বাজেটে বিভিন্ন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণে উচ্চাভিলাষ থাকা তো ভালো। অনেক সময়ই এমনটি বলা হয়ে থাকে যে, বড় লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারিত থাকলে তার কাছাকাছি অন্তত যাওয়া যায়। যে কোনো অর্থবছরের বাজেটে সংশোধনেরও সুযোগ থাকে। মধ্যমেয়াদি পর্যালোচনার কথা আমাদের দেশেও ঘটা করে বলা হচ্ছে, যদিও সে অনুযায়ী কাজ হচ্ছে না। ৬ জুন অর্থমন্ত্রী যে বাজেট পেশ করেছেন সংসদে, তা প্রস্তাবিত বটে। এতে কিছু সংশোধনী আনা হবে চলতি মাসেই, নতুন অর্থবছর শুরুর আগে। অভিজ্ঞতা বলে, সেগুলো আনা হবে প্রধানত কর প্রস্তাবে। যেমন, সংবাদপত্র শিল্পে ব্যবহূত নিউজপ্রিন্ট আমদানিতে শুল্ক রেয়াত যেভাবে তুলে নেয়ার প্রস্তাব করেছেন অর্থমন্ত্রী, মনে হয় না সেখানে অটল থাকতে পারবেন তিনি। এরই মধ্যে অর্থমন্ত্রী বলেছেন, এটি তার প্রস্তাব মাত্র। এ ধরনের প্রস্তাব মনে হয় তাকে প্রত্যাহার বা অন্তত সংশোধন করতে হবে। কিন্তু তিনি কি সংশোধনী আনবেন নতুন অর্থবছরের রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রায়? বড় রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা নিয়ে খোদ জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) আপত্তির কথাও শোনা গিয়েছিল মাঝে। অর্থমন্ত্রীর অবস্থান দেখে তারা এখন আর রা করছেন না। একটি অর্থনৈতিক পত্রিকায় সমপ্রতি খবর বেরিয়েছে যে, নতুন বছরে উচ্চাভিলাষী রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে নতুন কিছু উদ্যোগ নিচ্ছেন তারা। চলতি অর্থবছরের শেষদিকে এসেও দেখা যাচ্ছে, প্রাক্কলিত লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে তারা বেশ একটু পিছিয়ে রয়েছেন। বছরের শেষ দুই-তিন মাসে রাজস্ব আহরণ অবশ্য বেড়ে উঠতে দেখা যায় বিপুলভাবে। সরকারের উচ্চ পর্যায়ের তাগাদা ও এনবিআরের চোটপাটের ফলেই সেটি সম্ভব হয়। সংসদে এরই মধ্যে সম্পূরক বাজেট নিয়ে আলোচনা শুরু হয়েছে। আমরা দেখতে চাইব চলতি অর্থবছরের সম্পূরক বাজেটে কিভাবে কি করা হয়, সেটিও। এতে সাধারণত উন্নয়ন ব্যয় তথা এডিপি কমিয়ে রাজস্ব তথা অনুন্নয়ন ব্যয় বাড়িয়ে মেলানো হয় হিসাব। এক্ষেত্রে উল্টোটি হলেই ভালো হতো। তা হতে দেখা যায় না। এ নিয়ে আক্ষেপও লক্ষ্য করা যায় না কারও। এডিপি প্রাথমিকভাবে যত উচ্চাভিলাষীই দেখাক, বছর শেষে দেখা যায় এতে অনেক কাটছাঁট করা হয়েছে। আর ব্যয়ের মান নিয়ে তো প্রশ্ন থাকেই। বিশেষত অর্থবছরের শেষ কয়েকমাসে যখন বেশি বেশি প্রকল্প বাস্তবায়ন হয়, তখন ব্যয় তথা কাজের মান হয় বিশেষভাবে খারাপ। এ নিয়ে যত কম আলোচনা হয়, সরকার পক্ষের জন্য ততই ভালো। বছর শেষে কিভাবে বাজেট মেলানো হলো, তা নিয়ে বিরোধী দলও প্রশ্ন তোলেন না। ক্ষমতায় থাকাকালে তারাও যে একই কাজ করেন বা করবেন! বাজেট নিয়ে উত্সাহপূর্ণ আলোচনা যেভাবে বাড়ছে, তাতে অবশ্য আশা করা যায় দেশের সুশীল সমাজ এ বিষয়ে অচিরেই প্রশ্ন তুলবে। অবশ্যই বেশি ভালো হতো যদি জনপ্রতিনিধিরা এ নিয়ে প্রশ্ন তুলতেন সংসদে। সরকারি দলের সদস্যরা অবশ্য বেশি কিছু বলতে পারবেন না। সংবিধানেই তাদের সে অধিকার খুব সীমিত। দলীয় রাজনৈতিক সংস্কৃতিতে দুর্ভাগ্যজনকভাবে তা আরও সীমিত। তাই বিরোধী দলের কাছেই কিছু প্রত্যাশা থাকে প্রশ্ন তোলার। প্রস্তাবিত বাজেট এবং এর নানা লক্ষ্যমাত্রা নিয়েও তারা প্রশ্ন তুলতে পারেন। এ বাজেটে নতুন ও ব্যতিক্রমী কিছু পদক্ষেপও রয়েছে। যেমন, পরীক্ষামূলকভাবে উপস্থাপিত হয়েছে একটি জেলার বাজেট। স্বায়ত্তশাসিত সংস্থাগুলোর ব্যয় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে এডিপিতে। এতে এডিপির আয়তন কিছুটা বেড়ে গেছে বৈকি। এর আয়তন আরও বেড়েছে পদ্মা সেতু বাস্তবায়নে একটা বড় থোক বরাদ্দ রাখা হয়েছে বলে। বছরের পর বছর এক টাকা ব্যয় না হলেও পাবলিক-প্রাইভেট পার্টনারশিপের (পিপিপি) আওতায় এবারও কিছু বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এসবের যৌক্তিকতা ও স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তোলাই যায়।
বাজেটে উচ্চাভিলাষ নিয়ে কথা বলতে গিয়ে অনেক কথাই উঠলো। জাতীয় নির্বাচনের বছরে আরও অনেক ক্ষেত্রেই এর পরিচয় দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী। তবে আমরা লক্ষ্য করবো, জনপ্রিয় একাধিক ক্ষেত্রে বরাদ্দ জোগাতে গিয়ে তিনি সংযমেরও পরিচয় দিয়েছেন। শিক্ষা ও স্বাস্থ্য খাতে বরাদ্দের কথা বলা যায়। এমন কোনো কোনো ক্ষেত্রে শতাংশের হিসাবে বরাদ্দ বরং কমানো হয়েছে এবার। নতুন শিক্ষানীতি বাস্তবায়নে যখন বেশি করে বরাদ্দ দাবি করা হচ্ছে, তখনই তিনি এক্ষেত্রে সংযমের পরিচয় দিলেন। এক্ষেত্রে তার বা তার সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি কি, সেটা জানতে চাওয়া যেতে পারে। শিক্ষা ও স্বাস্থ্যের মতো খাতে রাষ্ট্রীয় ব্যয়কে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ হিসেবেই দেখা হয়ে থাকে। এটা মানবসম্পদ উন্নয়নের একটা বড় কারণ। সামাজিক নিরাপত্তা খাতেও একই ঘটনা ঘটানো হয়েছে প্রস্তাবিত বাজেটে। আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার এ বিষয়ে উদাসীন, এটা বিরোধী দলও বলে না। তবে বিভিন্ন সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচিতে অনিয়ম-দুর্নীতি বেড়েছে বলে সমালোচনা রয়েছে। টার্গেট গ্রুপের কাছে অর্থ ও খাদ্যসামগ্রী না পৌঁছে এতে মধ্যশ্রেণি উপকৃত হচ্ছে বলে মাঝে খবর বেরিয়েছিল। সরকার কী এটিকে আস্থায় নিয়েছে? দারিদ্র্য নিরসনে যখন অগ্রগতির খবর রয়েছে, তখনো সামাজিক নিরাপত্তা খাতে বরাদ্দ বাড়িয়ে যাওয়াটা অবশ্য কাজের কথা নয়। এক্ষেত্রেও সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি জানতে চাওয়াটা জরুরি মনে হচ্ছে। কৃষি খাতে তার মনোযোগ ও সাফল্য এবং এতে খাদ্যপণ্যে মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে আসার বিষয়টি কেউ অস্বীকার করবে না। তা সত্ত্বেও কৃষিতে ভর্তুকিসহ আর্থিক বরাদ্দ কমানো হয়েছে এবার। উদ্যোগী কৃষিমন্ত্রীর মতকে অগ্রাহ্য করে এটি করা হয়েছে বলে মনে হয় না। অর্থমন্ত্রী অবশ্য বলেছেন, প্রয়োজনে ভর্তুকি বাড়ানো হবে এবং কৃষি ঋণ বিতরণ বাড়িয়ে বরাদ্দে ঘাটতি পূরণ করা হবে। ভর্তুকি কমানোর বিষয়ে উন্নয়ন সহযোগী, বিশেষত আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) তাগাদা রয়েছে। এক্ষেত্রে যুক্তিও রয়েছে তাদের। অর্থমন্ত্রী কী তাদেরও খুশি রাখতে চান? নাকি এটা সরকারের এক ধরনের নিরীক্ষামূলক পদক্ষেপ? কৃষি উত্পাদন বাড়তে বাড়তে কাম্য পর্যায়ে পৌঁছে সেটা এখন নামতে শুরু করেছে বলে তথ্য-উপাত্তে মনে হয়। এমন একটা সময়ে বরাদ্দ হ্রাসের খবর এ খাতে ইতিবাচক বার্তা দেবে কিনা, প্রশ্ন রয়েছে। সরকার হয়তো ভাবছে ঢালাওভাবে ভর্তুকি না বাড়িয়ে একে আরও টার্গেটেড করতে। সত্য যে, এ নিয়ে বিশেষজ্ঞরা পরামর্শ দিয়ে আসছিলেন। আগামী বছরের জন্য প্রস্তুতকৃত বাজেটে অনেক ক্ষেত্রেই কিন্তু দেখা যাচ্ছে বিশেষজ্ঞ ও খাত-সংশ্লিষ্টদের মতামত ও দাবির প্রতিফলন। একে তো মন্দ লক্ষণ বলা যাবে না। বর্তমান সরকারই নির্বাচনকালীন সরকার হিসেবে থাকবে কিনা, তা যখন নিশ্চিত নয়— তখনো অর্থমন্ত্রীকে দেখা যাচ্ছে কর-শুল্ক প্রস্তাবে বেশ কিছু ক্ষেত্রে স্থানীয় শিল্পের সুরক্ষা ও তাকে বিকশিত করার পক্ষে অবস্থান নিতে। বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ আশঙ্কাজনকভাবে কমে আসাতেও সরকার মনে হয় চিন্তিত। এতে প্রবৃদ্ধি কমে এসেছে চলতি অর্থবছরে। অর্থমন্ত্রীর দেয়া তথ্য কেউ উড়িয়ে দেবে না, তবে দায়িত্বশীল অনেকে বলছেন— এটা ৬-এর নিচে নেমে যাবে। এখান থেকে প্রবৃদ্ধিকে আগামী এক বছরে ৭-এর উপরে তোলা খুব কঠিন বলেই মনে হয়। তবে এটা ঠিক, মূলধনী যন্ত্রপাতি, মধ্যবর্তী পণ্য ও কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক ছাড় দেয়ায় বেসরকারি খাতে বিনিয়োগ উত্সাহিত হবে। উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ীদের ছাড় দেয়ার এমন প্রবণতা দেখে অনেকে এ বাজেটকে বলছেন ‘ব্যবসায়ীবান্ধব’। তবে অর্থমন্ত্রীর এ প্রচেষ্টাও হয়তো ব্যর্থ হবে, যদি রাজনৈতিক অঙ্গনে বিরাজ করে কয়েকমাস ধরে চলতে থাকা সহিংসতা এবং থেকে যায় আগামী জাতীয় নির্বাচন ও তার ব্যবস্থাপনা নিয়ে সংকট।
জনগণের ওপর নতুন কোনো কর বসাননি অর্থমন্ত্রী এ বাজেটে। মূল্যস্ফীতি বিবেচনায় করমুক্ত আয়ের সীমা বাড়িয়েছেন। করমুক্ত বাড়ি ভাড়ার পরিমাণ বাড়ানোটা মধ্যবিত্তের নজর কাড়বে। করপোরেট ইনকাম ট্যাক্স ও কোটিপতিদের সম্পদের ওপর সারচার্জ বাড়িয়ে আয়-বৈষম্যও কমাতে চেয়েছেন তিনি। তবে সমঝোতা করেছেন কালো টাকার মালিকদের সঙ্গে। বর্তমান শাসনামলে এটি বলা যায় অব্যাহতই ছিল। প্রস্তাবিত বাজেটে টাকা সাদা করার সুযোগকে কেন্দ্রীভূত করা হয়েছে আবাসন খাতে। জমি, প্লট বা ফ্ল্যাট কেনার ক্ষেত্রে ক্রয়মূল্যের ওপর ১০ শতাংশ কর দিলেই তা নিয়ে আর প্রশ্ন তুলবে না এনবিআর। এমন সুযোগ চলতি অর্থবছরে রাখা হয়েছিল শেয়ারবাজারে বিনিয়োগের জন্য। তাতেও বেশি কালো টাকা বিনিয়োজিত হয়নি। শেয়ারবাজার বসে পড়াতেই এবং এর উত্থান বিষয়ে আস্থায় ধস নেমেছে বলেই হয়তো টাকা সাদা করতে দেয়া ওই সুযোগেও ফল হয়নি। শেয়ারবাজারে একগুচ্ছ প্রণোদনা দিয়ে নাকি তাই এটা প্রত্যাহার করা হচ্ছে। তাহলে আবাসন খাতে ওই একই সুযোগ দেয়া হচ্ছে কেন? আবাসন ব্যবসায় মন্দা যাচ্ছে বলে এবং ক্ষমতাবান আবাসন ব্যবসায়ীরা চাপ সৃষ্টি করেছেন, তাই? আবাসন খাতে, বিশেষত ফ্ল্যাট ব্যবসায় মন্দা যাচ্ছিল গ্যাস সংযোগে স্থবিরতা বিরাজ করছিল বলেও। তাতে কিছুটা গতিশীলতা সৃষ্টি হয়েছে সমপ্রতি। উত্তোলন বাড়ায় রাজশাহীতেও গ্যাস সংযোগ দেয়া হচ্ছে। এ অবস্থায় আবাসন খাতে টাকা সাদা করার সুযোগ দেয়ায় কমতে থাকা জমি ও ফ্ল্যাটের দাম আবার বেড়ে উঠবে। মধ্যবিত্তের কাছ থেকে এ সুযোগ আরও দূরে সরে যাবে সন্দেহ নেই। বিরোধী দলের এক নেতা বলেছেন, বর্তমান শাসনামলে যারা বিপুল কালো টাকা বানিয়েছে, তারা এ সুযোগ লুফে নেবে। তাদের আমলে এভাবে টাকা বানানোরাও কিন্তু পিছিয়ে থাকবে না। সাধারণভাবে জীবনধারণকারীদের জন্য অবশ্য রয়েছে স্থায়ী বেতন কমিশনের ঘোষণা। নানা ধরনের সঞ্চয়পত্রে সুদের হার বাড়ানো হবে বলেও খবর রয়েছে; দেয়া হবে উেস করের ক্ষেত্রে ছাড়। এটাকে অবশ্য মধ্যবিত্তের সঙ্গে সমঝোতা বলা যাবে না। ঘাটতি অর্থায়নে চলতি অর্থবছরে সঞ্চয়পত্র বেচে বেশি অর্থ সংগ্রহ করতে পারেনি সরকার। আগামী বছর এ খাত থেকে অনেক বেশি ঋণ নিয়ে নিরাপদে থাকতে চায় সরকার। উচ্চাভিলাষী রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে খুব বেশি আস্থা বোধ হয় নেই অর্থমন্ত্রীরও। টালমাটাল সময়ে অর্থনীতি ঠিকভাবে না চললে এনবিআরকেইবা কতটা দোষ দেয়া যাবে?
লেখক : সাংবাদিক
[email protected]
