সার্বক্ষণিক যানজটকবলিত রাজধানীবাসীর এমনিতেই দুর্ভোগের অন্ত নাই। রাজনৈতিক কর্মসূচি, শ্রমিক বা ছাত্র অসন্তোষ এবং ব্যস্ত সড়ক বন্ধ করিয়া ভিভিআইপিদের যাতায়াত সেই দুর্ভোগকে যে অনেকখানি বাড়াইয়া দেয়—তাহাও সর্বজনবিদিত। কর্মব্যস্ত সময়ে জরুরি কাজ ফেলিয়া ঘণ্টার পর ঘণ্টা অসহায়ভাবে যানজটে বন্দী হইয়া থাকা কতোখানি পীড়াদায়ক তাহা ভুক্তভোগী মাত্রই জানেন। যানজটের এই সমস্যা লইয়া দীর্ঘদিন যাবত্ কথা হইতেছে। চলিতেছে নানা পরীক্ষা-নিরীক্ষা। সরকারের তরফ হইতে বলা হইতেছে যে, সোয়া কোটি জনসংখ্যার এই মহানগরে স্বাভাবিকভাবে যতোটুকু রাস্তা থাকা দরকার, বর্তমানে আছে মাত্র তাহার এক-তৃতীয়াংশেরও কম। কথাটি সত্য। তবে ইহাই যে যানজটের একমাত্র কারণ নহে—তাহাও অস্বীকার করিবার উপায় নাই। বরং ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে চরম বিশৃঙ্খলা, যত্রতত্র পার্কিং এবং অযান্ত্রিক যানবাহনের তীব্র চাপের মতো সমস্যাগুলি সামগ্রিক পরিস্থিতিকে আরও দুর্বিষহ করিয়া তুলিয়াছে। এইসব সমস্যার সমাধানে বিভিন্ন সময়ে নানা উদ্যোগ নেওয়া হইলেও প্রায় সকল উদ্যোগই বিফলে গিয়াছে। এই পরিস্থিতিতে মানুষ যে পায়ে হাঁটিয়া যাতায়াত করিবে তাহারও উপায় নাই। ফুটপাত এমনিতেই কম এবং অপ্রশস্ত। কিন্তু তাহার বৃহদংশই চলিয়া গিয়াছে হকার, ভিক্ষুক ও ব্যবসায়ীদের দখলে। তদুপরি, প্রায় সর্বত্রই বিপজ্জনকভাবে মুখ ব্যাদান করিয়া আছে ঢাকনাবিহীন ম্যানহোল। আছে নির্মাণসামগ্রীসহ আরও নানা বিপত্তি। ফলে সড়কগুলিতে চলিতেছে মানুষ ও যানবাহনের তীব্র প্রতিযোগিতা। জীবনের ঝুঁকি নিয়াই মানুষ রাস্তার উপর দিয়া হাঁটাচলা করিতেছে। দুর্ঘটনাও ঘটিতেছে নিয়মিত। কিন্তু কর্তৃপক্ষের এইসব তুচ্ছ সমস্যা লইয়া ভাবিবার অবকাশ কোথায়!
না, সমগ্র চিত্রটিই নিশ্ছিদ্র হতাশার নহে। ইহার মধ্যে আশাবাদের ঝিলিকও অবশ্যই আছে। যানজট নিরসনে ইতিমধ্যে কয়েকটি উড়াল সড়ক নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হইয়াছে। গুরুত্বপূর্ণ গুলিস্তান-যাত্রাবাড়ি উড়াল সড়কের কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। উড়াল সড়ক হইলেই যে যানজট নিরসন হইয়া যাইবে তাহা নহে। তবে হাতির ঝিল প্রকল্প এবং বিজয় সরণি-তেজগাঁও ও মিরপুর-বনানী উড়াল সড়ক চালু হইবার কারণে সংশ্লিষ্ট এলাকার যানজট কিছুটা প্রশমিত হইয়াছে বলিয়া ভুক্তভোগীরা মনে করেন। দীর্ঘমেয়াদে এইসব বৃহদাকার অবকাঠামোগত উদ্যোগের আবশ্যকতা বা অপরিহার্যতা লইয়া কাহারো দ্বিমত নাই। কিন্তু সকলেই উদ্বিগ্ন বিদ্যমান জনদুর্ভোগ লইয়া। যানজট সর্বত্রই আছে। তবে বিশ্বের বড়ো বড়ো শহরগুলিতে নগর পরিকল্পনার ক্ষেত্রে নাগরিকদের স্বাচ্ছন্দ্যকেই সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া হইয়া থাকে। সেইখানে ফুটপাত বা হাঁটাপথগুলি যে কতোখানি প্রশস্ত তাহা আমাদের নীতিনির্ধারকদের দৃষ্টি এড়াইয়া যাওয়ার কথা নহে। দুর্ভাগ্যজনকভাবে আমাদের চিত্র একেবারেই ভিন্ন। লক্ষণীয় যে, রাজধানী ঢাকার কেন্দ্রে উত্তর-দক্ষিণ কিংবা পূর্ব-পশ্চিমে আয়তন খুব বেশি নহে। ঐতিহ্যগতভাবে এ দেশের মানুষ হাঁটিতে অভ্যস্ত। ফুটপাতে স্বচ্ছন্দে হাঁটা গেলে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক নগরবাসী নিঃসন্দেহে এই পন্থাই অবলম্বন করিত। ইহাতে যানজটের দুঃসহ দুর্ভোগ যেমন এড়ানো যাইত, তেমনি রাস্তায় অযান্ত্রিক যানবাহনের উপর নির্ভরশীলতাও বহুলাংশে হ্রাস পাইত। সাশ্রয় হইত অর্থেরও।
স্বস্তির বিষয় হইল, বিলম্বে হইলেও এইদিকে নীতিনির্ধারকদের কিছুটা নেকনজর পড়িয়াছে বলিয়া মনে হয়। ধানমণ্ডি, মোহাম্মদপুর ও মিরপুরসহ যেইসব রাস্তায় ফুটপাত ছিল না, ইতিমধ্যে সেইসব স্থানেও ফুটপাত নির্মিত হইয়াছে অথবা নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হইয়াছে। শ্যামলী হইতে গাবতলী পর্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ সড়কটিতেও ফুটপাত নির্মাণের কাজ চলিতেছে। জনহিতকর সময়োপযোগী এই উদ্যোগের জন্য আমরা সরকারকে সাধুবাদ জানাই। তবে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই দেখা যাইতেছে যে, মূল সড়কের তুলনায় ফুটপাত খুবই সংকীর্ণ। একসাথে দুইজনের অধিক পথচারীর হাঁটাচলার উপায় নাই। জনবহুল এই মহানগরীতে ইহার উল্টাটাই হওয়া উচিত বলিয়া আমরা মনে করি। প্রসঙ্গত বলা প্রয়োজন যে, যানজট লাঘবে রাজধানীর বহু স্থানে সড়কের আয়তন বাড়ানো হইয়াছে। কিন্তু তাহাতে কোনো লাভ হয় নাই। বরং সমগ্র রাস্তা জুড়িয়াই বিস্তৃত হইয়াছে যানজট। যানজট লইয়া পরীক্ষা-নিরীক্ষা অঢেল হইয়াছে। ভবিষ্যতে নিশ্চয় আরও হইবে। তাহাতে আমাদের কিছু বলিবার নাই। আমাদের বক্তব্য খুবই স্পষ্ট। ফুটপাত যতোটা সম্ভব বড়ো করুন। তাহাতে রাস্তার আয়তন যদি কিছুটা কমিয়া যায় ক্ষতি নাই। কাজটি দীর্ঘমেয়াদী হইলেও সেই লক্ষ্যে এখনই যাত্রা শুরু করা উচিত।
