পরিমাণ হৈ চৈ হয়, দেশের অর্থনৈতিক-সামাজিক-রাজনৈতিক বাস্তবতার প্রেক্ষাপটে সরকারের বাত্সরিক বাজেট কি প্রকৃতই ততোটা গুরুত্ব ও তাত্পর্য দাবি করতে পারে? এই প্রশ্নের জবাব নির্ভর করে বাজেটের মৌলিক চরিত্র ও দার্শনিক বৈশিষ্ট্য কি, তার ওপর। দেশের বিদ্যমান আর্থ-সামাজিক কাঠামোগত বাস্তবতার ক্ষেত্রে ‘স্থিতাবস্থা’ বজায় রাখাটাই যদি বাজেটের মূল চরিত্র ও দার্শনিক ভিত্তি হয়, তাহলে সেই বাজেট ‘গতানুগতিক’ বলে আখ্যায়িত হওয়াটাই যুক্তিসংগত এবং সেরূপ বাজেটের তাত্পর্য সামান্যই। কিন্তু বাজেটের চরিত্র ও উদ্দেশ্য যদি হয় প্রচলিত আর্থ-সামাজিক বাস্তবতাকে মৌলিকভাবে রূপান্তর করা, তাহলে সেই বাজেট নিয়ে হৈ চৈ করাটা যুক্তিসংগত বৈকি। বাজেটের এই মৌলিক চরিত্রগত বৈশিষ্ট্যের দিকে আগে দৃষ্টি না দিয়ে ‘স্থিতাবস্থা’ রক্ষায় প্রণীত একটি ‘গতানুগতিক’ বাজেট নিয়ে হৈ হৈ-রৈ রৈ কাণ্ড বাঁধিয়ে দেয়াটা কেবল একটি অবুঝ ছেলেমানুষী ব্যাপারই নয়, তা একটি সুচতুর গণপ্রতারণার পরিকল্পিত কৌশলও বটে।
একটি দেশের জাতীয় বাজেট হলো পরবর্তী অর্থ বছরের জন্য (জুলাই মাস থেকে পরবর্তী জুন মাস পর্যন্ত) রাষ্ট্রের (তথা সরকারের) আয় ও ব্যয়ের পরিকল্পিত হিসাবের আনুষ্ঠানিক বিবরণী। একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে নির্বাচিত সংসদই কেবল জাতীয় বাজেট প্রণয়নের (ও সেই ভিত্তিতে তার বাস্তবায়নের) ক্ষমতা রাখে। সরকারের পক্ষ থেকে অর্থমন্ত্রীকে সংসদে বাজেট সম্পর্কে প্রস্তাব উত্থাপন করতে হয়। সেই বাজেট প্রস্তাব নিয়ে সংসদে আলোচনা হয়। প্রস্তাবিত আয় ও ব্যয় সম্পর্কিত প্রতিটি প্রস্তাব পৃথক পৃথক ভাবে সংসদ কর্তৃক অনুমোদিত হতে হয়। অধিকাংশ সাংসদের মতামতের ভিত্তিতে নির্দিষ্ট এক বা একাধিক প্রস্তাব, কোনো সংশোধনী ব্যতিরেকেই কিম্বা প্রয়োজনমতো সংশোধন করে অনুমোদন করা হয়। তারপর, সেসব সংশোধনীসহ সমগ্র বাজেট সংসদের সংখ্যাগরিষ্ঠ মতামতের ভিত্তিতে চূড়ান্তভাবে পাস করা হয়। তখন তা রাষ্ট্র ও সরকারের জন্য অনুসরণীয় আইনে পরিণত হয়। এই বাজেট অনুসরণ করে পরবর্তী অর্থ বছরে সরকার কর, শুল্ক, লেভি ইত্যাদি সংগ্রহ করার এবং নির্দিষ্ট খাতগুলোতে খরচের জন্য অর্থ-বরাদ্দ করার আইনগত অধিকার লাভ করে।
বাজেটে যদি আয়ের চেয়ে ব্যয়ের পরিমাণ বেশি হয় তাহলে সেটিকে ঘাটতি বাজেট বলা হয়ে থাকে। সে ক্ষেত্রে ঘাটতি পূরণের জন্য আভ্যন্তরীণ ঋণ, বিদেশি ঋণসাহায্য ইত্যাদি গ্রহণসহ কী ব্যবস্থা নেয়া হবে, সে পরিকল্পনাও বাজেটে উল্লেখ থাকতে হয়। আবার ঘাটতি বাজেটের বদলে কখনো কখনো উদ্বৃত্ত বাজেট (যেখানে আয়ের চেয়ে ব্যয় কম) প্রণীত হয়ে থাকে। বাজেটে যদি আয় ও ব্যয় সমান হয় তাহলে তাকে ব্যালেন্সড বাজেট বলা হয়। ঘাটতি, উদ্বৃত্ত বা ব্যালেন্সড—যে ধরনের বাজেটই প্রণীত হোক না কেন, তাতে মোট জমা ও মোট খরচের পরিমাণ সমান সমান হতে হয়। বাজেটে জমা-খরচের হিসাব মিলাতেই হবে। এদিক থেকে (অর্থাত্ টেকনিকাল দিক থেকে) বিবেচনা করলে বাজেট হলো ক্রেডিট ও ডেবিটের হিসাব মিলানোর একটি কসরত্। একটি ‘একাউনটেন্সির’ কাজ। আর্থ-সামাজিক বাস্তবতায় স্থিতাবস্থা টিকিয়ে রাখাই যদিবা বাজেটের চরিত্র এবং দার্শনিক ভিত্তি হয়, তাহলে বাজেট প্রণয়নের প্রক্রিয়া প্রধানতঃ একটি ‘একাউনটেন্সির’ হিসাব মিলানোর কাজে পরিণত হওয়াটাই স্বাভাবিক।
আমাদের দেশে বছর বছর বাজেট প্রণয়নের কাজটি মূলতঃ ‘একাউনটেন্সির’ দৃষ্টিকোণ থেকেই করা হয়ে থাকে। নতুন কোনো দর্শন, নীতি, প্রেক্ষিত ইত্যাদিকে প্রথমে স্থির করে নিয়ে সেসবের ভিত্তিতে সার্বিকভাবে গোটা বাজেট রচনা করার প্রয়োজন হয় না। কারণ আর্থ-সামাজিক দিকদর্শন বছরের পর বছর অপরিবর্তিত রাখা হয়, তাই তার পুরানো কাঠামো বদলানোর প্রয়োজন হয় না। পুরানো বাজেটের এখানে একটু পরিমাণ বাড়িয়ে, ওখানে একটু কমিয়ে, পুরানো কিছু বাদ দিয়ে, নতুন কিছু যোগ দিয়ে, জমা-খরচের হিসাব মিলিয়ে দিতে পারলেই বাজেট প্রণয়নের কাজ শেষ। কমপিউটারে ‘কাট এন্ড পেস্ট’ করে নতুন লেখা তৈরির মতো ব্যাপার। অনেকটাই নতুন বোতলে সামান্য স্বাদ বদল করা পুরানো মদ ঢেলে কথার চমক দেয়া আবরণে পরিবেশন করার মতো। দক্ষ আমলাদের হাতেই মূলত গোটা কাজটি সম্পাদিত হয়। এরকমই চলছে বছরের পর বছর।
বাজেটে যেভাবে আয়-ব্যয়ের হিসাব ঠিক করা হয়ে থাকে, বাস্তবায়ন করতে গিয়ে তার সবটা ষোল আনা ঠিক থাকে না। সে কারণে নতুন বছরের বাজেট পেশ করার সময় পূর্বতন বছরের সংশোধিত বাজেট পেশ করার প্রয়োজনীয়তার উদ্ভব ঘটে। সংসদে নতুন অর্থ বছরের বাজেট অনুমোদনের আগে পূর্বতন অর্থ-বছরের জন্য সংশোধিত বাজেট পাশ করিয়ে নিতে হয়। যে বাজেট অর্থ বছরের শুরুতে প্রণীত হয়েছিল, তা থেকে সংশোধিত বাজেটের তারতম্যে বহুলাংশেই সরকারের দুর্বল বাস্তবায়ন ক্ষমতা অথবা বাজেট প্রণয়নে তার গাফিলতি-অদক্ষতা-খামখেয়ালীপনার নিদর্শন বলে বিবেচিত হয়ে থাকে। এ ক্ষেত্রে এমন হওয়াটাকে একদিকে জনগণকে বা বিশেষ মহলকে তুষ্ট করার জন্য অবাস্তব প্রস্তাব দিয়ে সরকারের ‘সুন্দর’ বাজেট পেশ করার চাতুরিপূর্ণ কৌশল, কিম্বা বাস্তবায়ন করার প্রক্রিয়ায় বিভিন্ন স্বার্থ গোষ্ঠীর লবিং-এর কাছে সরকারের নতি স্বীকার করাটাকেই অন্যতম একটি কারণ হিসাবে বিবেচিত হয়ে থাকে।
বাজেটের চরিত্র-দর্শন বদল না করেও শুধু একউনটেন্সির দৃষ্টিভঙ্গী থেকে নতুন বাজেট রচিত হলেও, প্রতি বছর এখানে-ওখানে কিছু পরিবর্তন করাটা অপরিহার্য হয়ে ওঠে। অন্যথায়, বছর বছর একই বাজেটের কার্বন কপি পেশ করলে ‘নতুন বাজেট’ রূপে পরিচয় দেয়ার যৌক্তিকতা একেবারেই থাকে না। কিছু কিছু ক্ষেত্রে এসব ওপর ভাসা পরিবর্তন করা হয় বিগত বছরের অভিজ্ঞতার আলোকে। আবার তার অনেকটাই করা হয় বিভিন্ন স্বার্থ সংশ্লিষ্ট লবিকে সন্তুষ্ট করার জন্য। লুটেরা শাসক গোষ্ঠীর বিভিন্ন অংশ তাদের নিজের নিজের স্বার্থকে আরো সুরক্ষার জন্য বাজেটের এসব প্রান্তিকী পরিবর্তনের জন্য আগে থেকেই তোড়জোড় শুরু করে দেয়। বিভিন্ন ‘চেম্বার’ ও ধনীক গোষ্ঠীর সমিতি-সংগঠন জোর তদবির চালায়। অর্থমন্ত্রী সবাইকে সময় দেন। কিন্তু দেশের খেটেখাওয়া পনেরো আনা মানুষের কথা শোনার সময় তার কখনোই হয় না। কারণ, তারা হলো বাজেটের স্রেফ ‘অবজেক্ট’ ‘সাবজেক্ট’ নয়। আর সময় হলেও সে পথ মাড়ানো তার পক্ষে সম্ভব নয়। লুটেরা চোর-ডাকাতের স্বার্থ রক্ষা করতে হলে গৃহস্থের আবেদনে কান দিলে কি চলবে?
আমাদের দেশের জিডিপির পরিমাণ, যা অর্থমন্ত্রীর অনুমান অনুসারে কালো টাকার পরিমাণ, তার ৮০ শতাংশের সমান হওয়াটা অসম্ভব নয়। অর্থাত্, দেশে কালো টাকার পরিমাণ নয় লক্ষ কোটি টাকারও বেশি হতে পারে। এবার যে বাজেট পেশ করা হয়েছে তা প্রায় সোয়া দুই লক্ষ কোটি টাকার বিশাল পরিমাণের হলেও, তা জিডিপির ২০ শতাংশের কম। অর্থাত্ সরকারের আর্থিক সামর্থ্য কালো টাকার আর্থিক ক্ষমতার মাত্র এক-চতুর্থাংশ। কালো টাকার প্রায় সবটাই রয়েছে লুটেরা ধনিকের হাতে। তাছাড়া দৃশ্যমান জিডিপির সিংহভাগ (ধরে নিলাম তার ৭৫ শতাংশ) সম্পদ রয়েছে মুষ্টিমেয় লুটেরা বিত্তবানের হাতে। তাহলে বলা যায় যে, দেশের অর্থনীতির একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণ রয়েছে কালো টাকার মালিক ও লুটেরা বিত্তবানদের হাতে। জিডিপি বহির্ভূত ৮০ শতাংশের সাথে জিডিপির ৭৫ শতাংশ যোগ হয়ে সেই অর্থ-সম্পদের পরিমাণটা বিশাল। এই আর্থিক শক্তির তুলনায় এবারের ‘বিশাল’ বাজেট মাত্র ১০.১২ শতাংশ পরিমাণের। এই হিসাব থেকেই বোঝা যায় যে, দেশের গোটা অর্থনীতির হাল-চাল নিয়ন্ত্রণের ক্ষমতা জাতীয় বাজেটের খুব বেশি নয়। নিয়ন্ত্রণ ক্ষমতা এখন চলে গেছে একচ্ছত্রভাবে কালো টাকার মালিক ও লুটেরা বিত্তবানদের হাতে।
এবারের বাজেটের আয়তন বিশাল হলেও তার ভেতরটায় রয়েছে একটি বড় ফাঁপা উপাদান। বাজেটের ২০ শতাংশের বেশি অর্থ ঘাটতি হিসাবে প্রদর্শিত হয়েছে। ঋণ নিয়ে এই ঘাটতি মেটানো হবে বলে বলা হয়েছে। এর পরিকল্পিত সুফল প্রকৃতই অর্জিত হবে কিনা তা নিয়ে সন্দেহ থাকলেও, এই ঋণের টাকা ফেরত দেয়ার বাধ্যবাধকতা যে পরবর্তী বছরগুলোর বাজেটকে বহন করতে হবে সে বিষয়ে কোনো সন্দেহ নেই। এবারের বাজেটেই ঋণ পরিশোধের জন্য বরাদ্দ রাখা হচ্ছে বাজেটের ১২ শতাংশের বেশি অর্থ, যা কিনা প্রাক্কলিত রাজস্ব আয়ের প্রায় ২০ শতাংশ। ঋণ শোধের জন্য প্রয়োজনীয় অর্থের পরিমাণ যদি এভাবে বছর-বছর বাড়তে থাকে, তাহলে তা অর্থনীতির বিকাশকে সংকটগ্রস্ত করে তুলবে। প্রবৃদ্ধির হার বৃদ্ধির বদলে তা জাতীয় ঋণভারকে ক্রমাগত স্ফীত করতে থাকবে। প্রবৃদ্ধির বড় অংশ ক্রমাগত উজাড় হতে থাকবে দেশি-বিদেশি ঋণদাতা ‘মহাজনদের’ সুদ পরিশোধ করতে। ঋণ পরিশোধের জন্য তখন আরো ঋণ নিতে হবে। দেশ স্থায়ীভাবে আটকা পড়ে যাবে ঋণের দুর্ভেদ্য বন্ধনে।
এবারের বাজেটে অনুন্নয়ন খাতে যে বরাদ্দ রাখা হয়েছে (১ লাখ ৫৬ হাজার কোটি টাকার কিছু বেশি) তার অর্থ জোগান দিতে প্রাক্কলিত রাজস্ব আয়ের (১ লাখ ৬৭ হাজার কোটি টাকার কিছু বেশি) প্রায় সবটাই উজাড় হয়ে যাবে। হাতে থাকবে মাত্র ১১ হাজার কোটি টাকার মতো, যা দিয়ে প্রায় ৬৬ হাজার কোটি টাকার উন্নয়ন ব্যয় মেটাতে হবে। প্রধানতঃ বিভিন্ন সূত্র থেকে ঋণ নিয়ে অতিরিক্ত ৫৫ হাজার কোটি টাকা জোগাড় করানো হবে বলে বলা হয়েছে। এদিকে, অবস্থা এমন দাঁড়িয়েছে যে, অনুন্নয়ন খাতে ব্যয়ের পরিমাণের তুলনায় উন্নয়ন খাতে ব্যয় মাত্র ৪০ শতাংশে নেমে এসেছে। উপরন্তু সেজন্য অর্থ সংস্থানের বিষয়টিও অনেকটাই অনিশ্চিত করে রাখা হয়েছে। এমন পরিস্থিতিতে ৭.২ শতাংশের যে প্রবৃদ্ধির হার প্রাক্কলিত করা হয়েছে, তার বাস্তবায়ন সম্ভাব্যতা যোগ্যতা সম্পর্কে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক। গত বছর বাজেটে প্রবৃদ্ধি ৭.২ শতাংশ হবে বলে বলা হলেও অর্থমন্ত্রীর হিসাব অনুসারে তা বাস্তবে ৬.২ শতাংশের মাত্রা ছাড়াতে পারেনি। এমতাবস্থায় এবার পুনরায় তার ৭.২ শতাংশ প্রবৃদ্ধির হিসাবের সাথে একমত হওয়াটা কষ্টকর বৈ কি!
তথাপি কেন একটি অনর্জনযোগ্য প্রবৃদ্ধির হার ঘোষণা করে, বিশাল আকারের অনুন্নয়ন খাতে ব্যয় বরাদ্দ রেখে এবং উন্নয়ন ব্যয়ের প্রায় সবটাই ঋণ করে সংগ্রহ করার পরিকল্পনা নিয়ে রেকর্ড পরিমাণ ঘাটতিসহ এ ধরনের বাজেট পেশ করা হলো? প্রায় সবাই একমত যে, সামনে নির্বাচন থাকায় এমনটি করা হয়েছে। এটাকে ‘জনতুষ্ঠির নির্বাচনী বাজেট’ বলে আখ্যায়িত করা হচ্ছে। সাধারণ মানুষের প্রকৃত কল্যাণ না হলেও লোক দেখানো চটকদার অনেক ব্যবস্থার কথা বলে মানুষের (ভোটারদের) সামনে নগদ প্রাপ্তির মুলা ঝুলানো হয়েছে। বিষয়টি স্পষ্টতই টাকা দিয়ে ভোট কেনার একটি খোলামেলা প্রয়াস। নির্বাচনী তফসিল ঘোষণার পর এ ধরনের পদক্ষেপ নির্বাচন বিধিতে নিষিদ্ধ রয়েছে। তফসিল ঘোষণার যে কাজটি (টাকার প্রলোভন দ্বারা ভোট কেনার প্রচেষ্টা) যদি অপরাধ হয় তাহলে তফসিল ঘোষণার মাত্র ৪ মাস আগে (জুলাই মাসে বাজেট কার্যকর হবে এবং ২৫ অক্টোবর সংসদ ভেঙ্গে দেয়া হবে) সেই কাজটি করা হলে তা কি নৈতিকভাবে অগ্রহণযোগ্য ও নির্বাচন বিধির বরখেলাপ নয়?
বাজেটের বিশাল ঘাটতি পূরণ করতে ব্যাংকসহ বিভিন্ন আভ্যন্তরীণ ও বৈদেশিক উত্স থেকে যে ঋণ নিতে হবে তাতে একদিকে মূল্যস্ফীতির হার বাড়বে। মানুষের দৈনন্দিন জীবনে তা গভীর সংকটের জন্ম দিবে। জনতুষ্ঠির দাওয়াই শেষ পর্যন্ত ব্যাক-ফায়ার করে তা যে জনঅসন্তোষের জন্ম দিবে না—তা কে বলতে পারে? অন্যদিকে ব্যাংক ঋণের টাকায় খোদ সরকারই যদি বড় করে হাত দেয় তাহলে বিনিয়োগের জন্য ব্যক্তিঋণের পরিমাণ কমে যাবে এবং ব্যাংকঋণের সুদের হার ঊর্ধ্বমুখী হবে। এর ফলে বিনিয়োগের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে। প্রবৃদ্ধির প্রাক্কলিত হার অর্জন আরো অসম্ভব হয়ে উঠবে। সবচেয়ে যা বিপজ্জনক তা হলো এর ফলে মূল্যস্ফীতির হার বেড়ে যাবে। এর সবটা ধাক্কা এসে পড়বে সাধারণ গরিব-মধ্যবিত্ত মানুষের ওপর।
অর্থমন্ত্রী ঘাটতি বাজেট পেশ করে সেই ঘাটতি মেটানোর একটি পথ হয়তো দেখিয়েছেন। তিনি ঋণ নিয়ে জমা-খরচে হিসেব মিলিয়ে দিয়েছেন। কিন্তু সাধারণ মানুষ তাদের সংসারের আয়-ব্যয়ের ঘাটতি মেটাবেন কিভাবে, তার ফর্মুলা অর্থমন্ত্রী দেননি। এটা দেয়ার প্রয়োজন তার কাছে নেই। কারণ বাজেট তো জনগণের জন্য নয়, তা রাষ্ট্র ও সরকারের বাজেট। এবং রাষ্ট্র ও সরকার হলো দেশি-বিদেশি লুটেরা ধনিকদের। তাদের স্বার্থের রক্ষক হয়ে ক্ষমতায় থাকতে পারলেই হলো। জনগণের সংসারের বাজেট যদি সে কারণে নিরন্তন ঘাটতির অন্ধকারে ডুবে থাকে, এ ধরনের সরকারের তাতে কি আসে যায়!
লেখক : সভাপতি, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি
E-mail : [email protected]
