আপনদর্পণ

পাখির কাছে ফুলের কাছে

আপডেট : ০৯ জুন ২০১৩, ২১:৩৭
কবিবর কবে কোন বিস্মৃত বরষে কোন পুণ্য আষাঢ়ের প্রথম দিবসে লিখেছিলেন মেঘদূত মেঘমন্দ্র শ্লোক বিশ্বের বিরহী যত সকলের শোক রাখিয়াছ আপন আঁধারে স্তরে স্তরে সঘন সংগীত মাঝে পুঞ্জীভূত করে কালিদাসের কালে মেঘকে দূত করে বারতা পৌঁছে যেতো অলকাপুরীতে কবি প্রিয়ার কাছে। সে দিন আর নেই, কালিদাস নেই, মেঘদূত নেই, রামগিরি পর্বতে অপেক্ষমাণ যক্ষরাজ নেই। তবু আছে অগণিত হূদয় যাদের কাছে মেঘ আসে বৃষ্টির নূপুর বাজিয়ে, তাদের মনে মাদল বাজে, বাজে বাঁশের বাঁশীর সুর, তারা নব বর্ষায় অবগাহন করেন রাজপথে নেমে। আমি তাদেরই একজন, এক সামান্য মানুষ, যার কাছে বৃষ্টি মানেই বাঁধনহারা দিন, কর্তব্য ভুলে যাওয়া মন, যার হূদয় ময়ূরীর মতো নৃত্য করে আকাশে কালোমেঘ ঘনালেই। ছয়টি ঋতু নানা সাজে সাজানোর চেষ্টা করে বাংলার প্রকৃতিকে তাদের আপন আপন বৈশিষ্ট্য নিয়ে। সবগুলোই সুন্দর, তবে সুন্দরতম হলো বর্ষা, যার বর্ণনা অজস্র কবিতা ও কাব্যে এঁকেছেন কবিরা, মনের মাধুরী মিশিয়ে কণ্ঠে তুলেছেন রাগ রাগিণী। যেহেতু আমি মূলত সিলেটের সন্তান, আমার গায়ে সেখানকার সোঁদামাটি, আমার মনে একনাগাড়ে সাতদিন ধরে প্রচণ্ড বৃষ্টিধারার অর্কেস্ট্রা, আমি তো হবই হব বর্ষাপ্রেমিক। যিনি দেখেননি তিনি কল্পনাও করতে পারবেন না সেই পাহাড়ি শহরের বৃষ্টির মহিমা। মৌলভীবাজারে মনু নদীতে তরঙ্গ ওঠে আষাঢ় মাসে, বৃষ্টি ঝরছে তো ঝরছেই, তারই মধ্যে চলে দৈনন্দিন কাজকর্ম। কেউ বাড়িতে বসে নেই, রুটিনমাফিক কাজকর্ম সবাই করেন, মাথাটা ঢেকে নেন ছাতা ঘোমটা অথবা বাঁশের মাথাল দিয়ে, রাস্তায় হাঁটু পানি জমলে কাপড়টা একটু উঁচু করে ছপছপ শব্দ করে মনের আনন্দে পাড়ি দেন তার গন্তব্যে। জ্যৈষ্ঠ মাসকে বলা হয় মধু মাস, আম-জাম-লিচু-কাঁঠাল-লটকন-বাতাবীলেবু-তাল শাঁস-জামরুল কতো না বাহারি ফল। বাতাস মৌ মৌ করে তাদের সুবাসে, গরীব-ধনী নির্বিশেষে সকলেই পান তার আস্বাদন। বাজারে গিয়ে কিনতে হয় না সবসময়, বাড়ির উঠোনেই তো রয়েছে ফলের বাহার। শহরের সব বাড়িতেই থাকার ঘরটি বাদ দিয়ে অনেক জমিন যেখানে ধীরে ধীরে বড় হয়ে উঠেছে ফলের গাছ, ফুলের গাছ, ওষুধি গাছ। আম্মার সতর্কবাণী উপেক্ষা করে আমরা নেমে যেতাম মাঠে, ‘ঝড় এলো এলো ঝড়, আম পড় আম পড়’, কে কতো ফল কোচড়ে নিতে পারতাম, তারই কমপিটিশন। এরপর চলতো কাগজের নৌকো বানিয়ে পানিতে ভাসানো। আহা সে দিনের কি কোন তুলনা হয়। হঠাত্ করে সাদা সাদা বরফ খণ্ড ঝরে পড়তো আকাশ থেকে যার নাম শিলাবৃষ্টি। বাড়ির ভেতর থেকে মগ, জগ, বালতি যে যা পেতাম নিয়ে শিলা কুড়ানোর ব্যস্ততা। এতো বৃষ্টিতে অবগাহনের পরও কারো জ্বর হতো না, সর্দি-কাশি কিছুই নেই, আমরা যে জন্ম থেকেই ওয়াটারপ্রুফ তথা বৃষ্টিপ্রুফ হয়ে গেছি। আমাদের সুনামগঞ্জের কবি মৌজউদ্দিন ছিলেন চাঁদনী পাগল, চাঁদের আলোয় তিনি আয়োজন করতেন নানারকম উত্সবের। হাওরের পানিতে ছায়া ফেলতো পূর্ণিমার চাঁদ। কিছুক্ষণের জন্য সকল বিজলী বাতি নিভিয়ে দেয়ার নির্দেশ দিতেন তিনি পৌরসভার চেয়ারম্যান, নগরবাসী উপভোগ করতো চাঁন্নি রাতের শোভা। প্রকৃতি প্রেমের এমন অসাধারণ নজির আর তো খুঁজে পাওয়া যায় না। আমাদের মৌলভীবাজারের সন্তানেরা সকলেই প্রকৃতিকে ভালোবেসেছেন আপন মনের মাধুরী মিশিয়ে। বৃষ্টির শব্দ ঝড়ো হাওয়ার মাতম আকাশে কালোমেঘের ভেসে চলা, বিদ্যুতের ঝলকানি সবকিছু মিলে মনে হতো এক অপার্থিব জীবন। বনের ঝোপে ঝোপে ফোটে কতো নাম জানা ফুল, বেগুনী, হলুদ, গোলাপী, সাদা, খয়েরি নানা রঙের। তাদের জৌলুস মনকে দেয় প্রশান্তি, গোলাপ, বেলী, চামেলীর চেয়ে কম কিছু নয়। রাজধানীর অধিকাংশ লোক বৃষ্টির সেই মাহাত্ম্য বুঝলেন না বলে দুঃখিত হই, যখন দোকান থেকে বের হই, দ্বাররক্ষি এগিয়ে আসেন ছাতা হাতে, আমি তাড়াতাড়ি বলি ‘না ভাই আমাকে নয়, অন্য কাউকে অফার করেন ছাতার আচ্ছাদন, আমি যে বৃষ্টিতে ভিজতে চাই, এ বৃষ্টি আমাকে বুলিয়ে দেয় মায়ের স্নেহময় পরশ। নূহাশপল্লীর রূপকার অসামান্য সৃষ্টি দিয়ে আমাদের চির ঋণী করে গেছেন। এখন আমাদের প্রয়োজন হুমায়ূন আহমেদের মতো প্রকৃতি প্রেমিক, যারা এগিয়ে আসবেন শুষ্কং কাষ্ঠংসম রাজধানীর বাসিন্দাদের জন্যে প্রকৃতির ছায়াঘেরা সৃজনের, যেখানে দুদণ্ড বিশ্রাম করে ফিরে পাবো নবজীবন।  লেখক :শিক্ষাবিদ-সাহিত্যিক [email protected]

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন