আসুন ফরমালিনযুক্ত ফল বর্জন করি

আপডেট : ১৩ জুন ২০১৩, ২১:৫৬
এখন মধুমাস। আম-কাঁঠাল-জাম-লিচুর মৌ মৌ ঘ্রাণে রাজধানীর সর্বত্রই নবীন আমেজ! গ্রীষ্মের প্রচণ্ড দাবদাহের মধ্যে এইসব মধুময় ফলের সুবাস ও স্বাদ নগরবাসীর জন্য এক পরম স্বস্তিকর বৈকি! বাংলাদেশের প্রকৃতিতে গ্রীষ্ম যখন দারুণ অগ্নিবান নিক্ষেপ করিতে করিতে এ দেশের মানুষের উপর চড়াও হয় ঠিক তখনই আবার প্রকৃতি যেন নিজ হস্তেই রসালো সব ফলের সম্ভার সাজাইয়া শান্তির বারি সিঞ্চন করে মানুষের দেহে-মনে। আবহমান কাল ধরিয়াই বাংলার প্রকৃতিতে এই দৃশ্য বর্তমান। আম-কাঁঠালের মধুর রসে এ দেশের মানুষ তাহাদের মুখ রাঙাইয়া পরম আহ্লাদে গ্রীষ্মের খরতাপকে উপেক্ষা করিবার প্রেরণা লাভ করে। এতসব রঙ্গীন ও রসালো ফলের সমাহারে দেশবাসীর চিত্তে যেন আনন্দ ভৈরবী জাগিয়া ওঠে। সকল বয়সের মানুষের মাঝে সাড়া পড়িয়া যায় ফলাহারের এই মোক্ষম ঋতুর উপস্থিতিতে। কিন্তু বিগত অনেকগুলি বছর ধরিয়া মানুষের এই রসনা তৃপ্তির পথ রুদ্ধ হইবার মতো কিছু বিষয় সকলকে দারুণভাবে বিচলিত করিয়া তুলিয়াছে। গত মঙ্গলবার পরিবেশ বাঁচাও আন্দোলন নামক একটি সংগঠন রীতিমত সংবাদ সম্মেলন আহ্বান করিয়া এই সকল ফল ভক্ষণের ভয়াবহতা সম্পর্কে যে চিত্র তুলিয়া ধরিয়াছে তাহাতে আঁতকাইয়া না উঠিয়া পারা যায় না। তাহারা রাজধানীর বহু স্থানের ফলের দোকান হইতে আম-জাম-লিচু-আপেল-কমলা-আঙুর-মালটা প্রভৃতি ফল সংগ্রহ করিয়া নিজস্ব পরীক্ষাগারে পরীক্ষা করিয়া শতকরা ৯৪ ভাগ ফলেই ফরমালিনের অস্তিত্ব খুঁজিয়া পান। ইহাদের অনেকগুলিতে ফরমালিনের পরিমাণ এতো বেশি যাহা কিনা ভাবাই যায় না। ফরমালিনের ন্যায় বিষের আধিক্যের দরুন মানবদেহে শুধু ক্যান্সারের মতো মরণঘাতী ব্যাধি বাসা বাঁধিবে তাহাই নহে, এমনকি মানুষের ডিএনএ পর্যন্ত পরিবর্তিত হইয়া যাইবে বলিয়া বিশেষজ্ঞগণ মত প্রকাশ করিয়াছেন। ইহা অত্যন্ত সাংঘাতিক কথাই বটে! ফরমালিনই শুধু নহে, ফল-ফলারি ছাড়াও শাক-সবজি এবং অন্য সকল প্রকার খাদ্যে নানাবিধ বিষাক্ত রাসায়নিক প্রয়োগের ঘটনা এই দেশে নতুন নহে। অসাধু অসত্ ব্যবসায়ীরা নিছক তাত্ক্ষণিক মুনাফা লাভের উদগ্র লালসায় গোটা জাতিকেই আজ ধ্বংস করিতে উদ্যত। দৈনিক ইত্তেফাক ইতোপূর্বে ‘আমরা কি খাচ্ছি’ শিরোনামে এই খাদ্যে ভেজাল বিরোধী সিরিজ প্রতিবেদন রচনা করিয়া কর্তৃপক্ষের টনক খানিকটা নড়াইতে সক্ষম হইলেও সময়ের সাথে সাথে আবারও সেই চেতনা মানুষের সীমাহীন লোভের নিকট পরাস্ত হইতে বসিয়াছে। ভেজাল খাদ্যের মাধ্যমে দেশের জনস্বাস্থ্যকে এইভাবে হুমকির মুখে ফেলিয়া দেওয়ার কারণে অচিরেই জাতিকে হয়তো এমন এক করুণ পরিনতি ভোগ করিতে হইবে যাহা ভবিতেও কষ্ট হয়। এই ফরমালিনযুক্ত মাছ-মাংস-ফল-ফলারি, শাক-সবজি বা অতিরিক্ত রাসায়নিক অথবা কীটনাশকযুক্ত অন্যান্য খাবার খাইয়া আমরা নির্ঘাত একটি বিকলাঙ্গ জাতিতে পরিণত হইতে চলিয়াছি। অসাধু ব্যবসায়ীদের মনে এক্ষেত্রে কোন প্রকার মানবতা বোধ বা চেতনা জাগাইবার চেষ্টা বিফলে যাইতে বাধ্য। কেননা লোভ-লালসার এমন এক জায়গায় তাহারা আজ অবস্থান করিতেছেন যে, তাহাদের পক্ষে সেখান হইতে কোন প্রকার দায়িত্ববোধের পরিচয় প্রদানের আশা বাতুলতা মাত্র। কঠোর আইন করিয়া উহা যদি প্রয়োগই না করা যায় তাহা হইলে এই ক্ষেত্রে সংকট কেবলই ঘনীভূতই হইতে থাকিবে আর জাতি কালক্রমে পঙ্গুত্ববরণ করিবেই। এমতাবস্থায় আমরা মনে করি, সময় আসিয়াছে এই সব অসাধু লোভী এবং নিষ্ঠুর ঘাতকরূপী ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে সমবেতভাবে রুখিয়া দাঁড়ানোর। সমাজের সকল স্তরের সকল মানুষকে আজ এই বিষয়টি গভীর অভিনিবেশ সহকারে ভাবিতে হইবে যে, এই বিষ প্রয়োগকারী ও বাংলাদেশের আপামর জনগণকে পঙ্গু বানাইবার চক্রান্তকারীদের বিরুদ্ধে এখনই জাগিয়া না উঠিলে সামনে ভয়াবহ দিন অপেক্ষা করিতেছে আমাদের সকলের জন্য। এই পরিস্থিতি হইতে বাঁচিবার এখন একটাই উপায় আছে বলিয়া আমরা মনে করি। আর উহা এই যে, সকলে মিলিয়া এই ফরমালিনযুক্ত বিষাক্ত ফল ও শাক-সবজি বর্জন করা। বৃটিশ আমলে গান্ধীজীর নেতৃত্বে যেমন বিদেশি পণ্য বর্জনের আন্দোলন চলিয়াছিল এক্ষেত্রেও তেমন আন্দোলন গড়িয়া তোলা আবশ্যক। দুই এক মৌসুমে এই বিষযুক্ত ফল না খাইয়াও আমরা বাঁচিতে পারিব কিন্তু বিষযুক্ত ঐ ফল খাইয়া প্রকারান্তরে আমরা কিন্তু কেহই বাঁচিব না। এই সত্যোপলব্ধির ভিত্তিতে সকল মিডিয়ায় এইসব ফল বর্জনের জন্য ক্যাম্পেইন শুরু করা প্রয়োজন আর জনগণেরও উচিত পরিস্থিতির ভয়াবহতা অনুধাবনপূর্বক এই ফল, শাক-সবজি ক্রয় করা হইতে সম্পূর্ণ বিরত থাকা। ইহার কোন বিকল্প নাই। আর ইহাই দিবালোকের মত এখন পরিষ্কার হইয়া উঠিয়াছে।

এ সম্পর্কিত আরও পড়ুন