বাজেট

বাস্তবায়ন করতে পারলে বাজেট কল্যাণমুখী হবে

আপডেট : ১০ জুন ২০১৩, ২২:০৫
মহাজোট সরকারের শেষ বছরের বাজেট নির্বাচনমুখী হয়েছে বলে মনে হয় অর্থাত্ রাজনৈতিক বিবেচনায় এবং ভোটারদের সন্তুষ্ট করার জন্য স্বল্প-জরুরি বহু প্রকল্প হাতে নেয়া হয়েছে। তাই নির্বাচনমুখী বাজেটে অর্থায়ন সংস্থান করতে যেয়ে অতি জরুরি খাত যেমন, খাদ্য, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, যোগাযোগ, সামাজিক নিরাপত্তা ইত্যাদির জন্য যথেষ্ট বরাদ্দ রাখা যায় নি। প্রথমেই দেখা যাচ্ছে, এডিপি খাতে গত বছরের চেয়ে প্রায় ৩০% অধিক বরাদ্দ বাড়িয়ে ৬৫,৮৭০ কোটি টাকার একটি উচ্চাভিলাষী লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। গত কয়েক বছরে এডিপি খাতে এতো অধিক হারে বরাদ্দ বাড়ানো হয় নি। এডিপি উন্নয়ন বাজেটের অধীনে মোট প্রকল্পের সংখ্যা ১১৭৬টি। তন্মধ্যে বিগত অর্থ বছর থেকে স্থানান্তরিত হয়েছে ৯৯৬টি, নতুন প্রকল্প ৫০টি, স্বায়ত্তশাসিত সংস্থার ১৩০টি এবং পিপিপি ৪৪টিসহ মোট প্রকল্পের অধিকাংশই বিগত অর্থ বছরের অসমাপ্ত প্রকল্প যা সমাপ্ত করা নির্বাচনী বছরের চ্যালেঞ্জ হিসাবে দেখা দিতে পারে। এ চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করা সহজ হবে না, বিশেষ করে নির্বাচনী বছরে রাজনৈতিক অস্থিরতা, হরতাল, অবরোধ ও সহিংসতার জন্য রাজস্ব আহরণের লক্ষ্যমাত্রা যেখানে ইতোমধ্যে পিছিয়ে পড়েছে। তাছাড়া বিগত কোন বছরেই ৮০%-এর অধিক এডিপি বাস্তবায়িত হয় নি। এডিপির ৬৫,৮৭০ কোটি টাকার মধ্যে পদ্মা সেতুর জন্য ৬,৮৫২ কোটি এবং পিপিপির বরাদ্দসহ প্রায় ১০,০০০ কোটি টাকার বাস্তবায়ন অনিশ্চিত। কারণ পদ্মা সেতু বাস্তবায়নের জন্য নির্বাচনের পূর্বে সরকারের হাতে সময় কম ও পিপিপির কোন প্রস্তাবই গত বাজেটে বাস্তবায়িত হয় নি, এবারও হবার সম্ভাবনা কম। উন্নয়ন বাজেট বা এডিপি আহরিত রাজস্ব এবং বৈদেশিক ঋণ বা অনুদান দিয়েই অর্থায়ন করতে হবে। নির্বাচনী বছরে রাজনৈতিক অস্থিরতার মাঝে সরকার প্রাক্কলিত ২১,০৬৮ কোটি টাকার বৈদেশিক ঋণ বা অনুদান না পেলে এবং আভ্যন্তরীণ রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত না হলে এডিপি বাস্তবায়ন দুষ্কর হতে পারে। সামাজিক নিরাপত্তা খাতে বাজেটে কিছুটা বরাদ্দ বাড়ানো হয়েছে যা হত দরিদ্র উপকারভোগীর সংখ্যা বৃদ্ধি করবে, ১০ লাখ অতি দরিদ্র লোকের দারিদ্র্য হ্রাসের জন্য পরিকল্পনা করা হয়েছে, করমু্ক্ত আয়ের সীমা বাড়ানো হয়েছে, এ সব প্রস্তাব দারিদ্র্য বিমোচন, সম্পদের সুসম বন্টন ঘটাবে; কিন্তু কৃষিতে ভর্তুকি কমানো উচিত হয়নি। এমনিতেই নগদ ভর্তুকি কৃষকের হাতে পৌঁছে না, পৌঁছলেও আংশিক পৌঁছে, সারের ভর্তুকিও তাই, সেচ-যন্ত্রের মালিকরা কৃষকদেরকে শোষণ করে, তাই আমি বহুবার লিখেছি যে, সরকারের পক্ষ থেকে বিনা মূল্যে সেচ দেয়া উচিত। এ সমস্ত প্রতিবন্ধকতা ও দুর্নীতি বন্ধ করার জন্য বাজেটে প্রস্তাবনা থাকা দরকার ছিল। কৃষিতে প্রযুক্তি ব্যবহার, আধুনিকায়ন, গবেষণা ও মাঠ পর্যায়ে ট্রেনিং দেয়ার জন্য বরাদ্দ রাখা উচিত ছিলো। চলতি অর্থ বছরের দশ মাসে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে প্রায় ২৪,০০০ কোটি টাকা কম আহরণ করেছে। এ থেকে মনে হয়, আগামী ২০১৩-১৪ অর্থ বছরে ১,৬৭,৪৫৯ কোটি টাকার লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সহজ হবে না। রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জিত না হলে বাজেট ঘাটতি বাড়বে। সুতরাং ২০১৩-১৪ অর্থ বছরের প্রাক্কলিত ঘাটতি ৫৫,০৩২ কোটি টাকা আরো বেড়ে যেতে পারে। ঘাটতি বাড়ার অর্থই হলো সরকারের ব্যাংকিং সিস্টেম থেকে ঋণের পরিমাণ বৃদ্ধি পাওয়া এবং সরকারকে ঋণ প্রদানের জন্য ব্যাংকের মুনাফা ও প্রাইভেট সেক্টরে ঋণের পরিমাণ কমে যাওয়া এবং ফল স্বরূপ ব্যবসা-বাণিজ্যে বিনিয়োগ ও প্রবৃদ্ধি কমে যাওয়া যা জিডিপির উপর কুপ্রভাব ফেলতে পারে। ব্যাংক ঋণের সুদও সরকারি খরচ বাড়ায়। তাই ব্যাংক ঋণ না নিয়ে সরকারের বিকল্প উত্স খুঁজে বের করা উচিত। প্রবাসীদের বছরে ১,২০,০০০ কোটি টাকার রেমিটেন্সের কিছু অংশ উত্পাদনশীল কাজে বিনিয়োগের ব্যবস্থা করার কোন প্রস্তাব বাজেটে নেই। ৪০ লাখ গার্মেন্টস কর্মীর নিরাপত্তা, রেশনিং ইত্যাদির কোন প্রস্তাবনা বাজেটে নেই। ঢাকা শহরের ৫০ লাখ বস্তিবাসীর আশ্রয়, ন্যূনতম স্বাস্থ্যসেবা ইত্যাদির কোন প্রস্তাবনা বাজেটে নেই। সুতরাং বাজেটকে আরো স্থিতিশীল ও গণমুখী করা উচিত বলে মনে করি। লেখক :এফসিএ ও কথাশিল্পী

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন