পার্বত্য অঞ্চলের লামা উপজেলায় ২০ হাজার পরিবারের বসবাস, তন্মধ্যে ভৌগোলিক অবস্থানগত কারণে ২০ শতাংশ মানুষ ৮ শত হইতে ১৫ শত ফুট উঁচু পাহাড়ের চূড়া, পাদদেশে কিংবা উহার কোল ঘেঁষিয়া বাস করে। গত শনিবার একটি দৈনিকে প্রকাশিত এই বিষয়ক এক প্রতিবেদনে বলা হইয়াছে যে, ঐ স্থানে ৪ হাজার পরিবারের প্রায় ২০ সহস্র মানুষ বর্তমানে পাহাড় ধসে মৃত্যুঝুঁকিতে বসবাস করিতেছে। বলাই বাহুল্য যে, ইহাদের সকলেই দরিদ্র জনগোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত। ঐ স্থানের বিভিন্ন পাহাড়ি অঞ্চলে সরকারের তরফ হইতে বরাদ্দ পাওয়া জমিতে চাষাবাদ করিয়াই তাহারা জীবিকা নির্বাহ করে এবং ঐ খানেই মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে বসবাস করে। ইতোপূর্বে বেশ কয়েকবার ভয়াবহ পাহাড় ধসে বহু মানুষের অকাল ও মর্মান্তিক মৃত্যু হইলেও এ বিষয়ে অর্থবহ কোনকিছুই কেহ করিতেছে না। অবশ্যি দরিদ্র মানুষদের পক্ষে অন্যত্র যাইয়া বসতভিটা গড়িয়া তোলা সহজ কথা নহে। ফলে মৃত্যুর ঝুঁকি জানিয়াও তাহারা একরূপ বাধ্য হইয়াই এইভাবে বসবাস করিয়া থাকে। কিন্তু সীমিত সম্পদের এই দেশে সবকিছুই সরকার করিবে এমন মানসিকতা পোষণ করাটাও তো ঠিক নহে। কেননা, পাহাড়ে বসবাসরত পরিবারগুলিকে বা দেশের অন্যত্র ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশে বসবাসরতদের পুনর্বাসন করিতে হইলে যে বিপুল পরিমাণ সম্পদের প্রয়োজন উহা জোগাড় করা সম্ভব কিরূপে। ফলে কর্তৃপক্ষকে বর্ষাবাদলে বা ঝড়-ঝঞ্ঝাকালে জনসাধারণের জন্য মাইক যোগে সতর্কবার্তা প্রচার করা ছাড়া তেমন উল্লেখযোগ্য কোনকিছু করিতে দেখা যায় না। অবশ্যি ঝড়-বাদলের ক্ষেত্রে আগাম আভাস পাওয়া গেলেও ভূমিকম্পের ক্ষেত্রে তেমন আভাস পাইবার কোনই ব্যবস্থা নাই। ফলে ঝড়-ঝঞ্ঝাকালে আগাম সতর্কবার্তা অনেক ক্ষেত্রে মানুষের জীবন বাঁচাইতে কাজে লাগিলেও ভূমিকম্প বা আকস্মিক পাহাড় ধসের ক্ষেত্রে ঝুঁকি এড়াইবার কোন উপায়ই থাকে না।
এমতাবস্থায় সম্পদের সীমাবদ্ধতার কারণে প্রাকৃতিক দুর্যোককালে হতভাগ্য পরিবারগুলির জানমাল রক্ষার কার্যকর ব্যবস্থা যেহেতু গ্রহণ করা সহজ নহে সেহেতু এই ক্ষেত্রে জনসাধারণেরই অধিক সতর্ক ও সচেতন থাকার কোন বিকল্প নাই। ঝুঁকিপূর্ণ পরিবেশ বা স্থানে বসবাসের ব্যাপারে তাহাদেরকে সর্বক্ষণ সজাগ থাকিতে হইবে বৈকি। পাশাপাশি সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষও এইসব ব্যাপারে স্থানীয়ভাবে সম্পদ সৃষ্টির জন্য প্রণোদনা ও উত্সাহ জোগাইয়া কিংবা কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করিয়া ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় বসবাসরতদেরকে পর্যায়ক্রমে অন্যত্র সরাইয়া লওয়ার উদ্যোগ লইতে পারেন নিশ্চয়ই।
তবে এই সকল পাহাড় কেন এত ঝুঁকিপূর্ণ হইয়া উঠিতেছে উহাও নির্ণয় করাটা জরুরি। অবাধে পাহাড় হইতে বৃক্ষ নিধন, পাথর উত্তোলন, পাহাড়িদের জুম চাষ, পাহাড় কাটিয়া ইটভাটা স্থাপন এবং অপরিকল্পতিভাবে বসতি নির্মাণ পাহাড় ধসের অন্যতম কারণ। কেননা, উল্লেখিত কারণে পাহাড়গুলি ভারসাম্যহীন হইয়া পড়িতেছে এবং যখন-তখন সেখানে ধস নামিতেছে। ভারি বর্ষণ হইলেই এইসব কারণে নাজুক অবস্থায় থাকা পাহাড়গুলির মাটি আকস্মিকভাবে বানের পানির মতো নিচের বা পাশের দিকে ধাইয়া আসে। মোদ্দাকথা, তখন পাহাড়ের পাদদেশে বা উহার কোল ঘেঁষিয়া বসবাসরত পরিবারগুলির উপর যেন কেয়ামত নামিয়া আসে। পাহাড় বা প্রাকৃতিক ভারসাম্যকে আমরা মানুষেরা নিজেদের উদগ্র লালসা চরিতার্থ করিতে যাইয়া এমনভাবে ধ্বংস করিয়াছি ও করিতেছি যে, প্রকৃতি স্বয়ং যেন এখন উহার প্রতিশোধ লইতে শুরু করিয়াছে। পাহাড়ি নদী খাল জঙ্গল তৃণপ্রান্তর এই সকল প্রাকৃতিক সম্পদের প্রতি আমাদের হিংস্রতা পরিহার করিতে হইবে, না হইলে প্রকৃতি উহার নিজস্ব নিয়মেই প্রতিশোধ গ্রহণ করিবে নিশ্চয়ই। উহাই বুঝিবা ঘটিতেছে সর্বত্র!
