গত মঙ্গলবার সন্ধ্যায় গুলশান ডিসিসি মার্কেটে যাহা ঘটিয়া গিয়াছে তাহাতে বিচলিত না হইয়া উপায় নাই। উচ্ছৃঙ্খল কিছু যুবক রাজধানীর ব্যস্ততম এই মার্কেটে প্রবেশ করিয়া ফার্মেসিসহ প্রায় ১৫টি দোকান ভাঙচুর করিয়াছে। ছোঁড়া হইয়াছে ফাঁকা গুলিও। অভাবনীয় এই তাণ্ডব চলাকালে সপরিবারে কেনাকাটা করিতে আসা দেশিবিদেশি বিপুলসংখ্যক মানুষ আতঙ্কে ছোটাছুটি করিতে থাকে। ইহাতে কয়েকজন আহতও হইয়াছেন বলিয়া জানা যায়। অতিশয় উদ্বেগের বিষয় হইল, তাণ্ডবটি চালানো হইয়াছে একটি ছাত্র সংগঠনের নামে। সংগঠনটির কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব এই ঘটনায় ছাত্রলীগের সম্পৃক্ততা অস্বীকার করিলেও যাহাদের নেতৃত্বে এই অপকর্মটি সংঘটিত হইয়াছে তাহাদের নাম ও সাংগঠনিক পরিচয়সহ ঘটনার বিশদ বিবরণ তুলিয়া ধরা হইয়াছে সংবাদপত্রে। ক্ষুব্ধ ব্যবসায়ীরা অভিযোগ করিয়াছেন যে, পুলিশের উপস্থিতিতে এই হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটিলেও তাহারা নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করিয়াছেন। এমনকি ঘটনার একদিন পরও কেহ গ্রেফতার হয় নাই। ফলে ব্যবসায়ীদের মধ্যে হতাশা ও আতঙ্ক বিরাজ করিতেছে। গুলশান নর্থ ডিসিসি সুপার মার্কেট মালিক কল্যাণ সমিতির সভাপতি বলিয়াছেন যে, এই মার্কেটের ক্রেতাদের একটি বড়ো অংশই হইলেন কূটনীতিক। তাহাদের নিরাপত্তা লইয়াও শঙ্কা প্রকাশ করিয়াছেন তিনি। প্রসঙ্গত বলা প্রয়োজন যে, পুলিশ কিংবা প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তার সুযোগে ক্ষমতাসীন দলের বিভিন্ন অঙ্গ বা সহযোগী সংগঠনের এই ধরনের বলদর্পী আচরণ কিংবা সীমালঙ্ঘনের দৃষ্টান্ত ভূরি ভূরি। একইদিন দুপুরে বাগেরহাটের শরণখোলায় ডিএন কারিগরি কলেজেও অনুরূপ হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটিয়াছে। একদিনের ব্যবধানে চট্টগ্রামে ভ্রাম্যমাণ আদালতের উপরও হামলা চালানো হইয়াছে। ভাঙচুর করা হইয়াছে ম্যাজিস্ট্রেটের গাড়ি। দায়ী ব্যক্তিদের গ্রেফতার ও শাস্তির দাবি যতো প্রবলই হউক না কেন প্রতিকার যে সুদূরপরাহত—সেই তিক্ত অভিজ্ঞতাও কমবেশি সকলেরই আছে।
প্রশ্ন উঠিতে পারে যে, কোন্ সরকারের আমলে এই সব ঘটে নাই? অপ্রিয় হইলেও সত্য যে, পূর্ববর্তী সকল নির্বাচিত সরকারের আমলেই এই ধরনের বাড়াবাড়ি ও সীমালঙ্ঘনের ঘটনা ঘটিয়াছে। ক্ষমতাসীন দলের অঙ্গ বা সহযোগী সংগঠনসমূহের সুযোগসন্ধানী নেতাকর্মী ও সমর্থকরা বরাবরই ধরাকে সরাজ্ঞান করিয়াছেন। প্রায় প্রতিটি ক্ষেত্রেই পুলিশ ও প্রশাসন হয় নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করিয়াছে অথবা অবতীর্ণ হইয়াছে তাহাদের তল্পিবাহকের ভূমিকায়। একমাত্র ব্যতিক্রম হইল সামরিক স্বৈরশাসকদের শাসনকাল। বিষয়টি লইয়া জনমনে সংশয় জাগিতে পারে। প্রশ্ন দেখা দিতে পারে যে, জনগণের ভোটে নির্বাচিত সরকারের আমলে যাহা সম্ভব হয় নাই, গণধিক্কৃত স্বৈরশাসকদের আমলে তাহা সম্ভব হইল কিভাবে? সম্ভব হইয়াছে এই কারণে যে, ব্যতিক্রমহীনভাবে সকল নির্বাচিত সরকারেরই অলিখিত একটি লক্ষ্য বা দায় হইল রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় তথা জনগণের ট্যাক্সের টাকায় দলীয় বা অঙ্গ সংগঠনের নেতাকর্মী ও সমর্থকদের তুষ্ট রাখা। মূলত সরকারের এই পৃষ্ঠপোষকতা বা প্রশ্রয়ের কারণেই তাহারা যাহা ইচ্ছা তাহা করিতে পারে এবং পুলিশ ও প্রশাসন তাহা দেখিয়াও না দেখার ভান করে। অন্যদিকে, সামরিক স্বৈরশাসকরা বহুলাংশে এই দায় হইতে মুক্ত। কারণ শুরুতে তাহাদের কোনো রাজনৈতিক দল বা সংগঠন থাকে না। ফলে তাহাদের সম্পূর্ণ নির্ভরতা থাকে সামরিক ও বেসামরিক প্রশাসনের উপর। পরে ক্ষমতায় থাকিয়া দল গঠন করিলেও এই নির্ভরতায় তেমন একটা ব্যত্যয় ঘটে না।
ক্ষমতার অপব্যবহার করিয়া দলীয় নেতাকর্মীদের মধ্যে রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা বন্টনের এই প্রবণতা শুধু যে জনজীবন অতিষ্ঠ করিয়া তুলিতেছে তাহাই নহে, বরং গণতন্ত্র ও আইনের শাসনকেও প্রশ্নবিদ্ধ করিতেছে পদে পদে। একদিকে ক্ষমতার আশীর্বাদপুষ্ট সুযোগসন্ধানী এই নেতাকর্মী ও সমর্থকদের লাগামহীন ঔদ্ধত্য, অন্যদিকে প্রশাসনের নিষ্ক্রিয়তার কারণে ইতিমধ্যে জনমনে ক্ষোভ ও ক্রোধের পাহাড় জমিয়া উঠিয়াছে। ক্ষমতাসীন মহল তাহা সঠিকভাবে অনুধাবনে ব্যর্থ হইলে তাহার পরিণাম কতোখানি ভয়াবহ হইতে পারে সামপ্রতিক দুনিয়ায়ও তাহার উদাহরণের অভাব নাই। তবে অত দূরে যাইবারও প্রয়োজন পড়ে না। ইহার জন্য আমাদের ষাটের দশকের অভূতপূর্ব গণবিস্ফোরণের অভিজ্ঞতাই যথেষ্ট বলিয়া বিবেচিত হইতে পারে।
