ভুল সবই ভুল!

আপডেট : ১০ জুন ২০১৩, ২২:০৫
৫০ বছর বয়সে ভুল শুরু হতে পারে। ৫০ বছর বয়সে একজন মানুষ ‘হাফ সেঞ্চুরী ক্লাবের’ সদস্যে পরিণত হন। এ সময় আগে থেকেই নেয়া কাঁধে নানা দায়-দায়িত্বের ঝক্কি ঝামেলা সেইসাথে জীবনের মরুপথে দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে অনেকটা অবসন্ন হয়ে আসে জীবন মন। জট বাঁধে মাথায় শত রকমের অনুষঙ্গ। সে কারণে মাথায় ধারণ করা অনেককিছুই উতড়ে যেতে পারে। চিকিত্সা বিজ্ঞানও খুব ব্যতিক্রম কিছু বলে না। বাংলাদেশের সাত বছর বয়সী ‘রূপকথা’ যে ইতিমধ্যে ওয়ার্ল্ড গ্রীনিচ বুকে কম্পিউটার প্রোগ্রামিং-এ চমক দেখাবার কারণে তার নাম লেখাতে যাচ্ছে তার ক্ষেত্রে আমার উপরের বিষয়টি কতটুকু প্রযোজ্য হবে জানি না। কিন্তু গত শত বছরের মধ্যে সর্বাধিক মেধাসম্পন্ন বিজ্ঞানী আইনস্টাইনের বিস্ময়কর মেধা নিয়ে যত আলোচনা হয়েছে অন্য কারও বেলায় এত আলোচনা হয়েছে বলে মনে হয় না। সেই আইনস্টাইনও ভুলে যেতেন। নিচের ঘটনাটি দিয়ে তা প্রকাশ করি। জার্মানে যখন ইহুদি বিতাড়ন শুরু হয়, তখন আইনস্টাইন জার্মান ছেড়ে ১৯৩৪ সালে ইংল্যান্ড হয়ে পাড়ি জমালেন আমেরিকার প্রিষ্টনে। গুপ্তঘাতকদের দল সাগর পাড়ি দিয়ে আমেরিকায় পৌঁছাতে পারে এমন ধারণা থেকে আইনস্টাইনকে গোপন জায়গায় রাখা হল। সেই বাড়ির ঠিকানা কাউকে জানানো হতো না। একদিন প্রিষ্টনের ডিরেক্টরের বাড়িতে ফোন এলো, ‘দয়া করে যদি আইনস্টাইনের বাড়ির নম্বরটা জানান’। আইনস্টাইনের বাড়ির নম্বর কাউকে জানানো হয় না বলে ফোনটা রাখলেন ডিরেক্টর। খানিক পর আবার ফোন বেজে উঠলো। বিরক্ত ডিরেক্টর থতমত খেয়ে গেলেন যখন ঐ পার থেকে বললেন, আমি আইনস্টাইন বলছি, বাড়ির নম্বর ও রাস্তা দুটোই ভুলে গেছি, যদি দয়া করে বলে দেন। ল্যাবরেটরি থেকে মাঝে মাঝে বের হয়ে ঘুরতে বের হতেন আইনস্টাইন। তখন তার বয়স ৫৫ বছর। জাতিসংঘের যে দুটি আন্তর্জাতিক সনদের উপর ভিত্তি করে পৃথিবীর বিভিন্ন দেশ ‘কারনেট দ্যা প্যাসেজ’ নামে পর্যটকদের শুল্কমুক্ত গাড়ি আনার সুবিধা দেয় বাংলাদেশ ঐ সনদ দুটিতে স্বাক্ষর করেনি, দীর্ঘ ৫০ বছর পর সম্প্রতি তা জানা গেলো রাজস্ব বোর্ডের এক অনুসন্ধানে। জাতিসংঘের ‘কাস্টম্স কনভেনশন অন দি টেম্পরারি ইম্পোরেটশন অব প্রাইভেট রোড ভেহিকেলস্-১৯৫৪’ এবং ‘কাস্টম্স কনভেনশন অন দি টেম্পরারি ইম্পোরেটশন অব কমার্শিয়াল রোড ভেহিকেল্স-১৯৫৬’ এতে বাংলাদেশ অন্তর্ভুক্ত নয় এবং এর আওতায় এ যাবত্ দেশে যে গাড়ি আনা হয়েছে তা শুল্ককর মুক্তভাবে খালাসযোগ্য নয়। কিন্তু ‘কারনেট দ্যা প্যাসেজ’ সুবিধায় বিদেশি বংশোদ্ভূত বাংলাদেশিরা শুল্কমুক্তভাবে হ্যামার, মার্সিডিজ বেঞ্জসহ বিভিন্ন ব্রান্ডের বিলাসবহুল গাড়ি এনে দুই/তিন মাস পর দেশ থেকে ফিরে যাবার সময় এগুলো বিক্রি করে দিয়েছে। এভাবে এ যাবত্ ২০০ কোটি টাকা রাজস্ব হারিয়েছে সরকার। ১৯৬৩ সাল থেকে এ সুবিধার আওতায় চট্টগ্রাম কাস্টম্স দিয়ে গাড়ি আসা শুরু হয়েছে। এই ৫০ বছরের মধ্যে বাংলাদেশ ৪২ বছরের ভাগীদার আগের ৮ বছর পাকিস্তানি শাসনামলে। বাংলাদেশের ভুল যোগ করলে এবং এর খেসারত হিসেব করলে নতুন বিজ্ঞান আবিষ্কার হয়ে যেতে পারে। আমরা ভুল করে পলিসি নেই, ভুল করে পলিসি বদল করি। ভুল প্রতিশ্রুতি দেই, ভুল করে ক্ষমা চাই। ভুল করে ভোট দেই, ভুল নেতা-নেত্রী নির্বাচন করি। বার বার ভুল করে দুর্নীতিবাজদের হাতে দেশ পরিচালনার লাগাম তুলে দেই, ভুলের কথা পস্তাতে পস্তাতে স্বীকার করি। ভুল করে ভাবি এই পৃথিবী আমাদের শেষ ঠিকানা, আমরা অমর। ভুল করে ভাবি দুর্নীতিতে অর্জিত যা কিছু সব নিয়েই পাড়ি জমাবো কবরে। আমরা পদ্মা সেতুতে ভুল করেছি। সর্বশেষ ভুল করেছি ৬৫০ কোটি টাকা ব্যয়ে বস্তা পচা ডেমু ট্রেন ক্রয় করে। যা এখন জাতির বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে। ২৪ মে উদ্বোধনীর দিনেই ডেমু ট্রেন নষ্ট হয়ে আগাম বার্তা দিয়েছিল আমাদের দুর্নীতি আর পরিকল্পনার দুর্বলতার। আর্টিকুলেটেড বাস যোগ করেছে দেশের অর্থ বিনাশের আরো বিরাট এক মাত্রা। ৫০টি বাসের মধ্যে ২০টি ইতিমধ্যে নেমেছে আমাদের পরিবহন খাতে উজ্জ্বল ভাস্কর হয়ে। আমাদের সড়ক ও পরিবহন ব্যবস্থায় আর্টিকুলেটেড বাস কতটা বেমানান এবং অকেজো তা ৮/১০ বছরের একটি শিশুও বলে দিতে পারে, তাহলে আমাদের বড় বড় মাথাধারী লোকেরা কি পরিকল্পনা মাথায় রেখে এ বাস আমদানি করেছে তা কি বুঝে না এদেশের জনগণ? আমরা ৫০ বছর পর ভুল ধরতে পারি ২০০ কোটি টাকা রাজস্ব হারিয়ে। হয়ত আরো ৫০ বছর পর আরো ভুল ধরতে পারবো। যে সব ভুলের খেসারত হিন্দি নাটকের সিরিয়ালের মতো চলতেই থাকবে দীর্ঘকাল। রাষ্ট্র পরিচালক, নেতা-নেত্রী, আমলা, রাজনীতিবিদ, সমাজপতি, ক্ষমতাধরদের ভুলে আমরা আসলে খেসারত দিচ্ছি না। আমরা খেসারত দিচ্ছি এ রাষ্ট্রের সাধারণ মানুষের ভাগ্যের প্রতি ভাঁজে ভাঁজে লিখা যে ভুল সেই ভুলের জন্য। কবি দাউদ হায়দারের কবিতার অনুকরণে বলতে হয় ‘এ দেশে জন্মই আমাদের আজন্মের ভুল’। লেখক :অর্থনীতি বিশ্লেষক ই-মেইল ঃ [email protected]

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন