বছর দুয়েক হলো প্রযুক্তি বিশ্বের নেতৃত্বে এসেছে বড় ধরনের পরিবর্তন। স্টিভ জবসের অকালমৃত্যু অ্যাপলকে বাধ্য করেছে নতুন সিইও খুঁজে নিতে। বাকি সব প্রতিষ্ঠানই তাদের নিজেদের অবস্থানকে উন্নত করতেই নতুন নতুন সিইও’র সন্ধান করেছে এই সময়ে। শীর্ষ ৭ প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান গত দুই বছরে বদলে দিয়েছে সিইও। কিন্তু কেমন করছেন নতুন নেতৃত্ব? ইন্টারনেট অবলম্বনে জানাচ্ছেন তরিকুর রহমান সজীব
গত দুই বছর সময়ের মধ্যে প্রযুক্তি বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর নেতৃত্বে এসেছে বড় ধরনের রদবদল। এর মধ্যে শীর্ষ সাত প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের সিইও পদেই এসেছে পরিবর্তন। সিইও পরিবর্তনের ক্ষেত্রে একেক প্রতিষ্ঠানের কারণ একেক রকম হলেও শীর্ষ এই সাত প্রতিষ্ঠানের বেশিরভাগই এখন পর্যন্ত লাভের পথেই রয়েছে সিইও পরিবর্তনের পরে। পুঁজি বাজারে বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠানেরই বেড়েছে মূল্যমান। প্রতিষ্ঠানের আর্থিক অবস্থার বিবেচনায় তাই সিইও পরিবর্তন ইতিবাচক হয়েই ধরা দিয়েছে বেশিরভাগ প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে।
সিইও বদলানো শীর্ষ সাত প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান
গত দুই বছর সময়ের মধ্যে অ্যাপল থেকে শুরু করে গুগল, ইয়াহু, সিম্যান্টেক, এইচপি, ব্ল্যাকবেরি এবং এএমডিতে বদল হয়েছে সিইও পদের। এসব প্রতিষ্ঠানে সিইও বদলের কারণ যাই হোক না কেন, নতুন সিইওদের প্রযুক্তি বিশ্ববরণ করে নিয়েছে ভালোভাবেই। নতুন নিয়োগ পাওয়া সিইওর দায়িত্ব পাওয়ার পর প্রতিষ্ঠানকে কতটুকু এগিয়ে নিয়ে যেতে পেরেছেন, তা নিয়ে কৌতুহলের কমতি নেই মানুষের মাঝে। তবে প্রতিষ্ঠানের সিইওদের অবদানকে সহজে পরিমাপ করার কোনো উপায় নেই। প্রতিষ্ঠানের আর্থিক অবস্থা এ ক্ষেত্রে একটি পরিমাপক হতে পারে। দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রতিষ্ঠান আর্থিকভাবে লাভজনক অবস্থায় থাকাটা সিইও’র ব্যবসায়িক কৌশল এবং প্রতিষ্ঠানকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার প্রত্যেয়ের কথাই জানায়। শীর্ষ সাত প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের সিইওদের দুই বছরের মূল্যায়নে সেই দিকটাতেই নজর দেওয়া হয়েছে।
মারিসা মেয়ার :ইয়াহু
২০১১ সালের সেপ্টেম্বরে ক্যারোল বার্টজ ইয়াহু ছাড়ার পরেই মূলত সমস্যায় পড়ে ইয়াহু। পরবর্তীতে স্কট থম্পসন এসে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। তবে তার জীবনবৃত্তান্তের কেলেংকারিতে দায়িত্ব ছাড়তে হয় তাকে। এই সময়ের মধ্যে ইয়াহু বেশ অগোছালো অবস্থার মধ্যে পড়ে। সেই অবস্থার উত্তরণ ঘটাতেই গুগল থেকে ইয়াহু উড়িয়ে নিয়ে আসে মারিসা মেয়ারকে। ইয়াহুতে যোগ দেওয়ার পর থেকেই বড় ধরনের সংস্কার কাজ শুরু করেন মারিসা মেয়ার। ইয়াহুর বেশ কিছু সেবা নতুন রূপ প্রদান করেন মারিসা মেয়ার। এর মধ্যে ইয়াহু মেইলে বড় ধরনের পরিবর্তন নিয়ে এসেছেন তিনি। এ ছাড়া টাম্বলারসহ প্রায় ১২টি কোম্পানি কিনে নেন তিনি। ইয়াহু সার্চ অবশ্য খুব বেশি এগোতে পারেনি এ সময়। তারপরেও সবমিলিয়ে মারিসা মেয়ার যোগ দেওয়ার পর থেকে এখন পর্যন্ত ইয়াহুর শেয়ারের দাম বেড়েছে ৬৮ শতাংশ, যা সব প্রতিষ্ঠানের চাইতে অনেক বেশি। তাতে করে সফল একজন সিইও হিসেবেই স্বীকৃতি পাচ্ছেন মারিসা।
স্টিভ বেনেট :সিম্যান্টেক
সিম্যান্টেকে এনরিক স্যালেনের স্থলভিষিক্ত হন স্টিভ বেনেট। গত বছরের জুলাই মাসে সিম্যান্টেকের দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে অবশ্য সময়টা ভালো যাচ্ছে সিম্যান্টেকের। এর মধ্যে প্রায় ৫০ শতাংশ শেয়ার মূল্য বেড়েছে এই প্রতিষ্ঠানের। আর্থিকভাবে এই সময়ে লাভে মধ্যেই রয়েছে তারা। গত বছরের শেষের দিকে এসে বিশ্বব্যাপী পিসি বিক্রি কমে যাওয়ায় অবশ্য সিম্যান্টেকের অ্যান্টিভাইরাস থেকেই সবচেয়ে বেশি (৩৫ শতাংশ) আয় ক রছে তারা। ব্যাকআপ স্টোরেজ ম্যানেজমেন্টের ব্যবসাতেও তাদের অবস্থান স্থিতিশীল রয়েছে। স্টিভ বেনেটকেও তাই সফল বলাই যায়।
ল্যারি পেজ :গুগল
এরিক স্মিথের কাছ থেকে সিইও’র পদটি গ্রহণ করেন গুগল’র অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা ল্যারি পেজ। ২০১১ সালের ৪ এপ্রিল ল্যারি পেজ দায়িত্ব গ্রহণের পর থেকে এখন পর্যন্ত গুগল’র শেয়ার বেড়েছে ৪৮ ভাগ। দায়িত্ব নেওয়ার পরেই ল্যারি পেজ বন্ধ করে দেন বেশ কিছু সেবা, যেগুলো থেকে গুগল তেমন একটা লাভবান হতে পারছিল না। তবে পুরোনো সেবা বন্ধ করলেও এই সময়ের মধ্যে বেশকিছু চমক নিয়ে হাজির হয়েছে গুগল। এর মধ্যে গুগর প্লাস যথেষ্ট সাড়া ফেলেছে সামাজিক যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে। ব্যবহারকারীর সংখ্যাতেও যথেষ্ট এগিয়ে এটি। আবার ক্লাউড স্টোরেজেও প্রবেশ করেছে গুগল ল্যারি পেজের সময়েই। গত বছরে যাত্রা শুরু করা গুগল ড্রাইভও জনপ্রিয়তা পেয়েছে প্রযুক্তি বিশ্বে। তবে এই সময়ের মধ্যে গুগল’র সবচেয়ে চমকজাগানো পদক্ষেপ বলা যায় মটোরোলাকে কিনে নেওয়া। হার্ডওয়্যারে প্রবেশের লক্ষ্যে মটোরোলা দিয়ে ইতোমধ্যেই গুগল বাজারে এনেছে নেক্সাস সিরিজের ফোনসেট আর ট্যাব। এই সময়ে অ্যানড্রয়েড অপারেটিং সিস্টেম দিয়েও স্মার্টফোন আর ট্যাবলেট পিসির বাজারটা দখল করে নিয়েছে গুগল। আর সর্বশেষ গুগল গ্লাস তো রয়েছে। এ ছাড়া গুগলের স্বচালিত গাড়িও রয়েছে প্রযুক্তি বিশ্বে আলোচনায়, সব মিলিয়ে ল্যারি পেজকে গুগল’র জন্য সফল নেতৃত্ব বলাই যায়।
টিম কুক :অ্যাপল
অ্যাপল’র অন্যতম প্রতিষ্ঠাতা স্টিভ জবস জীবিত থাকাকালেই শারীরিক অসুস্থতাজনিত কারণে সিইও পদ থেকে সরে দাঁড়ান। সেই সময়েই সিওও থেকে সিইও পদে উন্নীত হন টিম বুক। ২০১১ সালের মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ দুটোই দেখে ফেলেছেন। তার সময়েই গত বছরের সেপ্টেম্বর মাসে অ্যাপল শেয়ারের দাম হয় ৭০২.১ ডলার, যা এখন পর্যন্ত অ্যাপল’র ইতিহাসের সর্বোচ্চ। এরপর থেকে অবশ্য অ্যাপল’র শেয়ারের মূল্য পতন হতে শুরু করে। গত বছরের সেপ্টেম্বর মাস থেকে গত মে মাস পর্যন্ত অ্যাপল’র শেয়ারে মূল্য কমেছে প্রায় ৩৬ শতাংশ। তবে টিম কুক যখন থেকে সিইও পদের দায়িত্ব নিয়েছেন, তখনকার তুলনায় এখনও অ্যাপল শেয়ারের দাম ২০% বেশি রয়েছে।
এদিকে গত বছরে অ্যাপল রেকর্ড লাভের মুখ দেখলেও চলতি বছরের শুরুটা একদমই ভালো হয়নি তাদের। গত বছরের প্রথম চতুর্ভাগের তুলনায় এ বছরের প্রথম চতুর্ভাগে তাদের লাভের পরিমাণ কমে গেছে, যেটা এক দশকের মধ্যে প্রথম ঘটনা। অন্যদিকে ২০১০ সালের আইপ্যাডের পর এখন পর্যন্ত অ্যাপল চমকজাগানো কোনো পণ্য হাজির করতে পারেনি প্রযুক্তি বিশ্বের সামনে। মাঝখানে অ্যাপল টিভি এবং ঘড়ি নিয়ে অনেক গুঞ্জন উঠলেও সেগুলো বাস্তবে রূপ লাভ করেনি। তাই সমালোচনাটুকু ছাড়া অ্যাপল চলছে ভালোই।
মেগ হুইটম্যান :এইচপি
২০১১ সালের সেপ্টেম্বর মাসে লিও অ্যাপোথেকারের স্থলাভিষিক্ত হন মেগ হুইটম্যান। ব্যর্থতার বোঝা নিয়ে অ্যাপোথেকার চলে যাওয়ার পর আবার নিজেদের অবস্থানকে শক্তিশালী করে তোলে এইচপি। মেগ হুইটম্যান দায়িত্ব নেওয়ার এক বছরের মধ্যে এইচপি’র স্টক বাড়ে প্রায় ৪৪ শতাংশ। এর মধ্যে অবশ্য এইচপি’র লাভ ধীরে ধীরে কমতে শুরু করে। এখনও এইচপিকে বাজার ধরে রাখতে যথেষ্টই কষ্ট করতে হচ্ছে। মাঝখানে পিসি তৈরিতে শীর্ষস্থানটি এইচপি হারায় লেনোভোর কাছে। তবে সেখান থেকে আবারও শীর্ষস্থানে ফিরে এসেছে এইচপি, যদিও লেনোভো এখনও। এইচপি’র ঘাড়ের উপর নিঃশ্বাস ফেলছে। এদিক সার্বিকভাবে বিশ্বব্যাপী পিসি বিক্রি কমে যাওয়ায় এইচপির উপরে চাপও একটু বেশি রয়েছে।
থর্সটেন হেইন্স :ব্ল্যাকবেরি
আধুনিক সব স্মার্টফোনের কাছে বাজার হারানো রিসার্চ ইন মোশন (আরআইএম) শেষ পর্যন্ত তাদের নাম পরিবর্তন করে আনুষ্ঠানিকভাবে তাদের ‘ব্ল্যাকবেরি’ ব্র্যান্ড নামটি গ্রহণ করে নেয়। ‘কোয়ার্ট’ কিবোর্ডের ধারক ও বাহক ব্ল্যাকবেরি টাচস্ক্রিনের এই যুগে নিজেদের অবস্থান হারিয়েছে। ২০১২ সালের জানুয়ারিতে ব্ল্যাকবেরির সিইও হিসেবে দায়িত্ব নেওয়া থর্সটেন হেইন্স এই প্রবণতা ঠেকাতে পারেনি। এই সময়ের মধ্যে ব্ল্যাকবেরির কর্মী ছাটাই হয় অনেক। সর্বশেষ ব্ল্যাকবেরি ১০ বাজারে এনে তারা শেষ চেষ্টা করে। তাতেও খুব বেশি লাভ হয়নি। হেইন্স দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকে এখন পর্যন্ত হিসাবে ১০ শতাংশ শেয়ার মূল্য হারিয়েছে ব্ল্যাকবেরি।
ররি রিড :এএমডি
লেনোভো এবং আইবিএম-এ কাজ করা ররি রিডকে এএমডি’র সিইও’র দায়িত্ব দেওয়া হয় ২০১১ সালের আগস্টে। ইন্টেলের পরেই ডেস্কটপ প্রসেসর তৈরিতে স্থান এএমডি’র। তবে সেই বাজারটা খুব একটা বাড়াতে পারছে না তারা। ইন্টেল একের পর এক নতুন প্রসেসর বাজারে এনেছে এই সময়। এএমডিও এই সময়ে একাধিক প্রসেসর বাজারে এনেছে। তবে তা খুব বেশি বাজার ধরতে পারেনি। প্রতিষ্ঠান হিসেবেও এএমডি ক্রমেই ক্ষতির মুখ দেখছে। গত বছরের শেষ চতুর্ভাগেই ৪৭৩ মিলিয়ন ডলার ক্ষতি ছিল এএমডি’র। চলতি বছরে অবশ্য খানিকটা উন্নত হয়েছে তাদের ক্ষতির পরিমাণ কমে হয়েছে ১৪৬ মিলিয়ন ডলার। এএমডি’র শেয়ারের মূল্য এই সময়ে কমেছে প্রায় ৩৭ শতাংশ। সিইও হিসেবে তাই রিডের অবস্থান নাজুক। তবে এখনও আশার বাণী শুনিয়েই যাচ্ছেন রিড।
সেই হিসেবে বলা যায়, এএমডি আর ব্ল্যাকবেরি ছাড়া বাকি প্রতিষ্ঠানগুলোর সিইও তাদের পরীক্ষায় উতরে গেছেন ভালোভাবেই। বিশেষ করে মারিসা মেয়ার তার পারফরম্যান্স দিয়ে মুগ্ধ করেছেন প্রযুক্তি বিশ্বকে।
