ষষ্ঠ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা অনুযায়ী ২০১৩-১৪ অর্থবছরের বাজেট ঘোষিত হল ৬ জুন, ২০১৩-তে। মাননীয় অর্থমন্ত্রী ৫ম বারের মত এই গুরুদায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করলেন। বাজেটের আকার হল ২ লাখ ২২ হাজার ৪৯১ কোটি টাকা, যা গত বছরের ঘোষিত বাজেটের চেয়ে ৩০ হাজার ৭৫২ কোটি টাকা বেশি। এ বাজেটে ভর্তুকি ধরা হয়েছে মোট ৩০ হাজার ৬৯৫ কোটি টাকা। এ ভর্তুকি দেবে সরকার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ খাতে—যেমন কৃষি, বিদ্যুত্, জ্বালানি, খাদ্য ও রফতানি ইত্যাদি খাতে, যে গুলো বাধাগ্রস্ত হলে দেশের উন্নয়ন থেমে যাবে, তাই এই ব্যবস্থা।
যতই বছর যায়, বাজেটের আকার ততই বড় হতে থাকে। কারণ চাহিদার তীব্রতা। ফলে বাধ্য হয়েই সরকারকে ঘাটতি বাজেট করতে হয়। যে ঘাটতি পূরণের জন্য হাত পাততে হয় অভ্যন্তরীণ ও আন্তর্জাতিক পর্যায়েও। বাজেটে দুটো দিক খুব গুরুত্বপূর্ণ, একটি হল উন্নয়ন খাত, অপরটি অনুন্নয়ন খাত। যেগুলো এডিপি ও নন-এডিপি ব্যয় হিসেবে ধরা হয়। উন্নয়ন খাতের আওতায় রাস্তাঘাট, ব্রীজ-কার্লভাট, ভবন নির্মাণ ইত্যাদি চলে আসে। জুন মাসে এ প্রকল্পগুলোর টাকা ছাড় দেয়া হয়ে থাকে, যদিও নিজ খরচে ঠিকাদার, কন্ট্রাক্টররা আগেই কাজ শুরু করে । আর দুর্ভাগ্য এ জাতির এখানেই, আজ থেকে ৪২ বছর আগে স্বাধীন হওয়া এদেশটির পরতে পরতে চোরের খনি বেড়েই চলেছে। এই যে উন্নয়নের নামে কোটি কোটি টাকা প্রতি বছর সরকার বরাদ্দ দেয় সে টাকার সিকি ভাগ হয়তোবা হালাল করে দুর্বৃত্তেরা, বাকি বারো আনাই লোপাট করে দেয়, ফলে আজ পর্যন্ত উন্নয়নের টাকায় দেশব্যাপী কোন উন্নয়নই হয়নি। আজও সারা বাংলাদেশে রাস্তা-ব্রিজ-কাল-ভার্ট-এর বেহাল দশা প্রকট আকারে বিরাজমান।মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনা যার অকাট্য প্রমাণ। শুধু তাই নয়, এসব ভাঙা-চোরা রাস্তা দিয়ে চলতে গিয়ে যানবাহনেরও ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়। এরকম যে খাতেই সরকার টাকা ঢালছে, জায়গামত না পড়ে সেগুলো লোভের দরিয়ায় গিয়ে মাথা ঠুকছে। ফলে কাঙ্ক্ষিত উন্নয়ন-এর ছোঁয়া পাচ্ছে না দেশমাতা। এর পরিণতিতে পরের বছর বাজেটে আরও টাকা বরাদ্দ রাখতে হচ্ছে, আর চোর-বাটপাড়েরা আবারও পুকুরচুরি করে লালে লাল হয়ে যায়।
জাতির জনক বঙ্গবন্ধু স্বাধীন দেশে মাত্র সাড়ে তিন বছর বাঁচতে পেরেছিলেন, কিন্তু ঐ স্বল্প সময়েই তিনি বুঝে গিয়েছিলেন যে, সদ্য স্বাধীন বিপর্যস্ত দেশটিকে গড়ে তোলার চেয়ে তার সীমিত সম্পদটুকু লুটেপুটে খাওয়ার দিকেই কতিপয় লোভীর ঝোঁক বেড়ে চলেছে। তিনি অত্যন্ত ব্যথিত হয়েছিলেন লোভ-লালসার বাড়াবাড়ি দেখে। চৌর্যবৃত্তির প্রকোপে তিনি আক্ষেপ করে বলেই ফেলেছিলেন, সবাই পায় সোনার খনি, হীরার খনি, আর আমি পেয়েছি চোরের খনি। কি অকাট্য সত্যি ছিল সেদিনের ঐ উক্তি, যার প্রমাণ আমরা চতুর্দিকেই দেখতে পাচ্ছি।
আজ যদি দেশে সততা ও দেশপ্রেমের পরিচর্যা হত, তাহলে বাজেটের আকার বড় না হয়ে ক্রমেই ছোট হত। কারণ আগের বছরই তো বিভিন্ন খাতে দেয়া টাকার সদ্ব্যবহার হয়ে যেত, ফলে পরের বছর চাপ কম থাকাটাই স্বাভাবিক ছিল। কিন্তু সে দৃশ্য দেখতে হলে রাজনীতিবিদদের সম্পদের যে হিসাব দিতে হবে, তা কি আদৌ সম্ভব হবে? যদি সম্ভব হত, তাহলে দেখা যেত জনগণের জীবনমান উন্নয়নে যে টাকা বরাদ্দ ছিল, তা তাদের জন্য সম্পূর্ণ ব্যয় হয়নি, হয়েছে নামেমাত্র।
দেশের কাজ করবে, দেশকে ভালবাসবে বলে জনকল্যাণে নিজেদের বিলিয়ে দেবার মন্ত্রেই দীক্ষিত হতে হয় রাজনীতিবিদদের । তার ছিঁটেফোঁটা কি আজ আমরা দেখতে পাই তাদের মধ্যে? কাল টাকা সাদা করার দলেও তাদের অনেকের নাম দেখা যায়। একে কেমন দেশপ্রেম বলে? তাছাড়া এই চার দশকে বিভিন্ন আমলে নানারকম ভবনের কল্পকাহিনী শুনেও স্তম্ভিত দেশবাসী, যেগুলোর জৌলুস রূপকথার রাজ্যে নিয়ে যায় আমাদের। এক একজন নেতার সম্পদের পরিমাণ দেখলে ভিরমি খেয়ে যেতে হয়। কি করে এ গরীব দেশে ব্যক্তিমালিকানায় এত সম্পদের পাহাড় জমে যায়? যেদেশে সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করছে, সেদেশে এসব অর্থ কোন্ পথে এসেছে তা খুঁজে বের করা আজ সময়ের দাবি।
যদি আজ দেশ জুড়ে সততার ছুরি দিয়ে অস্ত্রপচার করা যেত, তাহলে চোরের খনিগুলো খুঁজে পাওয়া যেত, আদায় করা যেত অনুত্পাদন খাতে পড়ে থাকা কোটি কোটি টাকা। শুধু ঐ টাকাগুলো দিয়েই এই বিশাল বাজেটের একটা বিরাট অংশ মেটানো সম্ভব। যদি সত্যিই সেই সুদিন কখনো আসে, তাহলে সেদিন আর এদেশে ঘাটতি বাজেট করতে হবে না, ভিক্ষার ঝুলি নিয়ে বিদেশের দ্বারে দ্বারে ঘুরতে হবে না, হবে না ঋণগ্রস্ত হয়ে গলায় ফাঁস জড়াতে।
লেখক :প্রভাষক, প্রাণিবিদ্যা
বাউফল কলেজ
বাউফল, পটুয়াখালী
[email protected]
