দেশের প্রায় দেড় কোটির অধিক মত্স্যজীবী রহিয়াছেন, যাহাদের জীবন ও জীবিকার মানোন্নয়নের লক্ষ্যে নিবন্ধন ও পরিচয়পত্র প্রদানের সিদ্ধান্ত সরকার আরো এক বত্সর পূর্বে গ্রহণ করিয়াছিল। জাতীয় পরিচয়পত্রের বাহিরে জেলেদের একটি পূর্ণাঙ্গ ‘ডাটা বেইজ’ তৈরি করা হইবে, যাহাতে ছবি ও প্রয়োজনীয় তথ্য অন্তর্ভুক্ত থাকিবে। মত্স্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রণালয় জানাইয়াছে, জুলাই মাসের ২ তারিখে জাতীয় মত্স্য সপ্তাহ উদ্যাপনের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে কিছু জেলের হাতে পরিচয়পত্র তুলিয়া দিবেন প্রধানমন্ত্রী।
দেশে প্রকৃত জেলেদের নিবন্ধিত কোনো তালিকা না থাকিবার কারণে প্রকৃত জেলেদের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নের কার্যক্রম প্রণয়নে প্রতিবন্ধকতা দেখা দেয় পদে পদে। প্রায়শই প্রকৃত জেলেদের তালিকা বা স্বীকৃতি না থাকায় জেলেদের নাম ব্যবহার করিয়া অমত্স্যজীবীরা বিভিন্ন প্রকার সুবিধা ভোগ করিয়া থাকে। তিন বত্সর মেয়াদি এ প্রকল্পটির লক্ষ্য-উদ্দেশ্য হইল দেশের প্রকৃত সকল জেলের (সম্ভাব্য ১৫ থেকে ২০ লাখ) শনাক্তের পর নিবন্ধন পরবর্তী পরিচয়পত্র প্রদান, ডাটাবেজ তৈরি এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগসহ বিভিন্ন দুর্ঘটনায় নিহত (৩০ হাজার টাকা করিয়া) জেলে পরিবারকে আর্থিক সহায়তা প্রদান করা। এই বত্সর ২ লাখ ১৫ হাজার জেলের তালিকা প্রস্তুত করা হইয়াছে। প্রকল্পটির কার্যক্রম দেশব্যাপী এবং তাহা সব উপজেলায় পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়ন হইবে।
প্রকল্পটির উদ্দেশ্য লইয়া আমাদের কোনো প্রশ্ন নাই। প্রশ্ন রহিয়াছে ইহার সুষ্ঠু ব্যবস্থাপনা লইয়া। যেই সুযোগ-সুবিধার উদ্দেশ্যে মত্স্যজীবীদের নিবন্ধিত করা হইতেছে তাহাতে অমত্স্যজীবীদের বেনোজল প্রবেশের পরিমাণ বৃদ্ধি পাইলে প্রকল্পের সার্থকতা ম্লান হইবে নি:সন্দেহে। আমাদের মোট দেশজ উত্পাদনে মত্সজীবীদের অবদান প্রায় সাড়ে চার শতাংশ। কৃষিজ আয়ের দিক হইতে তাহা ২২ শতাংশের বেশি। সুতরাং স্পষ্টতই বাংলাদেশের অর্থনৈতিক ও সামাজিক অবস্থার উন্নয়নে মত্স্যসম্পদ গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখিয়া আসিতেছে। মত্স্য অধিদপ্তরের তথ্যানুযায়ী প্রায় ১৩ লাখ মত্স্যজীবী সম্পূর্ণ মত্স্য আহরণের মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করিয়া থাকে। ইহার ভিতরে পৌনে আট লাখ জেলে দেশের অভ্যন্তরীণ জলাশয় হইতে এবং প্রায় ৫ লাখের অধিক জেলে সামুদ্রিক ও উপকূলীয় জলাশয় হইতে মত্স্য আহরণ করিয়া থাকে। এই ক্ষেত্রে আমরা প্রায়শই অনিয়ম ও দুর্নীতির চিত্র দেখিতে পাই দেশের অভ্যন্তরীণ জলাশয়ের জলমহালগুলির ইজারা লইয়া।
পরিতাপের বিষয় হইল, ‘জাল যাহার জলা তাহার’ প্রবাদখানি এখন অমত্স্যজীবী প্রভাবশালীদের নিকট কুক্ষিগত হইয়া গিয়াছে। তাই অভ্যন্তরীণ জলাশয়ের জলমহালগুলোর ইজারা প্রদান শুধুমাত্র মত্স্যজীবীদের জন্য প্রযোজ্য হইলেও তাহার ব্যতিক্রমই ক্রমশ নিয়ম হইয়া গিয়াছে। অন্যদিকে দেশের প্রকৃত মত্স্যজীবীদের অধিকাংশের এখন আর নিজস্ব নৌকা এবং জাল নাই। ফলে তাহারা পরিণত হইয়াছে নিম্ন-মজুরির শ্রমিকে। তাহাছাড়া অনেকে মহাজনদের নিকট হইতে উচ্চ সুদে জাল ও নৌকা ভাড়া করিয়া মত্স্য আহরণ করে। উপকূলীয় জেলেরা দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়াতে প্রায়ই নৌকা-জাল ও অন্যান্য মত্স্য আহরণের উপকরণ হারাইয়া ফেলে। ইহাতে তাহারা নিঃস্ব হইতে নিঃস্ব-সীমারও নিচে চলিয়া যায়। মৃত্যুও তাহাদের ভিতরে নিত্যঘটনা।
সুতরাং প্রকৃত মত্স্যজীবীদের সার্বিকভাবে রক্ষার্থে এই নিবন্ধন ও পরিচয়পত্র প্রদানের গুরুত্ব অপরিসীম। এইখানে শুধু দেখিবার যে, প্রভাবশালীদের প্রতাপে এই তালিকায় প্রকৃত মত্স্যজীবীরা যেন কোণঠাসা হইয়া না যান।
