সাভার বিপর্যয়কে দুর্ঘটনা বলা যায় কী? না। দুর্ঘটনা কাকে বলে? যে বিপর্যয় বা প্রাণহানি সম্পর্কে পূর্বে কারও জানা থাকে না, যা নিতান্তই অনিচ্ছাকৃত। কিন্তু রানা প্লাজার বিপর্যয় সম্পর্কে পূর্বেই অনুমান করা গেছে। বিপর্যয়ের আশঙ্কা সত্ত্বেও সম্পূর্ণ স্বজ্ঞানে ইচ্ছাকৃতভাবে হাজার হাজার শ্রমিককে ভবনে ঢুকিয়ে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেয়া হয়েছে। এই ঘটনাকে কোনভাবেই দুর্ঘটনা বলে চালিয়ে দেয়া যাবে না। বাংলাদেশে অদ্যাবধি পোশাক শিল্প কারখানায় যত বিপর্যয় ঘটেছে, তার অধিকাংশরই সুষ্ঠু তদন্ত, দায়ীদের বিচার ও শাস্তি নিশ্চিতকরণ কিংবা ভবিষ্যত্ সতর্কতা হিসেবে উল্লেখযোগ্য কোন পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়নি। বরং দায়ী ব্যক্তিরা আইনের ফাঁক-ফোকর দিয়ে বেরিয়ে গেছে, নির্বিঘ্নে পুনরায় ব্যবসা-বাণিজ্য চালিয়ে গেছে। শ্রমিকদের জীবনকে মানুষের জীবন হিসেবে দেখা হয়নি। সরকারি ব্যাংক থেকে তদবির করে (কখনো দুই নম্বরি করে) ঋণ নাও। ডোবা বা জলাভূমি ভরাট করে নিম্নমানের নির্মাণ সামগ্রী দিয়ে একটা ভবন বানাও। তারপর নামমাত্র মজুরিতে পোশাক শ্রমিকদের খাটিয়ে টাকার পাহাড় গড়। কারখানা ধসে যাবে, শ্রমিক মারা যাবে? চিন্তা কি, অর্জিত মুনাফার কিছু অংশ কোর্ট কাচারিতে ব্যয় করলেই তো মামলা থেকে বেকসুর খালাস। এই ধারাবাহিক প্রক্রিয়ারই ফলাফল আজকের সাভার বিপর্যয়। পোশাক কারখানার বালু-সিমেন্টের অনুপাত আর পোশাক শিল্প মালিকের বাড়ির বালু-সিমেন্টের অনুপাত এক হয় না জানি, মালিকদের নৈতিকতা মানবিকতাবোধ নেই জানি। এও জানি, শ্রমিকদের জীবনের চেয়ে তাদের কাছে অর্থটাই মুখ্য। কিন্তু এতকিছুর পরও মালিক পক্ষের সেই মুখ্য উদ্দেশের কতটুকু লাভ হলো? ড্যান ডব্লিউ মজীনা ইতিমধ্যে জানান দিয়েছেন, বাংলাদেশের অগ্রাধিকারমূলক বাজার সুবিধা জিএসপি ভাগ্য নির্ধারণে সাভার বিপর্যয় নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। যুক্তরাজ্য ভিত্তিক দ্য টেলিগ্রাফ পত্রিকা পশ্চিমা ক্রেতাদের কাছে প্রশ্ন উত্থাপন করেছে, এরপর আপনি যখন মেইড ইন বাংলাদেশ লেখা দেখে প্রিমার্ক ব্রান্ডের টি শার্ট মাত্র আড়াই ডলারে কিনবেন, তখন কি আপনার মনে হবে দাম এত সস্তা কেন? কারণ যারা এগুলো তৈরি করেন, তারা যথার্থ মজুরি পান না। বাংলাদেশের পোশাক শিল্প মালিকদের দিলে শ্রমিকদের জন্য দয়ামায়া থাকুক বা না থাকুক, টেলিগ্রাফের এই প্রশ্ন পশ্চিমা ক্রেতাদেরও হূদয়ে প্রশ্ন হয়ে দেখা দেবে এবং স্বাভাবিকভাবেই মেইড ইন বাংলাদেশ-এর প্রতি তাদের এক ধরনের অনাগ্রহ জন্মাবে। পোশাক শ্রমিকদের নিরাপত্তা ঠিকঠাক না রেখে দুই পয়সা বাঁচাতে গিয়ে বাংলাদেশ ব্রান্ডেরই যে বিশ্ব জুড়ে বদনাম রটে যাচ্ছে, সেদিকে না আছে মুনাফালোভী পোশাক শিল্প মালিকদের নজর না আছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রীদের মত সরকারি কর্তাব্যক্তিদের নজর, যারা দায় এড়াতে বলে কিনা স্তম্ভ নিয়ে ঠেলাঠেলিতেই এ কাণ্ড। যে গরু দুধ দেয় তার লাথিটাও নাকি ভালো। আর এদেশে যে শ্রমিকরা দিনের পর দিন মাসের পর মাস মাথার ঘাম পায়ে ফেলে বিদেশ থেকে ডলার এনে রপ্তানি খাতকে ধরে রেখেছে, তাদের জীবনের প্রতি কী বিন্দুমাত্র দায়বদ্ধতা নেই আমাদের? এই কী গণতন্ত্রের নমুনা? ন্যায় বিচার আর মানবাধিকার রক্ষার বুলি আওড়ানো আর সাজে না আমাদের। স্পেকট্রাম, তাজরীনের মতো একের পর এক এ ধরনের বিপর্যয় ঘটার পরও যখন সংশ্লিষ্টদের হুঁশ ফিরে আসে না, তখন তার ফলাফল হয় রানা প্লাজা ধসের মতো মানব সৃষ্ট বিপর্যয়। দেশের প্রধানতম রপ্তানি খাতটিও কিভাবে দুর্নীতি, অবহেলা ও উদাসীনতার দুষ্টচক্রে আবদ্ধ হয়ে পড়েছে। তার উত্কৃষ্ট উদাহরণ এই সাভার বিপর্যয়। এই বিশাল প্রাণহানির সাথে কি শুধু এক ভবন মালিক আর পোশাক শিল্প মালিকদের নামই জড়িত? না। এই শত প্রাণহানির দায় এড়াতে পারে না সাভার পৌরসভা কর্তৃপক্ষ যারা বিল্ডিং কোড না মেনেই নির্মিত রানা প্লাজা তৈরির অনুমোদন দিয়েছিল। দায় এড়াতে পারে না রাজউক, ছয় তলার অনুমোদনপ্রাপ্ত নয় তলা ভবনটি যাদের চোখে পড়েনি। দায় এড়াতে পারে না বিজিএমইএ যেটি খুনি মালিকদের পক্ষে সরকারের উচ্চ পর্যায়ে লবিং চালিয়ে যায়। সর্বোপরি দায় এড়াতে পারে না স্থানীয় প্রশাসন যে প্রশাসন ভবনটি সনাক্ত করে তালাবদ্ধ করার নির্দেশ দেয়নি। এই বিপর্যয়ে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে জড়িত দায়ী ব্যক্তিদের আইনের আওতায় এনে যদি কঠোরভাবে বিচার করা না হয়, যদি এ ব্যাপারে কঠোর নীতিগত সিদ্ধান্ত গ্রহণ না করা হয়, তবে দেশবাসী প্রস্তুত থাকুন আরও কিছু রানা প্লাজার ধস দেখার জন্য, আরও অজস্র পিষ্ট হওয়া, পুড়ে যাওয়া, দলিত-গলিত অসহায় মানুষের লাশ দেখার জন্য।
লেখক: সাবেক ছাত্র, রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
